চোখে লজ্জা বুকে সাহস

দুপুর গড়িয়ে যায়। তারপরও ঘুম ভাঙ্গছে না। সংবাদ মহল অপেক্ষার প্রহর গুণছে বাফুফের বারান্দায়। কখন ঘুম ভাঙ্গবে নেপাল জয় করে আসা ক্ষুদে ফুটবলারদের। বিকেল বেলা তিনতলা থেকে নেমে আসে সানজিদা, রুমা, শিউলী, রুপা, মাহমুদা, তাসলিমা, মারিয়ারা। গলায় ঝুলছিল সোনার পদক আর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব মাথায় একে একে ১৮ ফুটবলার নেমে আসে। বাংলাদেশের ফুটবলারদের এতো বড় একটা সম্মান এনে দেয়ার পরও এই ফুটবলারদের মধ্যে নূন্যতম অহমিকা নেই। যা আছে সাবিনাদের মধ্যে।
সবাই সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। কথা বলতে গেলে সবাই মুখ লুকিয়ে ফেলে। পেছন দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। প্রত্যেক প্রশ্নেই লজ্জায় পায় উত্তর দিতে। আচ্ছা আপনারা কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছেন কেন? সঙ্গে সঙ্গে হাসতে হাসতে একজন আরেক জনের উপর গড়িয়ে পড়ছে। একজন আরেক জনের পেছনে গিয়ে মুখ ঢাকছে। আপনারাই এতো বড় একটা সম্মান এনে দিলেন। তখন সংকোচ থাকে না ? এক সাথে সবার জবাব,‘মাঠে নামলে আমরা ভয় পাই না।
অনূর্ধ্ব—১৪ এএফসি ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপের সাউথ এন্ড সেন্ট্রাল অঞ্চলে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন। রবিবার দুপুরে কাঠমান্ডুতে সেনাবাহিনীর মাঠে অনুষ্ঠিত ফাইনালে বাংলাদেশ ১-০ গোলে নেপালকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এটা ফুটবলের যে কোনো বিচারে প্রথম ইতিহাস। প্রথম মাইলষ্টোন। খেলোয়াড়রা জানালেন তারা ক্লান্ত ছিলেন। কারণ ফাইনালের দিন সকালে মাঠে খেলেই সেখান থেকে সোজা বিমানবন্দরে যাওয়া। সেখান থেকে ঢাকায়।
কারো বাবা কাঠমস্ত্রী, কারো বাবা কৃষক, আবার কেউ মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান। মাত্রই ফুটবল খেলাটা শিখে আন্তর্জাতিক ফুটবলে বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন, গ্রামের সহজ সরল এই মেয়েরা। তাদের চোখে মুখে লাজ-লজ্জার আরবণটা বেশি থাকলেও বুকে আছে শক্তি এবং সাহস। মাঠে নেমে কাউকে ছাড় দিতে পারে না। প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করতে এই অদম্য খেলোয়াড়দের বুকে আছে সাহসের ভান্ডার। কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটন জানালেন তারা আরো ভালো করতে চান। আর মৌসুমী বললেন, আমরা ১৪ বছর, ১৬ বছরের টুর্নামেন্টেই চ্যাম্পিয়ন হতে চাই না। আমরা বিশ্বকাপ ফুটবলে খেলতে চাই।
 একথা শুধু মৌসুমীই নয়, পুরো দলেরই যেন একই সুর, একই স্বপ্ন। নেপালের প্রধনামন্ত্রী, ক্রীড়া মন্ত্রী বাংলাদেশের ফুটবলারদের গড়লা পদক পরিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সেটা তাদের মনেও নেই। কারণটা কি? মারিয়া, মারজিয়া, তহুরা, নাজমা, শিউলী, মাহমুদা, রাজিয়ারা বললেন, আমাদের পথ অনেক লম্বা আমরা মহিলা ফুটবলের শীর্ষে পৌঁছাতে চাই।
 এই সব প্রতিভাবান ফুটবলার স্বপ্ন দেখে একটা সময় তারা ফিফার সভাপতির হাত থেকে ট্রফি নিবে। ময়মনসিংহের কলসুন্দর মেয়েরা এমন স্বপ্নই দেখে। তারা মনে করে ফুটবলই অনেক কিছু দিতে পারে। যে দলটা নেপালের হিমালয় জয় করেছে তাদের মধ্যে ১০ ফুটবলার রয়েছে ময়মনসিংহের কলসুন্দর গ্রামের। তাদের অন্ধকার বাড়িতে এখন বিদ্যুতের আলো। সানজিদা বললেন, আমগর ঘরে কারেন্ট দিছে সরকার। পাশে দাঁড়ানো আরেক ফুটবলার গোলকিপার তাসলিমা গলা উঁচু করে বললেন, আমরাই না আমাগো গেরামের সব গরেই কারেন্ট দিছে। মিটার কয়শ গেছে কে জানে।’ সানজিদা বললেন, ‘আমগো গেরামের সবাই কারেন্ট পাইছে।
কলসিন্দুর ছাড়াও চ্যাম্পিয়ন হওয়া রংপুরের স্বপ্না, মৌসুমী, রাঙ্গামাটির মনিকা, রাজশাহীর নার্গিস, সাতক্ষীরার রাজিয়া, টাঙ্গাইলের অধিনায়ক কৃষ্ণা রাণী, জ্যোত্স্না, রুমাসহ মেয়েদের দলের সাথে বাফুফের সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন বসবেন আজ। বাফুফে সভাপতির কাছে কি চাইবে জানতে চাইলে সবার জবাব, কিছু না শুধু ফুটবল খেলতে চাই।