কেঁচো-কম্পোস্ট সার উৎপাদন করে স্বাবলম্বী কালীগঞ্জের নারীরা

নেত্রকোনার মহেশপট্টি গ্রামের দিনমজুরের মেয়ে আকলিমা মহেষপট্টি প্রাইমারি স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। মা ঢাকা শহরে গৃহকর্মী, তারা উপার্জনের টাকা দিয়ে মেয়েকে নতুন জামাকাপড় পরিয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি করেছিল। মেয়েটি প্রথম শ্রেণিতেই বিনামূল্যে বই পায় এবং স্কুলে নিয়মিতভাবে যাতায়াত করতে থাকে। শিক্ষার প্রতি আকলিমার আগ্রহ দেখে শিক্ষকরা তার প্রতি বিশেষ যতœ নেন। তাই তার প্রথম পাঠ ভালোভাবে শেষ হয়। পর্যায়ক্রমে সে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত স্কুল ফিডিং কর্মসূচির সুবিধা পায় এবং বর্তমানে সে উপবৃত্তির টাকাও পাচ্ছে। তা দিয়ে আকলিমা শিক্ষার অন্যান্য উপকরণ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারছে। ফলে তার মায়ের কষ্টার্জিত টাকা আর তেমন প্রয়োজন পড়ে না আকলিমার। তাই আকলিমা নিজে ও তার পরিবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেক দূর যাওয়ার। শুধু আকলিমা নয়, ওর মতো অসংখ্য মেয়ে ও তাদের পরিবারের বোধোদয় হতে শুরু করেছে বাল্যবিয়ে নয়, শিক্ষাই নারীর ক্ষমতায়নের একমাত্র পথ। দেশের চরাঞ্চল, হাওর ও বাঁওড় এলাকার মতো দুর্গম অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির জন্য স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় লিখন ক্ষমতা বাড়ানো, মনোযোগী করে তোলা, ভর্তির হার, উপস্থিতির হারসহ ঝরেপড়ার হার কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে। এতদঞ্চলের মানুষের মধ্যে ব্যাপক সচেতনতা ও উপবৃত্তিসহ সরকারের নেয়া বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগের ফলে প্রাথমিক স্তরের অধ্যায়নরত ছাত্র ও ছাত্রীর সংখ্যার ক্ষেত্রে সমতা এসেছে। এক্ষেত্রে মেয়েদের প্রথম শ্রেণিতে গড় ভর্তির এই হার ৯৮.৮ শতাংশ আর ছেলেদের ৯৬.৬ শতাংশ। অর্থাৎ ঝরেপড়ার হারও ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের কম। এক কথায় বলা যায়, মাধ্যমিক শিক্ষার গণ্ডি পার হয়ে এ দেশের মেয়েরা বিপ্লব ঘটাতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ শিক্ষা ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ লাখ ৮ হাজার ৫৩৭টি নানা ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখন ১ কোটি ৯৫ লাখ ৫২ হাজার ৯৭৯ জন ছাত্রছাত্রী লেখাপড়া করছে। জেনেভা অর্থনৈতিক ফোরমের ‘বিশ্ব লিঙ্গ বৈষম্য প্রতিবেদন, ২০১৪’ এর পরিসংখ্যানে প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণের এনরোলমেন্ট সূচকে এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রথম সারির ১০টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় নির্ধারিত সময়সূচির আগেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রছাত্রীর সমতা অর্জন সম্ভব হয়েছে। এ অর্জনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে সরকারের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ও অভিভাবকদের সচেতনতা। শিক্ষা ক্ষেত্রে ও রাজনৈতিক তথা সামাজিক জীবনে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিতকরণের ধারাকে অব্যাহত রাখতে প্রাথমিক শিক্ষার্থী পর্যায়ে উপবৃত্তির আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। বর্তমানে ৭৮ হাজার শিশুকে উপবৃত্তি দেয়া হলেও ২ বছর মেয়াদি নতুন প্রকল্পে ১ কোটি ৩০ লাখ শিশুকে এই উপবৃত্তির আওতায় আনতে চায় সরকার। তবে এখানে কিছু শর্ত রয়েছে যেমন- প্রতিটি স্কুলে ছাত্রছাত্রী উপস্থিতির হার ৮৫ শতাংশ, সব বিষয়ে পরীক্ষায় ৪৫ শতাংশ নম্বর পাওয়াসহ ইত্যাদি। এই শর্তগুলো রক্ষা করতে পারলেই শিশু শিক্ষার্থীরা এর আওতায় আসতে পারবে। গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকে জেন্ডার সংবেদনশীল করে গড়ে তুলতে হলে এই প্রয়াসের বিকল্প নেই। এর জন্যই চাই সামাজিক সচেতনতা যাতে করে উচ্চ শিক্ষায় অংশগ্রহণের প্রতি মেয়েদের ও তাদের পরিবারের আগ্রহ বাড়ে।

শতভাগ শিশুকে কেবল স্কুলে ভর্তি করলেই হবে না, তা ধরে রাখতে হবে। সরকার গত কয়েক বছর ধরে ঝরেপড়া রোধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় সরকার ঝরেপড়ার বিষয়টির ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে শতভাগ প্রাথমিক শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তির আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগের সফলতার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় মনে করে শতভাগ শিশুকে উপবৃত্তির আওতায় আনলে শিক্ষার্থী ভর্তির হার কমে যাবে। ঝরেপড়ার ফাঁকিও খুঁজতে সুবিধা হবে। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা নির্ধারণ সহজ হবে, অযথা অনেক বই উৎপাদনের সংখ্যাও হ্রাস পাবে এবং একইভাবে স্কুল ফিডিংয়ের অর্থও অপচয় রোধ করা সহজ হবে। উপরন্তু বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করে আরো ৫২ লাখ শিশুকে এই প্রকল্পের আওতায় আনা যাবে। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় ১০ ভাগ প্রতিবন্ধী শিশু রয়েছে। দীর্ঘদিনের চেষ্টায় প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষক, অভিভাবক ও জনগণের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছে। তাই তাদের মূল ধারায় এনে সাধারণ স্কুলে একীভূত করে লেখাপড়া করানোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের শিক্ষা উপকরণ ব্যয়বহুল হওয়ায় সেগুলো প্রাপ্তির দুর্ভোগ অপরিসীম। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ব্রেইল বই’, শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ যেমন হেডফোন, শ্রবণ সহায়ক যন্ত্র এবং বাক-শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ইশারা ভাষায় শিক্ষাদান করার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন হয়। তাই প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা উপকরণ সহজভাবে প্রাপ্তি এবং তাদের জন্য ‘বিশেষ উপবৃত্তি’র ব্যবস্থা করে সব প্রতিবন্ধী শিশুর শিক্ষাদানের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। যেহেতু শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের সুফল হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত নারী-পুরুষ সবার শিক্ষার অধিকার আজ নিশ্চিত হয়েছে। তাই সরকার কর্তৃক যথাযথ পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ গ্রহণ, শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধি ও তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রণয়নই ঝরেপড়া রোধে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা বাড়াতে আরো সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।