ডিজিটাল পাঠ্য বইয়ের জগতে ঢুকছে দেশ

যুগ যুগ ধরে শিক্ষার্থীরা পড়ে আসছে—রক্তের তিন কণিকা। লোহিত কণিকা, শ্বেতকণিকা ও অনুচক্রিকা। এই কণিকাগুলোর একটি আবছা ছবিও পাওয়া যায় বইয়ের পাতায়, যা থেকে শিক্ষার্থীরা তেমন কিছু না বুঝেই শুধু মুখস্থ করে যায়। এমনকি এই কণিকাগুলো কিভাবে কাজ করে তাও মুখস্থ করেই পরীক্ষার হলে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। রক্তের কণিকাগুলো কোনদিক দিয়ে কোনদিকে যায় তা মুখস্থ করে পুরোটা লেখাও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু আগামী বছরের মার্চ থেকে শিক্ষার্থীদের মুখস্থের দিন শেষ হচ্ছে।

ক্লিক করলেই দেখা যাবে রক্তের তিন কণিকা। এই কণিকাগুলো কিভাবে থাকে, কিভাবে কাজ করে তা ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেখতে পারবে। ফলে মুখস্থ না করেও ঠিকই মনে রাখতে পারবে শিক্ষার্থীরা।

এত দিন ডিজিটাল বই বলতে পিডিএফ আকারের বইকেই বোঝাত, যা বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই চালু করেছে এনসিটিবি (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড)। কিন্তু এটা আসলে ডিজিটাল বই নয়। ছাপা বইয়ের সঙ্গে এর কোনো পার্থক্য নেই। এবার আক্ষরিক অর্থেই ডিজিটাল বই পাবে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের পাঠ্যসূচিতে যেসব বিষয় থাকবে সেসবের বিস্তারিত বর্ণনার সঙ্গে থাকবে ভিডিওচিত্রও। ফলে শিক্ষার্থীরা সহজেই বিষয়ের ভেতরে ঢুকতে পারবে।

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, আগামী মার্চের মধ্যেই প্রথম থেকে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত ডিজিটাল বই হাতে পাবে শিক্ষার্থীরা। এরই মাধ্যমে ডিজিটাল পাঠ্য বইয়ের জগতেও প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। প্রাথমিকের প্রথম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি, গণিত; দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি ও গণিত; তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় এই ১৭টি বিষয়ের ডিজিটাল বুক তৈরি করা হবে। আর মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণির সব বিষয়ের ডিজিটাল বই তৈরি হবে। ভবিষ্যতে অন্য সব শ্রেণির বই ডিজিটাল করা হবে।

জানা যায়, শহর এলাকার এখন প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ল্যাপটপ, কম্পিউটার রয়েছে। এ ছাড়া এনড্রয়েড ফোনও রয়েছে প্রায় প্রতি বাড়িতে। এই ডিজিটাল বই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) ওয়েবসাইটে দেওয়া থাকবে। সেখান থেকে ডাউনলোড করে শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল বই পড়তে পারবে। এ ছাড়া মাধ্যমিকের প্রায় ২৩ হাজার স্কুল, মাদ্রাসা এবং প্রাথমিকের সাড়ে সাত হাজার বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম করা হয়েছে। তাদের কাছে এই ডিজিটাল বইয়ের সিডি পাঠানো হবে। মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মাধ্যমে এই ডিজিটাল বই পড়াবেন শিক্ষকরা।

শিক্ষার মানোন্নয়নবিষয়ক টিচার্স কোয়ালিটি ইমপ্রুভমেন্ট (টিকিউআই) প্রকল্পের মাধ্যমে ষষ্ঠ শ্রেণির ডিজিটাল বই তৈরি করা হচ্ছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের মাধ্যমে এই ডিজিটাল বইয়ের কনটেন্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ বইগুলোতে কাগজের বইয়ের চেয়ে বেশি ব্যাখ্যামূলক শিক্ষা সংযুক্ত করা হবে। শব্দার্থ, ব্যাখ্যা, এনিমেশন, রঙিন ছবি, প্রয়োজনীয় ভিডিও সংযুক্তি বইগুলোকে আরো সহজ ও আনন্দময় করে তুলবে।

এসব বিষয়ে টিকিউআই প্রকল্প পরিচালক বনমালী ভৌমিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের টার্গেট সব শিক্ষার্থীর হাতে ট্যাব তুলে দেওয়া। এ ছাড়া বেশির ভাগ বিদ্যালয়েই মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অনেকেই এখন বই আনতে চায় না। সেই ভাবনা থেকেই এই ডিজিটাল বুক। অন্যান্য দেশেও এ ধরনের বই চালু আছে। বিবিয়ানা গ্যাসফিল্ডে কী আছে তা মুখস্থ করার চেয়ে এর ভিডিও দেখলে সহজেই মনে রাখতে পারবে। আমাদের কনটেন্ট তৈরির কাজ শেষ। চলতি মাসের মধ্যেই এটা আমরা এনসিটিবির কাছে হস্তান্তর করব। তারা টেন্ডার আহ্বান করে পরবর্তী কাজ শেষ করবে। ফেব্রুয়ারির মধ্যেই এ কাজ শেষ হয়ে যাবে। মার্চেই শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল বই হাতে পাবে।’

জানা যায়, আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে এবং এনসিটিবির সিলেবাসের আলোকে ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে প্রাথমিকের ১৭টি বিষয়ে ডিজিটাল বুক তৈরি করা হচ্ছে। আইসিটি বিভাগ চার কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যয়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যেই এ কাজ শেষ হবে। এরপর তা এনসিটিবির ওয়েবসাইটের পাশাপাশি সিডি আকারে বা পেনড্রাইভে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পাঠানো হবে। শিক্ষকরা মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে শিশুদের পড়াবেন।