বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণের আহ্বান

নজিরবিহীন নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিশ্ব নেতাদের অংশগ্রহণে সোমবার থেকে প্যারিসে শুরু হয়েছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২১। সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পৃথিবী এবং এর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানোর জন্য একটি সার্বজনীন জলবায়ু চুক্তিতে উপনীত হতে বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। দুর্যোগ মোকাবিলায় জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর প্রতি বাংলাদেশের দৃষ্টান্তকে কাজে লাগানোর জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্যারিসের আকাশে সূর্যের দেখা না মিললেও স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শুরু হয় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। শুরুতেই বিশ্ব নেতারা ১৩ নভেম্বর প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের স্মরণে দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করেন। এরপর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওঁলাদ উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন। তারপর জাতিসংঘরে মহাসচিব বান কি মুন বক্তব্য দেন।

প্যারিসের লা বারগেট সম্মেলন কেন্দ্রে জাতিসংঘের ২ সপ্তাহব্যাপী এ বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিয়েছে বিশ্বের ১৯৭টি দেশ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ১৫০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা যোগ দেন। এ রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমি পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মরকেল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সফর বাতিল করায় সম্মেলনে উপস্থিত হতে পারেননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ বলছে, বিশ্বের ইতিহাসে একদিনে কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের সর্বোচ্চসংখ্যক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান একত্রিত হয়েছেন।

মহাসচিব বান কি মুন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দেশের সীমান্তকে সম্মান করে না। ফলে বিশ্বের অনেক দেশ, অগণিত মানুষ এ নীরব ঘাতকের শিকার হচ্ছে। আমি চাই- আপনারা এবারের সম্মেলনে একটা কার্যকর চুক্তি করবেন, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা মোকাবিলায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তিনি বলেন, আমি বিশ্বাস করি, আপনারা সবাই শক্তিশালী। জলবায়ু ইস্যুতে আপনারা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করবেন। আপনারা আপনাদের শক্তি, সুচিন্তিত পরিকল্পনা দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণগুলো চিহ্নিত করে ক্ষতি কমিয়ে আনা এবং ক্ষতিপূরণে একমত হয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। বিজ্ঞানীদের উদ্ধৃত করে বান কি মুন বলেন, বিজ্ঞানীরা পরিষ্কার করে বলেছেন, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন ঘটছে। এটা মানুষের জীবনধারাকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে আমাদের উন্নত দেশগুলোর জীবনধারাকে পরিবর্তন করতে হবে। আসুন, আমরা আমাদের জীবনধারাকে সুসংহত করতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একযোগে কাজ করি। বান কি মুন বিশ্ব নেতাদের উদ্দেশে বলেন, পৃথিবী এবং এর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আপনাদের হাতে। এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আপনারাই পারেন প্যারিসে একটি অর্থবহ ও গতিশীল জলবায়ু চুক্তিতে উপনীত হতে।

প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলনের সভাপতি ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন ফাবিয়া তার বক্তব্যে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রশংসা করে বলেন, বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস মোকাবিলায় সারা বিশ্বে বাংলাদেশ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বড় বড় ৯টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো বাংলাদেশের এ দৃষ্টান্তকে অনুসরণ করতে পারে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ওঁলাদ বলেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এত উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক বৈঠক আর হয়নি। যেখানে বিশ্বের ১৫০টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা উপস্থিত হয়েছেন। কারণ একটাই, সবাই পৃথিবী ও এর ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে চিন্তিত। মানবজাতির সব প্রত্যাশা আজ আমাদের ঘিরে।

অবশ্য এবারের সম্মেলনের মূল কেন্দ্রে ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার বক্তব্য। দুপুর পৌনে ১টায় তিনি বক্তব্য রাখেন। ৩ মিনিটের বক্তব্যে ওবামা বলেন, পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। আমরা তাদের জন্য কী করছি, কী রেখে যাচ্ছি- তা তারা পর্যবেক্ষণ করছে। তাই পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বৈশ্বিক উষ্ণতার বিষয়ে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে সুর মিলিয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব সবাই জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হচ্ছেন। সবার জন্য এবারের জলবায়ু সম্মেলন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখান থেকেই আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি টিকিয়ে রাখতে হলে আমরা যারা এখানে এসেছি, সমবেত হয়েছি- সবাইকে একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তিতে আসতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ইস্যুটি এখন বিশ্বমানবতার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। তাই মানবজাতির স্বার্থে আমাদের একটা আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে আসতে হবে। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে আটকে রাখতে হবে।

প্রথা ভেঙে লিডার্স ইভেন্টের মাধ্যমে এবার জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন শুরু করা হয়েছে- যাতে সম্মেলনে আগত বিশ্ব নেতারা শুরুতেই বক্তৃতা করে সম্মেলনের আলোচনায় দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। ফলে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পরপরই শুরু হয় বিশ্ব নেতাদের বক্তৃতা। প্রথমেই বক্তৃতা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা। তার বক্তৃতার পরপরই বক্তব্য রাখেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মরকেল, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন প্রমুখ। তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন সন্ত্রাসীদের চেয়েও ভয়ঙ্কর। তাই প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত ১৩০ ব্যক্তির সম্মানে হলেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি চুক্তিতে উপনীত হওয়ার আহ্বান জানান তারা।

সন্ত্রাসী হামলার কারণে প্যারিসে জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনকে সফল করতে প্যারিসে কঠোর নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয়েছে। বিশ্ব নেতাদের উপস্থিতির কারণে দুই দিন ধরে প্যারিস শহরে সব ধরনের বেসরকারি যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। শুধু চালু রাখা হয়েছে সরকারি যানবাহন তথা বাস ও মেট্রো সার্ভিস। অবশ্য প্যারিসবাসীর চলাচলের জন্য এ দুই দিন তাদের যানবাহনে চলাচল ফ্রি করে দিয়েছে সরকার।

প্যারিস হত্যাকান্ডে নিহতদের শ্রদ্ধা জানালেন ওবামা : জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেয়ার আগে প্যারিসে বোমা ও বন্দুকধারীদের গুলিতে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ১৩ নভেম্বর প্যারিসের কয়েকটি স্থানে এ হামলায় ১৩০ জন নিহত হন। শুধু বাটাকল কনসার্ট হলেই নিহত হন শতাধিক ব্যক্তি। ওবামা বাটাক্লঁ কনসার্ট হল পরিদর্শন করে নীরবতা পালন করেন। এদিকে জলবায়ু সম্মেলনকে কেন্দ্র করে প্যারিসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ করমর্দন করেছেন।