বাংলাদেশ এখন এশিয়ান টাইগার

২০২০ সালের আগেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হবে। তবে এজন্য বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এখন পর্যন্ত দেশের মোট জাতীয় আয়ের ২৯ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগ হচ্ছে। এ বিনিয়োগ যদি ৩৪ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নেয়া যায় তাহলে সহজেই প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হবে বলে মনে করেন বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু।
গতকাল রবিবার রাজধানীর শেরে বাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে (বিআইসিসি) এক গণবক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘বিশ্ব অর্থনীতি, বাংলাদেশ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এ বক্তৃতা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান। অনুষ্ঠান পরিচালনা ও সংক্ষিপ্ত প্রেজেন্টেশন দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবীদ ড. বিরূপাক্ষ পাল।
অধ্যাপক ড. কৌশিক বসু বলেন, দেশের উন্নয়নের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য দক্ষ অবকাঠামো ও ব্যবসায়িক নৈতিকতা একান্ত প্রয়োজন। এছাড়া বিদ্যুত্-গ্যাসসহ অন্যান্য অবকাঠামোও নিশ্চিত করতে হবে। চাহিদা মাফিক বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে হবে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি না হলে অর্থ বসে থাকবে না। এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাবে। এক দেশে থেকে মূলধন চলে যাবে অন্য দেশে। বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়িক নৈতিকতাকে অনেক বড় বিষয় হিসাবে উল্লেখ করেন তিনি।
চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে কাঙ্খিত অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য সুষম নীতি প্রণয়ন করতে হবে বলে মনে করেন কৌশিক বসু। এ নীতি গরিব বান্ধব না হলে দুর্নীতি উস্কে দেবে। এজন্য শুধু নীতি নয়, অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা – শুধু ভালো নীতি একটি অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারে না। এর জন্য নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থারও উন্নয়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটালেই অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, গরিবের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে অভ্যন্তরীণ নীতি প্রণয়ন করতে হবে। বিবেচনায় রাখতে হবে বিশ্বায়নের নানা প্রভাবের বিষয়টিও। গরিবেরা যদিও নীতিতে সুবিধা না পায় তাহলে দুর্নীতি জেকে বসবে। নীতিতে নানা ফাঁক- ফোকড় তৈরি হবে। ধনীরা যেন এগিয়ে আসে সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে ১৯৯২ সালে ঢাকায় আসেন কৌশিক বসু। তিনি বলেন, বাংলাদেশের গত ২২ বছরে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক বিভিন্ন উন্নয়ন তার চোখে পড়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বায়নের এ যুগে বাংলাদেশের উন্নয়ন শুধু এ দেশের উন্নয়ন নয়। এ উন্নয়ন সারা বিশ্বে প্রভাব ফেলে। দেশের অর্থনৈতিক বিভিন্ন সূচক ধরে ধরে বিশ্লেষণ করেন তিনি। বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার প্রশংসা করে বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বলেন, বাংলাদেশ এখন এশিয়ান টাইগার। বাংলাদেশের অর্থনীতি এশিয়ার নেতৃত্ব প্রদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। বাংলাদেশের অবস্থান ভৌগোলিক দিক থেকে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। আর বিশ্বায়নের যুগে এ সুবিধাকে কাজে লাগাতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের এ শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বৈষম্য কমাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। সরকারের পক্ষে সবার জন্য চাকরি তৈরি করা সম্ভব নয়। কিছু তরুণ উদ্যোক্তা হতে চায়। সবার জন্য চাকরি নিশ্চিত করতে না পারলেও তাদের জন্য ব্যবসায়িক পদ্ধতি সহজ করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য উন্নতি করা সহজ। কারণ শ্রম বাজার এখন সস্তা। এটাকে কাজে লাগাতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে ও দারিদ্র্য কমাতে শিক্ষা ও গবেষণাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের বড় একটি প্রতিযোগী দেশ। দেশটি বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। চলতি বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হবে। পরের বছর হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। এই অগ্রগতি ধারাবাহিক থাকলে চীনের সমপর্যায়ে চলে যাবে। এক সময় চীনের কাছে যেতে পারবে কোন দেশ, এটি কল্পনাই করা যেত না।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে যা অন্যান্য দেশের অনুসরণ করার মতো। গত ২২ বছর আগে যখন বাংলাদেশে এসেছিলাম তখন, ঢাকার রাস্তাঘাট ফাঁকা দেখা গেছে। গতকাল রাত ১০টার সময়েও ট্রাফিক জ্যামে পড়েছি। এতে  বোঝা যাচ্ছে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
২২ বছর আগের ও বর্তমানে অবস্থা তুলনা করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আর্থিক অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। তখন মাথাপিছু আয় ৩৩০ ডলার থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে ৭৫০ ডলার হয়েছে। রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় দ্রুত বাড়ায় রিজার্ভ ২৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২২ বছর আগে ছিল মাত্র ৭-৮ বিলিয়ন ডলার। জিডিপিতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) শূন্য থেকে বেড়ে এক শতাংশের কাছাকাছি গেছে। বিনিয়োগ বাড়লে অর্থনীতি বাড়ে। বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের মত অস্থিতিশীল বাজারও বাংলাদেশ ভালভাবে মোকাবেলা করছে। সামাজিক সূচকে এই অঞ্চলের দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অগ্রগতি সবার চেয়ে বেশি। দারিদ্র্য দ্রুত কমছে। আয়ুস্কাল ১৯৯২ সালে ছিল ৬১ বছর এখন তা ৭১ বছর। অথচ ভারতীয়দের আয়ুস্কাল এখন ৬৮ বছর। মাতৃ মুত্যুহার প্রতি হাজারে ৯২ জন থেকে কমে ৩১ জনে নেমে এসেছে। অথচ ভারতে ৮৪ থেকে কমে এখন ৩৮ জন।
সমাপনী বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতির অবস্থান তুলে ধরেন। এসময় তিনি রিজার্ভ নিয়ে বলেন, আমরা আমাদের বড় এ রিজার্ভ নিয়ে মোটেও উদ্বিগ্ন নই। এটি নিয়ে ভবিষ্যতে কি কি করা যেতে পারে তা নিয়ে কাজ শুরু করেছি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিষয়ে  কৌশিক বসু বলেন, বেশি রিজার্ভ কোন সমস্যা নয়। বড় আকারের রিজার্ভ অনেক দেশেরই রয়েছে। তবে এটা শুধু বেশি থাকলেই হবে না। এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে।
প্রসঙ্গত, চারদিনের সফরে গত শনিবার বাংলাদেশে এসেছেন কলকাতার বাসিন্দা কৌশিক বসু। সাভার, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ এলাকায় সৌর বিদ্যুত্, এসএমই ঋণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ, মোবাইল ব্যাংকিং এবং স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন তিনি।