তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, অনুকরণীয় দেশ

বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয় বরং অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয় একটি দেশ- এ কথা এখন যে কেউ অকপটে স্বীকার করে নেবেন। আজ বিজয়ের ৪৪তম বার্ষিকী পালন করছে বাংলাদেশ। সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটিতে। বিশাল এ জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশ আজ বিস্ময়কর উত্থানের পথিক বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৭৩-৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রাজস্ব বাজেট ছিল ২৮০ কোটি টাকা। রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেট মিলে চলতি অর্থবছরে তা প্রায় এক লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা। স্বাধীনতার পর প্রথম দশকের (১৯৭২-৮১) তুলনায় গত দশকে (২০০২-১১) টাকায় গড় জিডিপি ২৮ গুণ বেড়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে (১৯৭৩-৮০) বাংলাদেশে গড়ে ৩.৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রবৃদ্ধির হার যেখানে ৩ শতাংশ সেখানে সাড়ে ৬ শতাংশেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে বাংলাদেশ। ঢাকায় সফররত বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উড়ন্ত সূচনার পর্যায়ে রয়েছে। বিনিয়োগের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৯ শতাংশের সমপরিমাণ। আগামী কয়েক বছরে এ বিনিয়োগ আরও ৩-৪ শতাংশ বৃদ্ধি করতে পারলে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন খুবই সম্ভব। তাহলে বাংলাদেশ ‘এশিয়ান টাইগার’ দেশগুলোর একটিতে পরিণত হবে। কৌশিক বসু আরো বলেন, ‘২০০৮ সাল থেকে বিশ্বমন্দা চলছে। এর মধ্যেও এ বছর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি সাড়ে ৬ শতাংশ হবে। পৃথিবীর মাত্র ৫-১০টি দেশে এমন প্রবৃদ্ধি হবে।’ তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের সামনে দুটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হলো দুর্বল অবকাঠামো এবং ব্যবসায় প্রশাসনিক জটিলতা। অবকাঠামো খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ দরকার। আর ব্যবসায়ের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করতে হবে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩১ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করে। অন্যদিকে পাকিস্তানের রপ্তানি আয় হয় ২৪ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলার। কেবল রপ্তানি বাণিজ্যই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতেও বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা আমদানি-নির্ভরতা অনেকটাই কমিয়েছেন, যতটা পারেনি পাকিস্তান। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রায় সাড়ে চার দশক পর শুধু পাকিস্তানই নয়, বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে ভারতসহ অনেক নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিজয়ের ৪৪ বছরের মাথায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এখন আমাদের অর্থনীতির অন্যতম ভরসা হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ যে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছে তার মূলে ভূমিকা রাখছে এই রেমিট্যান্স। স্বাধীনতার আগে বিশ্ব শ্রমবাজারে বাঙালি কর্মীর সংখ্যা ছিল একেবারেই নগণ্য। স্বাধীনতা যেন বিশ্বের কর্মদুয়ার খুলে দিয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য। বাংলাদেশের মানুষ আজ ছড়িয়ে পড়েছে দেশান্তরে। এদিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সব চাইতে বেশি অবদান রাখে তৈরি পোশাক শিল্প। এই শিল্প দেশিয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মোট প্রবৃদ্ধির ৬-৮% আসে পোশাক খাত থেকে। বাংলাদেশের এই শিল্পকে বর্তমানে উন্নয়নলীল দেশ এমনকি উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও অনুসরণ করছে। বিশ্বের বুকে নিজেদের কঠোর শ্রম দিতে পারার প্রমাণ মেলে এই শিল্পের মাধ্যমে। স্বাধীনতার পর গত চার দশকে স্ফীত ব্যাংকিং খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশ কার্যকর এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বুনিয়াদ গড়েছে, যা একদিকে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ় করেছে অন্যদিকে ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করেছে। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মাত্র ছয়টি ব্যাংক ছিল। পরে ১১টি সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংক স্থাপন করা হয়েছে। এর বাইরেও দেশে ৩৯টি বেসরকারি ব্যাংক রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি আন্তর্জাতিক। ৪৪ বছরের অর্থনীতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ নামে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল চালিকাশক্তি ছিল অর্থনৈতিক মুক্তির তীব্র আকাঙ্খা। সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশকে একটি দারিদ্র্যপীড়িত ও ভঙ্গুর অর্থনীতির হাল ধরতে হয়। দারিদ্র্য দূর করার জন্য যে হাতিয়ারগুলো থাকা প্রয়োজন, সেগুলোও বাংলাদেশের ছিল না। ছিল না অর্থ, ভৌত অবকাঠামো কিংবা দক্ষ জনশক্তি। বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভও তেমন ছিল না।’ গভর্নর জানান, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের এ ভঙ্গুর ও নাজুক আর্থসামাজিক অবস্থা দেখে অনেকেই হতাশ হয়েছিলেন এবং এর স্থায়িত্ব নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সত্তরের দশকের বাংলাদেশকে বিদেশি সাহায্যনির্ভর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। নরওয়ের অর্থনীতিবিদ ফাল্যান্ড ও ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ পারকিনসন বাংলাদেশকে বলেছিলেন ‘উন্নয়নের পরীক্ষাগার’। ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: টেস্ট কেস ফর ডেভেলপমেন্ট’- এ তারা লিখলেন, এ রকম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ যদি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন করতে পারে, তাহলে পৃথিবীর যে কোনো দেশের পক্ষেই উন্নয়নসাধন সম্ভব।আতিউর রহমান জানান, এ অর্থনীতিবিদদ্বয় ২০০৭ সালে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও সরে এসে লেখেন, তিন দশক ও তার বেশি সময়ের সীমিত ও বর্ণাঢ্য অগ্রগতির ভিত্তিতে মনে হয়, বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব। এককালের নেতিবাচক ধারণা পোষণকারীরা তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে এখন বাংলাদেশকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন অর্থাৎ সত্যিই বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল বলে মনে করেন দেশের প্রবীন অর্থনীতিবিদরা।