আবারো ইতিহাস গড়লেন শেখ হাসিনা

ইতিহাস গড়েই চলেছেন ইতিহাস কন্যা, বঙ্গবন্ধু তনয়া বাংলাদেশের তিন তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের ১৭ মে, বৃষ্টিস্নাত বিকেলে পিতৃ-মাতৃহীন এবং স্বজন-পরিজনবিহীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে যে ইতিহাস গড়ার সূচনা করেছিলেন তা অব্যাহত আছে এবং তার ইতিহাসের পাতায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে ওয়াশিংটন ভিত্তিক একটি ম্যাগাজিনের জরিপ রিপোর্ট। বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ফরেন পলিসির অতি সাম্প্রতিক একটি জরিপে তিনি চিন্তা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিক থেকে পরিপক্বতা ও বিচক্ষণতার মাপকাটিতে একশজন ব্যক্তির মধ্যে ১৩তম স্থান অধিকার করেছেন। সাময়িকীটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় দেশ রক্ষার নীতি গ্রহণ করায় এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাড়াও ডিসিশন মেকার্স ক্যাটাগরিতে ১৩ জনের তালিকায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ও জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল রয়েছেন। ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনটির এটি হচ্ছে সপ্তম প্রকাশনা। ইতোপূর্বে যাদের নাম একই ক্যাটাগরিতে উঠেছিল তারা হলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি, মায়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের। মাত্র কয়েক মাস আগেই শেখ হাসিনা জাতিসংঘ কর্তৃক ভূষিত হয়েছেন চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কারে। এ পুরস্কারটিও দেয়া হয়েছিল ৩০ শতাংশ দারিদ্র্যের হার আর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকে জাতীয়ভাবে অগ্রাধিকার দেয়ায় এবং এটি হলো জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার।

ওই যে শুরুতেই উল্লেখ করেছি, ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনার ইতিহাস গড়ার সূচনা। অনেকেই হয়তো শেখ হাসিনার আরো অনেকগুলো সাফল্যের মতো এ বিষয়েও নাক সিটকাতে পারেন। বলতে পারেন, দলের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর দেশে ফিরে এসে দলের হাল ধরবেন সেটাই স্বাভাবিক আর সে জন্যই তাকে নেতা নির্বাচন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইতিহাস সৃষ্টির কি আছে? সাদামাটা চোখে বিবেচনা করলে প্রশ্ন করার অধিকার অবশ্যই তাদের আছে। কিন্তু একটু গভীরে গিয়ে চিন্তা করলেই বিষয়টি বোধগম্য হওয়ার কোনো কারণ নেই। শেখ হাসিনার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা একটি সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে হলেও ছাত্রজীবনের পর তিনি আর সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হননি। হয়ে গিয়েছিলেন পুরোপুরি গৃহকর্ত্রী। এ ছাড়া স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড এবং দেশের বৈরী রাজনৈতিক পরিবেশে আওয়ামী লীগের মতো একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করা এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্তটিও ছিল পরিপক্ব, বিচক্ষণতা ও সাহসিকতার দিক থেকে অবশ্যই যুগান্তকারী ঘটনা। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর যে বিষয়গুলো বিশেষ করে দেশকে মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীলতার ধারায় ফিরিয়ে আনা, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার ও রায় কার্যকর এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করার চ্যালেঞ্জ তার বাস্তবায়নও হচ্ছে তার সাহসী, যুগান্তকারী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেরই প্রতিফলন। কালের পরিক্রমায় আজ যে বিষয়টি ধ্রæব সত্য হয়ে ধরা দিয়েছে তাহলো, তিনি যদি সেদিন অভিমানভরে আন্তঃকলহে লিপ্ত, ভাঙাচোরা একটি দলের নেতৃত্ব গ্রহণে অস্বীকার করতেন অথবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে না আসতেন, তাহলে আমরা কি আজ গর্ব করে বলতে পারতাম, জাতি হিসেবে আমরা দায়মুক্ত হয়ে রাজাকারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছি। জাতির পিতা হত্যার বিচার করে জাতীয় কলঙ্ক মোচন করেছি। পিতৃ-হন্তারক হিসেবে আমাদের যে পরিচয় বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছিল তা মোচন করতে পেরেছি। সুতরাং শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল ঐতিহাসিক ও সময়ের দাবি।

অথচ তিনি না এলেও পারতেন। যে দেশে তার পিতা-মাতা আত্মীয়-পরিজন ঘাতকের হাতে নিহত হন দেশ ও জাতিকে ভালোবাসার কারণে, বাংলা আর বাঙালিকে স্বাধীনতার স্বাদ পাইয়ে দেয়ার অপরাধে। যে দলের নেতারা তার পিতার লাশ দাফন না করেই ছুটে যায় বঙ্গভবনে খুনি মুশতাকের মন্ত্রিসভায় স্থানলাভের প্রত্যাশায়, সেই দেশ, জাতি বা দলের প্রতিতো তার কোনো দায়বদ্ধতা নেই, থাকার কথাও নয়। তার পিতা জাতির জনক তো স্বপরিবারে জীবন দিয়ে সব দায় শোধ করে গেছেন রক্তঋণে। কিন্তু যার ধমনীতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত, যিনি মন ও মননে সারাক্ষণ মা ও মাটির জন্য ভালোবাসার টান অনুভব করেন, তিনি তো স্বার্থপর হতে পারেন না। দেশ ও জাতির সুখের চেয়ে, দলের লক্ষ-কোটি তৃণমূল নেতাকর্মীর জীবনের চেয়ে, তার প্রবাসে স্বামী-সংসার নিয়ে সুখের জীবন কাম্য হতে পারে না। তাইতো তিনি ছুটে এসেছিলেন সামরিক শাসক আর ঘাতকদের রক্তচক্ষুকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশ, জাতি ও দলের দায়িত্ব নিতে। পিতার অসমাপ্ত কাজ, দ্বিতীয় বিপ্লব তথা মুক্তির সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে। কেননা, বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে যদি অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন সম্ভব না হয়। সেই অর্থনৈতিক মুক্তির পথেই আজ আমরা এগিয়ে চলেছি।

এই যে দেশ ও জাতি হিসেবে আমাদের এগিয়ে যাওয়া, অকল্পিত যুদ্ধাপরাধী আর বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দেশকে ফিরিয়ে আনা, বৈশ্বিক পরিবেশ দূষণ মোকাবেলায় সফলতা, দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণেরও অধিক করা, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যুতায়ন, দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করা, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্থলে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ হওয়া, পদ্মাসেতুর মতো একটি মেগা-প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে সম্পন্ন করার সাহসী উদ্যোগ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সামরিক-বেসামরিক স্বৈরাচারদের জাঁতাকলে পিষ্ট গণতন্ত্রকে পুনরায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার লক্ষ্যে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া। তা কিন্তু একদিনে সম্ভব হয়নি। সে জন্য শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে অনেক।

১৯৮১ থেকে আজ অবধি শেখ হাসিনার চলার পথ কখনোই মসৃণ নয় এবং ছিল না কখনো। দেশে ফিরতে না ফিরতেই দেশীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড এবং স্বৈরশাসক এরশাদের ক্ষমতারোহণ। যাকে সরাতে সময় লেগেছে নয়টি বছর। এরপরও ষড়যন্ত্র হয়েছে, নিশ্চিত বিজয়কে সূ² কারচুপি আর মিডিয়া ক্যুর মাধ্যমে পাল্টে দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী স্বার্থান্বেষী মহলের প্রতিনিধিদের। শুরু থেকে এ পর্যন্ত শেখ হাসিনা মৃত্যু ঝুঁকিতে ছিলেন এবং এখনো আছেন। তার জীবনের ওপর হামলা হয়েছে কয়েকবার। স্বৈরশাসক এরশাদের সময়, সম্ভবত ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামে ট্রাকে হামলা এবং জোট সরকারের শাসনামলে খালেদা পুত্র তারেকের সরাসরি নির্দেশে একুশে আগস্ট গ্রেনডে হামলা ছিল ভয়াবহ। এখনো তাকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। এরশাদের সময় এবং সেনা সমর্থিত তিন উদ্দিনের শাসনামলে তাকে মিথ্যা অজুহাতে জেলে যেতে হয়েছে। মাইনাস টু (মূলত মাইনাস ওয়ান) ফর্মুলা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তাকে দেশে ফিরতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। মিডিয়ার কাছে তিনি কখনোই প্রিয়পাত্র হতে পারেননি। যেমন পারেননি তথাকথিত সুশীল নাগরিকদের কাছে। মধ্যরাতের ভাড়াটিয়া টকারদের কাছে তিনি চক্ষুশূল। মিডিয়া মাফিয়ারা শ্রেণি স্বার্থের কারণেই সব সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল এবং এখনো আছে।

কিন্তু তিনি সব প্রকার বাধা অতিক্রম করে, নিজের জীবনের ঝুঁকিকে তুচ্ছ করে এগিয়ে গিয়েছেন অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে। দেশ ও জাতির প্রতি দায়বদ্ধতা এবং প্রতিশ্রæতিশীলতাই তাকে স্বপ্ন পূরণের এ যাত্রাপথে অকুতোভয়ে এগিয়ে যেতে শক্তি ও সাহস জুগিয়েছে এবং জোগাচ্ছে। আছে মানুষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস। তিনি জানেন এবং বিশ্বাস করেন সততা, নিষ্ঠা আর আত্মপ্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে গেলে জনগণ তার পাশে থাকবেই। যেমন ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। বাংলা এবং বাঙালির প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসায় যেমন খাদ ছিল না, তেমনি ঘাটতি ছিল না বিশ্বাস ও আস্থাশীলতায়। তিনি শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গবন্ধু থেকে জাতির পিতা হয়েছেন। তাঁর আগে ও পরে অনেক পণ্ডিত-রাজনীতিতে বিশেষজ্ঞ এবং জনপ্রিয় অনেক নেতাই ছিলেন কিন্তু তারা জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে পারেননি, মা ও মাটির প্রতি ভালোবাসায় খাদ ছিল বলে। বঙ্গবন্ধু ইতিহাস হয়েছেন, ইতিহাস গড়েছেন। আবার অনেকেই হয় ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছেন অথবা বিতর্কিত হয়েছেন কেউ বা হয়েছেন খলনায়ক। বঙ্গবন্ধু যে কেবল দেশেই সমাদৃত হয়েছেন তা কিন্তু নয়। তিনি দেশের গণ্ডি পেরিয়েও পরিণত হয়েছিলেন বিশ্বনেতায়। তাকে জুলিওকুরি বিশ্ব শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছিল। কিউবার কিংবদন্তি প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ট্রো বলেছিলেন, আমি বাংলাদেশ দেখিনি, শেখ মুজিবকে দেখেছি। তিনি বিশ্বসভায় দাঁড়িয়ে বলতে পেরেছিলেন, বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে।

পিতার মতো কন্যাও আজ দেশ ছাড়িয়ে বিশ্বে বিচক্ষণ ও বাস্তব পরিকল্পনা এবং পদক্ষেপ গ্রহণ করার কারণে প্রশংসিত হচ্ছেন। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে শতভাগ আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখার পাশাপাশি, কোনো পরাশক্তির অন্যায় আবদারের কাছে মাথানত না করে, পাশে দাঁড়াচ্ছেন শোষিত-বঞ্চিত মানুষের, বিশ্ব শান্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সব অমীমাংসিত সমস্যা সমাধানে রাখছেন ইতিবাচক ভূমিকা। নিজের দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি আর সন্ত্রাসের জনপদের তকমা ঘুচিয়ে পরিণত করেছেন শান্তি ও সমৃদ্ধির দেশে। সৃষ্টি করে চলেছেন দেশ ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন নতুন ইতিহাস। পিতার মতোই অকুতোভয় আর দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছেন সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে ইতিহাস কন্যা শেখ হাসিনা। বুকে শতভাগ বিশ্বাস আমরা করব জয় একদিন।