পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়

পদ্মা সেতু এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়। আকাশকুসুম কল্পনাবিলাসও নয়। এখন চোখ বন্ধ করেও দেখা যায় এর দৃশ্যমান কাজ। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু একসময় ছিল শুধু স্বপ্ন। সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সেতু নির্মাণ নিয়ে অবশ্য পানি অনেক ঘোলা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যখন ঘোষণা করলেন নিজেদের অর্থেই নির্মাণ হবে পদ্মা সেতু, তখন কতজন কত ধরনের বক্রোক্তি করেছেন। নিজস্ব টাকায় এ সেতু তৈরি করা হলে অন্যান্য উন্নয়ন কাজ থেমে যাবে, এমন সমালোচনাও সরকারপ্রধানকে শুনতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কোনো সমালোচনাকেই পাত্তা দেননি। নিজের সংকল্পে থেকেছেন স্থির। নিজস্ব টাকায় সেতুর কাজ শেষ করে দেখাবেন এটাই ছিল সার্বক্ষণিক চিন্তা। তাঁর সেই চিন্তা ভাস্বর হয়ে উঠেছে। পদ্মা সেতুর কাজ ২৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আজ পদ্মা সেতু প্রকল্পের নদীশাসন ও মূল সেতু নির্মাণকাজের উদ্বোধন করবেন।

পদ্মা সেতু নির্মাণের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের। এই সেতু নির্মাণের সঙ্গে তাদের ভাগ্য পরিবর্তন জড়িত। দীর্ঘ নদী পাড়ি দিয়ে ওই অঞ্চলের মানুষকে রাজধানী ঢাকায় আসা-যাওয়া করতে হয়। সেতু চালু হলে এর অবসান হবে। পদ্মা সেতুতে রেললাইনও থাকবে। ফলে রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ সড়কপথে আসা-যাওয়ার সুযোগ ছাড়াও রেলপথ ব্যবহারের বাড়তি সুযোগ পাবে।

পদ্মা সেতু নির্মাণ ছিল বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জে সরকার সাফল্যের দিকে উড়ন্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এ সেতুর নির্মাণ-অভিজ্ঞতা সরকারের জন্য অনেক বড় সঞ্চয়। দেশের অন্যান্য সেতু নির্মাণে এই অভিজ্ঞতা বিশেষ কাজে লাগবে। সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নিজস্ব টাকায় এ সেতু নির্মাণ। প্রধানমন্ত্রী দেখিয়ে দিলেন, সাহস করে কোনো কাজে হাত দিলে তা সম্পন্ন করা যায়।

পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছে। এটা হয়েছে ঘরে-বাইরে। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের সঙ্গে দেশীয় একশ্রেণির লোক এই ষড়যন্ত্রে অংশ নেয়। পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করতে পারলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আকাশ ছুঁয়ে যাবে, এই ভয়ে সেতু যাতে তৈরি না হতে পারে সে ব্যাপারে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করা হয়। এদেশীয় একজন নামজাদা ব্যক্তি আমেরিকার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে ফোন করে বলান পদ্মা সেতুতে অর্থ না দেওয়ার জন্য। বিশ্বব্যাংকই এ সেতু নির্মাণে টাকা দিতে চেয়েছিল। ওই ফোন পাওয়ার পর বিশ্বব্যাংক অর্থ না দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

দেশের উন্নয়নের জন্য পদ্মা সেতুর অপরিহার্যতা সবারই জানা। এ সেতুর কল্যাণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নতি হবে শুধু তা-ই নয়, বিশাল এই সেতু আমাদের গোটা অর্থনীতির চাকাকে আরও বেগবান করে তুলবে। এ সেতুর কল্যাণে সেতুর দুই পাড়ে শত শত শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। ইতোমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা পদ্মার পশ্চিম পাড়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে জমি কেনা শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছেন পদ্মার পশ্চিম পাড়কে কেন্দ্র করে হংকংয়ের মতো আধুনিক নগরী গড়ে তোলাসহ বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও নির্মাণ করা হবে।

যে দ্রুতগতিতে পদ্মা সেতুর কাজ চলছে তা বিস্ময়করও বটে। তবে একথা বলতেই হবে যে, সরকার কোনো কাজে আন্তরিকতার পরিচয় দিলে সে কাজ ত্বরিতগতিতে এগোবেই। পদ্মা সেতুর কাজ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তদারকি করছেন। তাঁর স্বপ্নকে তিনি আজ নিজেই ছুঁয়ে দিতে পারছেন। এ আনন্দ সবার আগে তাঁরই হওয়ার কথা এবং দেশের মানুষও আনন্দবিহবল।

পরিশেষে বলতে চাই, নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে বর্তমান সরকার পদ্মা সেতুর কাজ কাক্সিক্ষত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। মানুষ যখন এ সেতুর ওপর দিয়ে চলাচল করবেন, তখন তারা ভাববেন বাংলাদেশের মানুষকে সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকতে হবে শেখ হাসিনার কাছে। কারণ তিনিই সব বাধা অতিক্রম করে জাতির জন্য এ সেতু উপহার দিয়েছেন। সেতু যখন খুলে দেওয়া হবে, বাংলাদেশ এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে- এটাও কোনো সন্দেহ না রেখেই বলা যায়।