‘এখন গ্রামীণ অর্থনীতি আর শুধু ফসলভিত্তিক নয়’ – ড. জাহিদ হোসেনের সাক্ষাৎকার

ড. জাহিদ হোসেন বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ। তিনি ১৯৯৫ সালে বিশ্বব্যাংকে যোগদান করেছিলেন। এর আগে তিনি ১৪ বছর ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন

এম এ খালেক : জাতিসংঘ সম্প্রতি সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল (এসডিজি) ঘোষণা করেছে। আগামী বছর থেকে এটা বাস্তবায়ন শুরু হবে। আমি জানতে চাচ্ছি, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি এবং সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলের মধ্যে পার্থক্য কী?

ড. জাহিদ হোসেন : একটি পার্থক্য হচ্ছে এখানে গোলের সংখ্যা অনেক বেশি। এমডিজিতে মোট গোলের সংখ্যা ছিল ৯টি। আর এসডিজিতে গোলের সংখ্যা ১৭টি। এখানে উন্নয়নের স্কোপটা যেভাবে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে, সেটাকে আরও ব্যাপক করা হয়েছে। পরিধিটা আরও বাড়ানো হয়েছে। যেমন- উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, এমডিজিতে দারিদ্র্যবিমোচনই ছিল প্রধান লক্ষ্য। বলা হয়েছিল, দারিদ্র্য ২০১৫ সালের মধ্যে ১৯৯০ সালের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসবে। এ লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেকটাই এগিয়েছে। এসডিজিতে শুধু দারিদ্র্যবিমোচনের মধ্যে সীমিত না থেকে এখানে পুষ্টিকে যোগ করা হয়েছে। শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই নয়, পুষ্টি সমস্যা মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চবিত্তের ক্ষেত্রে পুষ্টি একটি বড় ধরনের সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। ক্ষুধার ক্ষেত্রে আলাদাভাবে বলা হয়েছে, হাঙ্গার যাতে না থাকে। অর্থাৎ ক্ষুধা দূর করতে হবে। বৈষম্যের ক্ষেত্রে বেশ জোর দেয়া হয়েছে। এমডিজিতে এগুলোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হলেও কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য হিসেবে ছিল না। মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে এমডিজিতে কাভারেজ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল, যেমন- বাচ্চাদের স্কুলে নিয়ে আসা, স্বাস্থ্যসেবা সবার কাছে পৌঁছে দেয়া ইত্যাদি। এখন যেটা বলা হয়েছে, অর্জনের ক্ষেত্রে যে ঘটতি রয়েছে তা পূরণ করা, বিশেষ করে গুণগত মান অর্জনের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। শিক্ষার ক্ষেত্রে মান একটি বিশেষ সমস্যা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার মান আরও অনেক উন্নত করতে হবে। এজন্য কোয়ালিটির ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ যেনতেনভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিলেই হবে না। এগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। এমডিজিতে ‘সাসটেইনেবল’ শব্দটি ছিল না। এমডিজির ক্ষেত্রে অনেকেই আয় বৃদ্ধি করেছেন, দারিদ্র্যবিমোচন করেছেন। কিন্তু পরিবেশের প্রতি যথেষ্ট নজর দেয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, শিল্পায়ন হয়েছে, কৃষিতে বাণিজ্যিকীকরণ হয়েছে। কিন্তু এর ফলে পরিবেশ অনেক দূষিত হয়েছে। পরিবেশ দূষণের বিষয়টি যদি বিবেচনায় রাখা না হয় তাহলে হয়তো উন্নয়নটা টেকসই হবে না। সেই কারণেই পরিবেশগত অনেক লক্ষ্য এখানে ধরা হয়েছে। এমডিজিতে যেসব লক্ষ্যমাত্রা ছিল, সেগুলো তো আছেই; কিন্তু সেগুলোকে আরও গভীর করা, টেকসই যাতে হয় তার প্রতি এসডিজিতে জোর দেয়া হয়েছে। এমডিজিতে মোট ২৮-২৯টি টার্গেট ছিল; কিন্তু এসডিজিতে মোট ১৬৯টি টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এটা হচ্ছে ওভারঅল একটি ডেভেলপমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক, যাতে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলো সম্মত হয়েছে। এখন প্রত্যেকটি দেশকে যা করতে হবে, তা হলো- অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা। কোনো দেশের জন্য কী অগ্রাধিকার পাবে এটা তাদেরই নির্ধারণ করতে হবে। কারণ সবার অগ্রাধিকার তো একইরকম হতে পারে না। এছাড়া কোনটা বাস্তবায়নযোগ্য তাও নির্ধারণ করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে তো অনেক মাইলফলক স্থাপন করতে হবে। মাইলফলক স্থাপন করে সেটাকে তো মনিটর করতে হবে। সেটা মনিটর করার জন্য ডেটা বেইস লাগবে। তথ্য সংগ্রহ এবং সেই তথ্য পর্যালোচনা এবং মূল্যায়ন করে আমাদের কারেকটিভ অ্যাকশন নেয়া সেটার তো ক্ষমতা থাকতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা তো থাকতে হবে। এমনকি এমডিজির ক্ষেত্রেও যে পরিসংখ্যানগুলো এমডিজি মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল সে ক্ষেত্রেও, বিশেষ করে মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে আপনি দেখবেন, আমরা প্রশাসনিক তথ্যের ওপরই নির্ভরশীল। শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা স্যানিটেশন ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমরা প্রশাসনিক তথ্যের ওপরই নির্ভরশীল। সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলে আরও একটি বিষয়ে অত্যন্ত জোর দেয়া হয়েছে, তা হলো নারীর ক্ষমতায়ন। শুধু জেন্ডার বিষয়ে নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রে যারা বঞ্চিত শ্রেণী আছে, যেমন কিছু এলাকাভিত্তিক বঞ্চিত শ্রেণী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী আছে তাদের সমাজের মূল শ্রোতে নিয়ে আসার ওপরও জোর দেয়া হয়েছে। দারিদ্র্যবিমোচন, ইনক্লুশন এবং এনভায়রনমেন্টাল সাসটেইনেবিলিটি- এ তিনটি বিষয়ের ওপর এসডিজিতে অত্যন্ত জোর দেয়া হয়েছে। এগুলো মনিটরিংয়ের জন্য প্রত্যেক ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। আমাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে এবং তার ভিত্তিতে মনিটরিং করতে হবে।

এম এ খালেক : বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে (২০১৫-১৬) ৭ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এটা অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু বলে আপনি মনে করেন?

ড. জাহিদ হোসেন : চলতি অর্থবছরে আমাদের জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। সম্প্রতি জেনারেল ইকোনমিস্ট ডিভিশন একটি পত্র তৈরি করেছে, যা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারও ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি থেকে ৬ দশমিক ৮-এ নেমে এসেছে। যেসব সূচক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত চলতি অর্থবছরে তাদের যে অবস্থা তাতে ৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এমনকি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হওয়ার ব্যাপারেও সন্দেহ রয়েছে। আপনি যদি রাজস্ব আদায়ের দিকে লক্ষ্য করেন, দেখবেন ট্যাক্স রেভিনিউ গ্রোথ খুবই কম। বিনিয়োগ তেমন একটা নেই বললেই চলে। ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহ গত অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বেশি হলেও এটা খুবই দুর্বল। রেমিট্যান্সপ্রবাহ গত বছরের প্রায় সমান। রফতানি প্রবৃদ্ধি শুরুতে খুবই খারাপ ছিল, বর্তমানে তা ৫ শতাংশে উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বর্তমানে যে অবস্থা বিরাজ করছে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক মন্দাভাব এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রম যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে রফতানি খুব ভালো হবে এটা আশা করা যায় না। এমনকি ইউরোপীয় অর্থনীতিতে যেভাবে রিকভারি আশা করা হচ্ছিল তা হয়নি। কাজেই ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে রফতানি কার্যক্রমের যে গতি প্রয়োজন ছিল তার কোনো ভিত্তি আমি লক্ষ্য করছি না।

এম এ খালেক : সম্প্রতি দুইজন বিদেশি নাগরিক হত্যাকান্ডে শিকার হয়েছেন। এছাড়া প্রায়ই ব্লগার হত্যাকা- সংঘটিত হচ্ছে। এ অবস্থায় আমাদের সার্বিক বিনিয়োগ কার্যক্রম, বিশেষ করে বিকাশমান পর্যটন শিল্পের ওপর কেমন প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?

ড. জাহিদ হোসেন : বিদেশি নাগরিক হত্যাকান্ডের ফলে মানুষের মাঝে এক ধরনের আস্থার অভাব সৃষ্টি হয়েছে। আমি এ অবস্থাকে আতঙ্ক বলব না। এ ধরনের ঘটনা যখন ঘটে এবং তার ব্যাপক প্রচার হয়, আমরা যেভাবে রিঅ্যাক্ট করি তাতে যে আস্থাহীনতার সৃষ্টি হয় তা বিরাজমান থাকবে। এ অবস্থায় বিদেশি পর্যটক পাওয়া খুব একটা সহজ হবে বলে মনে হয় না। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এরা তো প্রতি মাসেই তাদের নাগরিকদের সতর্ক করে আসছে। কক্সবাজার বা অন্যান্য পর্যটন এলাকায় অবস্থিত হোটেল বা রিসোর্টে ট্যুরিস্ট অকপেন্সি তো খুব একটা ভালো নয়। বিদেশি নাগরিক বা ব্লগার হত্যাকান্ডের মতো ঘটনা ভবিষ্যতে যেন আর না ঘটে তা নিশ্চিত করতে হবে। এরই মধ্যে যেসব ঘটনা ঘটেছে তার সুষ্ঠু তদন্ত করে উপযুক্ত বিচারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এম এ খালেক : বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য শিডিউল ব্যাংকগুলোকে ১৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লী ঋণ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিয়েছে। শর্ত দেয়া হয়েছে, এ ঋণ সর্বোচ্চ ১১ শতাংশ সুদে কৃষককে প্রদান করতে হবে। মাইক্রো-ফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশনগুলোও (এমএফআই) শিডিউল ব্যাংক থেকে ১১ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, এমএফআইগুলো শিডিউল ব্যাংক থেকে ১১ শতাংশ সুদে ঋণ গ্রহণ করে তা কৃষক পর্যায়ে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদে বিনিয়োগ করছে। ফলে কৃষকদের তুলনামূলক স্বল্প সুদে ঋণ প্রদানে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ কি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে না?

ড. জাহিদ হোসেন : সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক এবং এনজিওগুলোর মাধ্যমে ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে মৌলিক পার্থক্য আছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে একজন উদ্যোক্তাকে ব্যাংকে যেতে হয়। ব্যাংকের ঋণদান প্রক্রিয়া বেশ জটিল। অন্যদিকে এনজিওগুলো গ্রামে চলে যায়। তারা তুলনামূলক সহজ শর্তে কৃষকদের ঋণ দিতে পারে। যেহেতু এনজিওগুলো গ্রামে গ্রামে গিয়ে ঋণ প্রদান করে তাই তাদের ‘অপারেটিং কস্ট’ অনেক বেশি। কাজেই ব্যাংকগুলো যেভাবে ঋণ প্রদান করে এনজিওগুলো সেই ঋণ প্রদান করতে গেলে তাদের কিছুটা বেশি স্প্রেড থাকতে হবে। তবে সেই স্প্রেড ১৬ (১১+১৬=২৭) শতাংশ কিনা তা বিবেচ্য বিষয় বটে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, ব্যাংক এবং এনজিওগুলোর ঋণ বিতরণ কার্যক্রমের ধরনটা একরকম নয়। এনজিওগুলোর মাধ্যমে ঋণ প্রদান করা হলে তা খুব সহজেই টার্গেট গ্রুপের কাছে পৌঁছে। যাদের উদ্দেশ্যে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে, তাদের কাছে যদি পৌঁছে তাহলে ঋণ প্রদান কার্যক্রমের সফলতার সম্ভাবনা থাকে। কৃষিঋণের আপার সিলিং নির্ধারণ করে দেয়া যায় কিনা সে বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। এর উত্তরে বলা যেতে পারে, আপনি যদি কৃষিঋণের সুদের আপার সিলিং বেঁধে দেন সেটা যদি যৌক্তিক না হয় তাহলে যারা ফটকাবাজারি করে তারা এ সুযোগ নেবে। কারণ যারা ভালো তারা তো এটা দিয়ে ব্যবসা করতে পারবে না। কাজেই তারা এতে আগ্রহী হবে না। কিন্তু টাকা যেহেতু দিচ্ছেন তাই কেউ না কেউ এটা নিতে আগ্রহী হবে। কিন্তু আপনি যদি সঠিক খাতে ঋণ প্রদান করতে না পারেন তাহলে এ কার্যক্রম ব্যর্থ হতে বাধ্য। কৃষি ও পল্লী ঋণ খাতে যে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে তার প্রভাব এবং অন্যান্য দিক নিয়ে ব্যাপক মূল্যায়নের প্রয়োজন আছে।

এম এ খালেক : আমি বগুড়া জেলায় দেখেছি, গ্রামীণ এলাকায় মানুষ ছোট ছোট উদ্যোগ গ্রহণ করছেন। যেমন- কেউ হয়তো গরুর খামার প্রতিষ্ঠা করেছেন। কেউ হয়তো কবুতরের খামার প্রতিষ্ঠা করে তার অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটাচ্ছেন। এ বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

ড. জাহিদ হোসেন : গত দুই দশকে বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির বেশ উল্লেখযোগ্য বহির্মুখীকরণ হয়েছে। এখন গ্রামীণ অর্থনীতি আর শুধু ফসলভিত্তিক নয়। আবার ফসলের ক্ষেত্রেও গ্রামীণ অর্থনীতি শুধু একটি বা দুইটি ফসলভিত্তিক নয়। নানা ধরনের ফসল এখন গ্রামে উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষি খাতেও বহুমুখীকরণ হয়েছে। আমাদের যে সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে তার কিছুটা তো গ্রামেও পৌঁছেছে। বিশেষ করে আমি বলব, তৈরি পোশাক শিল্পের যে সম্প্রসারণ হয়েছে সেখানে যে ৪০ লাখ মহিলা কাজ করছে এদের বেশিরভাগই গ্রাম থেকে আগত এবং তাদের টাকা গ্রামে যাচ্ছে। সেখান থেকেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাহিদা বাড়ছে। উৎপাদন আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত অর্থবছরে আমরা যে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পেয়েছি তার বেশিরভাগই গ্রামে গিয়েছে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ অনেকটাই বেড়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক ধরনের ইতিবাচক রূপান্তর ঘটছে। গ্রামের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে। এছাড়া গ্রামের সঙ্গে শহরের যে কানেকটিভিটি সেখানেও বেশ উন্নতি হয়েছে। আমরা গ্রামীণ অর্থনীতির এ অর্জনকে সঠিকভাবে মেইনটেন্যান্স করিনি। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে আমরা যতটা বেনিফিট পেতে পারতাম তা পাইনি।

এম এ খালেক : বর্তমানে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এ স্ফীত রিজার্ভকে কীভাবে উৎপাদনশীল কাজে লাগানো যেতে পারে বলে মনে করেন?

ড. জাহিদ হোসেন : বাংলাদেশ ব্যাংকে বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। রিজার্ভ ব্যবহারের জন্য একটি প্রস্তাবনা আলোচনা হচ্ছে, তা হলো এ রিজার্ভ দিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ফান্ড সৃষ্টি করে সেখান থেকে অবকাঠামোগত উন্নয়নে অর্থায়ন করা যেতে পারে। আমাদের যেসব প্রকল্প এরই মধ্যে হাতে নেয়া আছে, সেগুলো যদি নির্দিষ্ট বাজেটের মধ্যে যথাসময়ে বাস্তবায়ন করতে পারতাম তাহলে বলতাম আরও নতুন প্রকল্প যোগ করে তা বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। যেসব প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, সেগুলোই তো আমরা ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে পারছি না। এখানে কিছুটা হলেও ঝুঁকি থেকে যায়। প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতার অভাব রয়েছে, আছে দুর্নীতির ব্যাপার। এসব সমস্যা সমাধান না করে শুধু ফান্ড সৃষ্টি করে তা খরচ করার তাগিদ দেয়া বোধহয় ঠিক হবে না।

এম এ খালেক : বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে ব্যাপকভিত্তিক দুর্নীতি। দুর্নীতির কারণে কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে এবং তা থেকে উত্তরণের উপায় কী বলে মনে করেন?

ড. জাহিদ হোসেন : বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিভিন্ন ধরনের ইম্প্যাক্ট আছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে, দুর্নীতির কারণে আমাদের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে পিছিয়ে পড়ছি। উন্নয়ন বাজেটের নামে আমরা যে অর্থ খরচ করি তা যে ধরনের ফলাফল দেয়ার কথা তা দেয় না। সামাজিক খাতে যে অর্থ খরচ করা হয় সেখানেও নানা ধরনের অপচয় হয়। দুর্নীতির কারণে যারা ব্যক্তি খাতের ভালো উদ্যোক্তা তারা অনেক কাজ করতে পারেন না। এতে তারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। জমি রেজিস্ট্রেশন বা ইম্পোর্ট লাইসেন্স করতে গেলে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেক সময় টাকা-পয়সা ব্যয় করলেও কাজটি ঠিকমতো হয় না। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আমরা বর্তমানে যে স্থবিরতা লক্ষ্য করছি, তার একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে দুর্নীতি। আর একটি সমস্যা হচ্ছে অবকাঠামোগত। কিন্তু এ অবকাঠামোগত সমস্যার জন্যও তো দুর্নীতি অনেকাংশে দায়ী। শুধু আর্থিক দুর্নীতি নয়, আছে স্বজনপ্রীতি। যোগ্য ব্যক্তিকে কন্ট্রাক্ট না দেয়ার ব্যাপার রয়েছে। রাজস্ব আদায়ের ব্যাপারে বলা হয়, আমরা কর দিতে চাই না। কিন্তু যে কর প্রদান করি তার কিছু অংশ তো আবার সরকার পায় না। সরকারি-বেসরকারি যাই বলি না কেন প্রত্যেক খাতেই দুর্নীতির একটি বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে।

এম এ খালেক : দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। এ টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে প্রায়ই নানা উদ্যোগের কথা শোনা যায়। এটা কতটা সম্ভব বলে মনে করেন?

ড. জাহিদ হোসেন : এটা অত সোজা কাজ নয়। কারণ যারা বিদেশে টাকা পাচার করছে তারা তো পুঁটি মাছ নয়। বড় অঙ্কের টাকা যারা পাচার করছে তারা রাঘব বোয়াল। এদের যদি আপনি ছুঁতে না পারেন তাহলে তো হবে না। যেমন- বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির ব্যাপারে যারা জড়িত সেই রাঘব বোয়াল তাদের তো আপনি ছুঁতে পারেননি। এদের টাকা আপনি কীভাবে ফেরত আনবেন? দ্বিতীয়ত, যেসব দেশে টাকা পাচার করা হয়েছে তাদের সঙ্গে মিলে তো কাজ করতে হবে। তাদের সঙ্গে এ সংক্রান্ত চুক্তি থাকতে হবে।

এম এ খালেক : সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের শীর্ষস্থানীয় চারটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। এ উদ্যোগ কি ব্যাংকগুলোর সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে বলে মনে করেন?

ড. জাহিদ হোসেন : সেটা দেখার বিষয়। কিছু একটা তো করা হচ্ছে। বাইরে থেকে এক ধরনের নজরদারি করা হচ্ছে। আমরা অতীতে দেখেছি, কন্টিনেন্টাল ব্যাংকে যখন সমস্যা দেখা দেয়, তখন সেখানে প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। তারপরও ব্যাংকটিকে ক্লিন করে ডিসপোজ আপ করে দিল। কাজেই রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের প্রশাসক নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি অংশ বলা যেতে পারে। প্রশাসক কী করবে তার লক্ষ্য কী এসবের ওপর নির্ভর করছে অনেক কিছুই।

(সাক্ষাৎকারে ড. জাহিদ হোসেন যে মতামত ব্যক্ত করেছেন তা একান্তই তার নিজস্ব। এর সঙ্গে তার কর্মরত প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পর্ক নেই)

Views: 2