ক্ষুদ্র ঋণের ব্যতিক্রমী মডেল

ঠাকুরগাঁও সদরের আউলিয়াপুর ইউনিয়নের ভাতগাঁ গ্রামের গৃহিণী পিরিনা খাঁকা (৪৫)। স্বামীর নাম ইলিয়াস। পেশায় ভ্যান চালক। দুই ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে এই ওঁরাও পরিবারের সুখের সংসার। বড় ছেলে স্থানীয় একটি স্কুলে নবম ও ছোট ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। কোলের ছোট্ট মেয়েটিকে ২/৩ বছর পর স্কুলে পড়ানোর আশায় বুক বাঁধছেন পিরিনা। তার এখন স্বপ্ন ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেষ করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করা। সেই সঙ্গে নিজের যে ভিটেবাড়ি আছে তার পাশে এক টুকরো জায়গা কিনে অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী হওয়া।

অথচ দু বছর আগেও এই স্বপ্ন তো দূরের কথা, কোনো রকম খেয়ে পরে বেঁচে থাকার কথা চিন্তাও করতে পারতেন না পিরিনা। একসময় অভাব-অনটনের যাঁতাকলে তার যে স্বপ্ন মরীচিকার মতো ঢাকা পড়েছিল, তা আবার নতুন করে প্রদীপের আলোয় উদয় হলো প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন বাংলাদেশ নামে একটি আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার কারিগরি সহযোগিতা ও ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর প্রকল্পের আওতায় অংশগ্রহণমূলক বাজার ব্যবস্থা কার্যক্রমের মাধ্যমে। শুধু পিরিনার পরিবারকে নয়, বরং পাল্টে দিয়েছে ওই এলাকার ২৩০টি ওঁরাও ও সাঁওতাল পরিবারের জীবনের চালচিত্র। কারিগরি নির্দেশনাহীন প্রচলিত ক্ষুদ্র ঋণ যেখানে গরিব মানুষকে আরও নিঃস্ব করে বলে জনশ্রুতি আছে, সেখানে অংশগ্রহণমূলক বাজার ব্যবস্থাপনায় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে উত্পাদনকারী থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সব স্তরে ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করে সকল শ্রেণির লাভবান হওয়ার এই মডেল আদিবাসী ও স্থানীয় মানুষের কাছে এখন ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে দিয়েছে ক্ষুদ্র ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছে নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রথমবার ২৫ হাজার টাকা মৌসুমি ঋণ নিয়ে গরু মোটাতাজাকরণের জন্য গরু ক্রয় করেন আদিবাসীরা। ৩/৪ মাস পর গরুটি মোটাতাজা হলে নিজের এলাকায় সবাই মিলে দলীয়ভাবে গরু বিক্রির আয়োজন করেন। সেখানে স্থানীয় গরুর ব্যবসায়ী দালাল দরকষাকষির মাধ্যমে যৌক্তিক দাম দিয়ে গরু কিনে নেন। গরু লালন-পালনকারীদের গ্রাম থেকে দূরের হাট-বাজারে গরু নিয়ে যেতে হয় না বলে তাদের যাতায়াতসহ অনেক খরচ বেঁচে যায়। এর পাশাপাশি প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর, প্রাণীখাদ্য ও ঔষধ কোম্পানি এবং স্থানীয় প্রাণী সেবাদানকারীদের সঙ্গে স্থানীয় আদিবাসী গরু পালনকারীদের সুসম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার কারণে তাদের সেবা প্রাপ্তির উপকরণ সামগ্রী ও গরু মোটাতাজাকরণের দক্ষতা উন্নয়নের যে ঘাটতি ছিল তা কমে এসেছে। এতে দলীয়ভাবে ভ্যাকসিন, প্রাণী খাদ্য ও ঔষধ ক্রয় করায় গরু পালনকারীরা অপেক্ষাকৃত কম খরচে নিজেদের ঘরের কাছেই ভালো সেবা পাচ্ছেন। একইভাবে সেবাদানকারীরাও লাভবান হচ্ছেন এবং তাদের ব্যবসা সম্প্রসারিত হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় উত্পাদন খরচ কমে আসায় এবং গরু ন্যায্য দাম পাওয়ায় খুশি এই এলাকার বাসিন্দারা। আর তাতে প্রায় ৩/৪ মাস পর ২৫ হাজার টাকার গরু ৩৭-৩৮ হাজার টাকা দামে বিক্রি করে। ঋণের টাকা পরিশোধ এবং অন্যান্য খরচ বাদে মাত্র ৩/৪ মাসে প্রায় ৬-৭ হাজার টাকা লাভ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে শুরু করেছে এখানকার ওঁরাও-সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার। জানা গেছে, আদিবাসী ও দলিত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি বা মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশনের কারিগরি সহযোগিতা ও হেকস সুইজারল্যান্ডের আর্থিক সহায়তায় অ্যাকসেস টু মার্কেট অ্যান্ড সোশ্যাল ইনক্লুশান অব মাইনরিটিজ নামে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও), গ্রামবিকাশ কেন্দ্র, সার্ভিস ইমারজেন্সি ফর রুরাল পিপল (এসইআরপি) ও অ্যাসোসিয়েশান ফর রুরাল কোঅপারেশান (আরকো) নামের বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পটি শুরু হয়েছে ২০১৩ সালের নভেম্বরে এবং শেষ হবে ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে। ২৮০০ আদিবাসী ও দলিত পরিবারের বাজারে অনুপ্রবেশ ও মূলধারার সঙ্গে সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁও জেলায়।

এ প্রসঙ্গে ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান বলেন, ‘সমাজের বঞ্চিত জনগোষ্ঠী হিসেবে দেশে এই প্রথমবারের মতো আদিবাসীদের টার্গেট করে আমরা এই প্রকল্প চালু করেছি। এর মূল্য উদ্দেশ্য ভ্যালু চেইন উন্নয়নের মাধ্যমে আদিবাসী ও দলিত উত্পাদনকারীরা গরু ও দেশি মুরগির উত্পাদন ও বাজারে প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। এতে উত্পাদনকারী, পাইকার, ট্রেডার এবং সরকারি ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সবার সমন্বয়ে একটি টেকসই সম্পর্ক গড়ে উঠবে এবং সাথে সাথে ভোক্তাদের জন্যও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে।