নতুন প্রজন্মের হাতে সফল বাংলাদেশের প্রত্যাশা

আজকের এই স্বাধীন বাংলাদেশ শুধু ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কিংবা ৩০ লক্ষ মানুষের আত্মত্যাগের ফসল নয়। এরসাথে রয়েছে কোটি মানুষের শুভ কামনা ও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতা। এই প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এক বিশাল অবদান ছিল ভারতের সরকার ও সেনাবাহিনী। সেই সেনাবাহিনীরই কয়েকজন কর্মকর্তা এসেছিলেন বাংলাদেশে একাত্তর টেলিভিশনের আমন্ত্রণে। বীর এই যোদ্ধাদের সম্মান জানাতে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর কুড়িল-বিশ্বরোড গলফ ক্লাবের পাম ভিউ রেস্টুরেন্টে এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

 

মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া ভারতীয় সেনা কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় এই সন্ধ্যায় বাংলাদেশের অনেক মুক্তিযোদ্ধাও যোগ দেন। তাদের আড্ডায় উঠে আসে মুক্তিসংগ্রামে ভারতীয় বাহিনীর অবদান, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর বীরত্বগাথা।

 

একাত্তরে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ আর বর্তমান বাংলাদেশ এক নয়। বাংলাদেশ গত চার দশকে অনেক উন্নতি করেছে। শিল্প, রাজনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা—সবক্ষেত্রেই এদেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এদেশের তরুণদের মাঝে উন্নতি করার দৃঢ় ইচ্ছা আমরা দেখতে পাচ্ছি—বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশে সফররত মিত্রবাহিনীর ভারতীয় মুক্তিযোদ্ধারা এসব কথা বলেন। একাত্তর টিভির প্রধান মোজাম্মেল বাবু ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের স্বাগত জানান। বেসরকারি টেলিভিশন ৭১ টিভির সৌজন্যে এতে উপস্থিত ছিলেন মিত্রবাহিনীর ১০ জন যোদ্ধা। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর লে. জেনারেল বিষ্ণুকান্ত চতুর্বেদীর (অব.) নেতৃত্বে মিত্রবাহিনীর ২৭ জন বীর ভারতীয় যোদ্ধা বর্তমানে বাংলাদেশে তাদের পরিবার নিয়ে সফর করছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন গতকাল সম্মাননা অনুষ্ঠানে ’৭১-এ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের ময়দানে লব্ধ নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশের উন্নয়নের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন।

 

ভারতীয় প্রতিনিধিদলের প্রধান লে. জেনারেল বিষ্ণুকান্তি চতুর্বেদী ১৯৭১ সালে ছিলেন একজন তরুণ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। তিনি বলেন, ‘৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধ করে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম বিশ্বের কোনো স্থানেই ঘটেনি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের সঠিক কারণ ছিল। পাকিস্তানিরা বাংলাদেশিদের সঙ্গে নানাভাবে বৈষম্য করছিল। তারা ভুল ছিল। এ কারণেই আমরা বাংলাদেশকে যুদ্ধে সহায়তা করার জন্য তৈরি হয়েছিলাম। তবে সে সময় বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যেভাবে দেশ রক্ষার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তা সত্যিই বিরল। বাংলার মানুষের এত সমর্থন না থাকলে এ বিজয় এত দ্রুত অর্জন সম্ভব হতো না। আমরা ভারতীয়রা শুধু বাংলার মানুষকে যুদ্ধে সহায়তা করেছি।’ মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এখন বিশ্বে একটি সফল দেশ।’ বাংলাদেশ আগামী দিনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আরও সফল হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

 

৯০ বছরের মেজর জেনারেল (অব.) রাজেন্দ্রনাথ ১৯৭১ সালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেন। বয়সের ভার শরীরকে না ছাড়লেও স্বাধীনতাযুদ্ধের কথা জানতে চাইতেই তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অশীতিপর এই জেনারেল বলেন, ‘কৃষ্ণনগর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেই দেখেন এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। রাস্তাঘাট নেই, ক্ষুধার্ত মানুষ। হিন্দু-মুসলিম সবাই এক অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের মধ্যে রয়েছে। ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে কিছুটা সময় লেগেছিল। কিন্তু সপ্তম নৌবহর দ্রুত প্রবেশ করতে পারে—এমন আশঙ্কায় শীতের শুরুতেই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ভারত।’ তিনি বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, ‘মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী সহজে অগ্রসর হয়েছে।’ এছাড়াও বাংলাদেশ সরকারকে তাদের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ধন্যবাদ দিয়ে বলেন, ‘এ সম্মান দেওয়ার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। এত বছর পর সহযোদ্ধাদের সঙ্গে ’৭১-এর স্মৃতিচারণ করে আমরা সত্যিই শিহরিত।’ রিয়ার অ্যাডমিরাল কে মোহন ’৭১ সালে ছিলেন ভারতীয় নৌবাহিনীর একজন তরুণ কর্মকর্তা। স্মৃতি রোমন্থন করে তিনি বলেন, ‘আমি মূলত মেরিন পাইলট। আমি বঙ্গোপসাগর, মংলা ও চালনায় যুদ্ধ করেছি।’ মেজর জেনারেল পি কে বাত্রা ১৯৭১ সালে ছিলেন মেজর। তিনি জানান যশোর, খুলনা, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও কুষ্টিয়ায় যুদ্ধ করেছেন।  অনুষ্ঠানে তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ’৭১-কে কখনো ভুলতে পারব না। এটা গর্বের বিষয় যে, আজ আমরা সবাই এখানে একত্রিত হতে পেরেছি।’

 

অনুষ্ঠানে মিত্রবাহিনীর যোদ্ধাদের মধ্যে আরও ছিলেন লে. জেনারেল তিয়ারী (অব.), ব্রিগেডিয়ার বলরাম মেহতা (অব.), কর্নেল মানমোহন মালিক (অব.), লে. কমান্ডার ভি কে রায়জাদা (অব.) প্রমুখ। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক সেনাপ্রধান লে. কর্নেল হারুন অর রশিদ (অব.), কর্নেল জাফর ইমাম (অব.), প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, আনোয়ারুল আলম শহীদ, অধ্যাপক আবদুল মান্নান চৌধুরী। এছাড়াও ছিলেন ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু, বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফের কন্যা মেহজাবিন খালেদ এমপি, শহীদ তনয়া ডা. নুজহাত চৌধুরী, শমী কায়সার প্রমুখ।