বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভুটানে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে বাংলাদেশ

বিদ্যুৎ উৎপাদনে এই প্রথমবারের মতো ভুটানে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বিনিয়োগোর বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নীতিগত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বলে জানালেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ।

এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভুটান-বাংলাদেশ যৌথ কোম্পানি গঠন করে সেদেশে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। উৎপাদিত এ বিদ্যুতের ২ হাজার মেগাওয়াট বাংলাদেশে আমদানি করা হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।

মঙ্গলবার বিকালে পান্থপথের দৈনিক আমাদের অর্থনীতি পত্রিকা কার্যালয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনাকালে এসব কথা বলেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালের মহাপরিকল্পনা অনুয়ায়ী সকলের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে ২৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে জ্বালানি তেল, আমদানিকৃত কয়লা, নিজস্ব কয়লা, গ্যাস, নিউক্লিয়াস, এলএনজি এবং রিজিওনাল কান্ট্রি থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এছাড়া ২০৩০ সালের মহাপরিকল্পনায় জ্বালানি তেল থেকে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট, রিজিওনাল কান্ট্রি থেকে আমদানি ৬ হাজার ৮০০, নিজস্ব কয়লা দিয়ে ১০ হাজার ১০০, গ্যাস দিয়ে ৮ হাজার ৫০০, সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে ৫০০, নিউক্লিয়াস, এলএনজি ও আমদানিকৃত কয়লা দিয়ে ১২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ভারত থেকে বর্তমানে দৈনিক ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে। শিগগিরই আরও ৫০০ মেগাওয়াট আমদানি করা হবে। সেজন্য বাংলাদেশের ভেড়ামারা হয়ে ভারতের বহরামপুর বিদ্যুৎলাইন ও সাবস্টেশনগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। এ লাইনের মাধ্যমেই আরও ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হবে। এছাড়া আগামী ডিসেম্বরেই আসছে ভারতের ত্রিপুরা থেকে ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

দ্বিতীয় পদক্ষেপ হিসেবে ৪০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ ক্ষমতাসম্পন্ন ভুটানে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে যৌথভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে বাংলাদেশ। এখান থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের ২ হাজার মেগাওয়াট বাংলাদেশে আনা হবে। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন দেশে বিক্রি করা হবে। এতে লাভবান হবে বাংলাদেশ।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নসরুল হামিদ বলেন, দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে তা থেকে উৎপাদন খরচ অনেক বেশি পড়ে। তাছাড়া বিদ্যুৎ সেক্টরে দক্ষ জনবলের অনেক অভাব রয়েছে। সে কারণে রিজিওনাল কান্ট্রি থেকে বিদ্যুৎ আমদানি ও ভুটানে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

কয়লা প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এত বিপুল বিদ্যুৎ উৎপাদনে দেশের ৫টি খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের জন্য পরিবেশ অনুযায়ী উš§ুক্ত বা ভূগর্ভস্থ পদ্ধতির সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে ভিজিবিলিটি স্টাডির মাধ্যমে নানা দিক বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আমদানিকৃত কয়লা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য রামপাল, মহেশপুর এবং মাতারবাড়িতে ১৩২০ মেগাওয়াট করে ৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। এগুলো ২০২১ সালের মধ্যেই উৎপাদনে আসবে। এছাড়া এলএনজি, নিউক্লিয়াস আমদানি করে মাতারবাড়িতে বিদ্যুতের হাব গড়ে তোলা হচ্ছে।

প্রাকৃতিক গ্যাস প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে আমাদের যে গ্যাস মজুদ আছে তাতে আগামী ১৩ বছর চলতে পারে। তাই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আবাসিক ও ইকোনোমিক জোন ছাড়া শিল্পে নতুন করে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে না। তবে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত ১১০টি অর্থনৈতিক জোনে স্থাপিত কারখানায় গ্যাস সংযোগ দেওয়া হবে। আবাসিকে পাইপ লাইনের গ্যাস বন্ধ করে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহারের জন্য নির্দেশ দেওয়া হবে। এলপিজি সিলিন্ডারে কিভাবে ভর্তুকি দেওয়া যায় সেদিকেও চিন্তা করছে সরকার। আবাসিকে ব্যবহƒত ১২ ভাগ গ্যাস শিল্পে দেওয়া হবে।

জ্বালানি তেল প্রসঙ্গে নসরুল হামিদ বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তায় তেল সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিয়েছে বর্তমান সরকার। এজন্য দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির ধারণ ক্ষমতা দেড় লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ টন করা হচ্ছে। এজন্য ফ্রান্সের একটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই করেছে সরকার। তাছাড়া সহজে তেল পরিবহন ও চুরি ঠেকাতে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত সরাসরি পাইপলাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। বিমানের জ্বালানি জেট ফুয়েল সহজে সরবরাহেরও কাজ চলছে। ইতোমধ্যেই চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরে এ ব্যবস্থা করা হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের তামাবিলে মাটির গভীরে পাথরের সন্ধান পাওয়া গেছে। মাটির এত গভীর থেকে কিভাবে পাথর তোলা যায় সেজন্য বিশেষজ্ঞদের মতামত চাওয়া হয়েছে।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মাথাপিছু ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর পর্যায়ক্রমে বিদ্যুতের দাম কমিয়ে দেওয়া হবে। তখন উৎবৃত্ত বিদ্যুৎ খোলা বাজারে অন্য দেশে বিক্রি করা হবে।

আলোচনা সভায় আমাদের অর্থনীতি পত্রিকার সম্পাদক নাঈমুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে অন্যদ্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আমাদের সময় ডটকমের সম্পাদক নাসিমা খান মন্টি, আমাদের অর্থনীতি পত্রিকার উপসম্পাদক বিশ্বজিৎ দত্ত প্রমুখ।