গড় আয়ু বেড়ে ৭০ বছর ৮ মাস

এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু কিছুটা বেড়েছে। ২০১৪ সালের হিসাবে তাঁদের গড় আয়ু ৭০ দশমিক ৭ বছর। এর আগের বছর ছিল ৭০ দশমিক ৪ বছর।
অন্যদিকে পুরুষের চেয়ে নারীরা গড়ে বেশি দিন বাঁচেন। গড়ে নারীরা ৭১ দশমিক ৬ বছর বাঁচেন। পুরুষেরা ৬৯ দশমিক ১ বছর বাঁচেন। বিবিএস বলছে, পুরুষদের চেয়ে নারীদের টিকে থাকার ক্ষমতা বেশি থাকায় তাঁরা অপেক্ষাকৃত বেশি দিন বাঁচেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ ২০১৪ সালের মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকসের ফলাফলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। বিবিএস গড় আয়ুর হিসাবটি করেছে ভগ্নাংশ হিসেবে। তবে গড় আয়ুর বছর, মাস ও দিনের হিসাবে একজন বাংলাদেশি এখন গড়ে ৭০ বছর ৮ মাস ১২ দিন বাঁচেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হার অপরিবর্তিত রয়েছে। ২০১৪ সালে ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বেড়েছে। এর আগের বছর এ হারই ছিল। তবে এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১২ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল ১ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
গতকাল রোববার এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিবিএস। এ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
অন্যদিকে নারীদের আগের চেয়ে আরও কম বয়সে বিয়ে হচ্ছে। নারীর বিয়ের গড় বয়স কমে গেছে। ২০১২ সালে যেখানে নারীদের বিয়ের গড় বয়স ছিল ২০ দশমিক ১ বছর। পরের দুই বছরে তা আরও কমে যায়। সর্বশেষ ২০১৪ সালে এসে এ গড় বয়স ১৮ দশমিক ৫ বছরে নেমেছে।
তবে পুরুষেরা আগের চেয়ে বেশি বয়সে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন। পুরুষদের বিয়ের গড় বয়স এখন ২৫ দশমিক ৯ বছর। ২০১২ সালে তাঁদের বিয়ের গড় বয়স ছিল ২৪ দশমিক ৭ বছর। বিবিএসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়ে, শহরের চেয়ে গ্রামের নারীদের অপেক্ষাকৃত অল্প বয়সে বিয়ে হয়। শহরে গড়ে ১৯ দশমিক ৭ বছরে বিয়ে হয়। আর গ্রামে এ গড় বয়স ১৮ দশমিক ৩ বছর।
বিবিএস বলছে, ১০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের মধ্যে এখন ৬৫ দশমিক ৪ শতাংশই বিবাহিত। এ ছাড়া নারীদের ৯ দশমিক ১ শতাংশই বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা আলাদা থাকেন। এ দুটি সূচকেই আগের বারের চেয়ে পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে। আর পুরুষের মধ্যে ৫৯ দশমিক ৯ শতাংশই বিবাহিত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘নারীর বিয়ের গড় বয়স কমে যাওয়ার বিষয়টি বেশ উদ্বেগের। নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে আমরা কত এগোচ্ছি, দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। এ সূচকে নিম্নগতির কারণে মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যুসহ অন্য সূচকে যে অর্জন রয়েছে, তা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। নারীদের বিয়ের বয়স হ্রাসের বিষয়টি ঠেকাতে হবে।’
রাশেদা কে চৌধূরী আরও বলেন, ‘আমরা শুনতে পাচ্ছি, আইনে সংশোধনী এনে ১৬ বছরে নারীদের বিয়ে হলেও শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়া হতে পারে। তাহলে সামাজিক অর্জনগুলো ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হবে।’ অল্প বয়সে বিয়ে ঠেকাতে সরকারি-বেসরকারি সব উদ্যোগ কাজে লাগানোর পরামর্শ দেন তিনি।
বিবিএসের এ জরিপের প্রকল্প পরিচালক এ কে এম আশরাফুল হক বলেন, প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর মাসের মধ্যে সামগ্রিকভাবে মাঠপর্যায় থেকে যে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, তাই জরিপের ফলে এসেছে। বিসিএস শুধু তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক হারের মতো মোট প্রজনন হার অপরিবর্তিত রয়েছে। বিবিএসের হিসাবে, ২০১৪ সালে প্রজনন হার ২ দশমিক ১১ শতাংশ। এর মানে হলো ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী প্রজননসক্ষম মা সারা জীবনে গড়ে ২ দশমিক ১১ সংখ্যায় সন্তান জন্ম দেন। তবে পাঁচ বছর আগে অর্থাৎ ২০০৯ সালের হিসাবে, প্রত্যেক মা সারা জীবনে গড়ে ২ দশমিক ১২ সংখ্যায় সন্তান জন্ম দিতেন।
প্রতিবছর বিবিএস ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস প্রকাশ করে থাকে। এ পরিসংখ্যানের মাধ্যমে একজন মানুষের জীবনের জন্ম, মৃত্যু, আয়ুষ্কাল, বিবাহের মতো অবধারিত বিষয়ের চিত্র উঠে আসে।
শিক্ষা: সাত বছর এবং এর বেশি বয়সের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশই শিক্ষিত। তাঁরা স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। এ বয়সী জনগোষ্ঠীর পুরুষদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৭ শতাংশ ও নারীদের ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ স্বাক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন। শহরে সাক্ষরতার হার ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ, আর গ্রামে ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ। এ বছরের ব্যবধানে সব সূচকেই অগ্রগতি হয়েছে।
মৃত্যু: ২০১৪ সালের হিসাবে, স্থূল মৃত্যু, সব বয়সী শিশুমৃত্যু, মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসে আরও অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি এক হাজার এক বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে গড়ে ৩০ জনের মৃত্যু হয়। নানা ধরনের রোগ-বালাইয়ে বেশি মৃত্যু হয়। আর জীবিত জন্ম হয়, কিন্তু এক মাস বয়স হওয়ার আগেই মারা যায়, এমন নবজাতকের সংখ্যা প্রতি হাজারে ২১। গ্রামে এ সংখ্যা ২১, আর শহরে ১৯। আর একইভাবে এক থেকে ১১ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে প্রতি হাজারে গড়ে ৯ জন মারা যায়। আর এক থেকে চার বছর বয়সীদের মধ্যে এ সংখ্যা হাজারে ২। পাঁচ বছরের নিচে প্রতি হাজারে গড়ে ৩৮ জন শিশু মারা যায়।
অন্যদিকে সন্তান জন্মদানের সময় প্রতি এক লাখ মায়ের মধ্যে গড়ে ১৯৩ জন প্রসবজনিত জটিলতার কারণে মারা যান। আর একটি নির্দিষ্ট এলাকায় এক বছরে এক হাজারের মধ্যে গড়ে ৫ দশমিক ২ জন মারা যান। এটি স্থূল মৃত্যুহার।
আলোচনা: অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনাসচিব সফিকুল আজম বলেন, জাতীয় পরিকল্পনার সাফল্য নির্ভর করে বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যানের ওপর। এ প্রতিবেদনের তথ্য-উপাত্ত সামনের জাতীয় পরিকল্পনায় কাজে লাগবে।
বিশেষ অতিথি পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম বলেন, তথ্যপ্রমাণভিত্তিক পরিকল্পনা খুবই জরুরি। তাই বিবিএসকে শক্তিশালী করা হচ্ছে।
আইসিডিডিআরবির ইমেরিটাস বিজ্ঞানী আবদুর রাজ্জাক বলেন, দেশে প্রজনন হারের পাশাপাশি মৃত্যুহারও কমছে। এর মানে হলো তরুণ জনগোষ্ঠী বাড়ছে। এ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানই এখন বড় চালেঞ্জ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিবিএসের মহাপরিচালক আবদুল ওয়াজেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিবিএসের প্রকল্প পরিচালক এ কে এম আশরাফুল হক। এ ছাড়া বক্তব্য দেন পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের (এসআইডি) সচিব কানিজ ফাতেমা, ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রধান পুষ্টিবিদ অনুরাধা নারায়ণ প্রমুখ।