কার্বন নিঃসরণ ২০ ভাগ কমাবে বাংলাদেশ

২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ নিজস্ব সম্পদ ব্যয় করে ৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করেছে। আর আন্তর্জাতিক সহায়তা পেলে কমাবে আরও ১৫ শতাংশ। জ্বালানি, পরিবহন ও শিল্প খাতে এই কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকার করে বাংলাদেশ তার প্রতিবেদন জাতিসংঘে জমা দিয়েছে।
৩০ নভেম্বর থেকে ফ্রান্সের প্যারিসে শুরু হতে যাওয়া বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ-২১-এর আগে বিশ্বের সবগুলো রাষ্ট্র তাদের কার্বন নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা বিষয়ে প্রতিবেদন বা আইএনডিসি জমা দেবে বলেছিল। গত ১ অক্টোবরের মধ্যে বাংলাদেশসহ ১১৯টি রাষ্ট্র তাদের আইএনডিসি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম দেশ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরে প্রতিবেদনটি জমা দেয়।
কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়িত হলেই কি বিশ্ব পরিবেশের ক্ষেত্রে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে? জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি গত সপ্তাহে তাদের দ্য অ্যামিশন গ্যাপ-২০১৫ প্রতিবেদনে বলছে, ওই ১১৯টি দেশ যদি তাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর পুরো অঙ্গীকার বাস্তবায়নও করে, তাতেও বিশ্বের তাপমাত্রা সাড়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো বাড়বে। আর রাষ্ট্রগুলো তাদের অঙ্গীকার পূরণ না করলে মোট গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির পরিমাণ ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে।
তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি বাড়লে বিশ্বে যে পরিমাণে দুর্যোগ বাড়বে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে, তাতে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের পরিবেশগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট দেখা দেবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বিশ্বের আট কোটি উপকূলবাসীকে বসতভিটা হারাতে হতে পারে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক আইনুন নিশাত এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের কার্বন নিঃসরণ কমানোর কথা বলাটা বিশ্ববাসীর জন্য একটা উদাহরণ। বাংলাদেশ চায় এর ফলে যেন শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলোও কার্বন কমানোর ব্যাপারে এগিয়ে আসে। তিনি জানান, প্যারিস সম্মেলনের মূল কাজ হবে প্রধান শিল্পোন্নত ৩৯টি দেশ এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশ চীন, ভারত, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রাজিলের কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য চাপ দেওয়া।
‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয়ভাবে অনুমিত অঙ্গীকার (আইএনডিসি)’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ২০৫০ সালের মধ্যে সব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বিশ্বের সর্বাধুনিক ‘সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির’ আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বায়ুচালিত কেন্দ্র থেকে, এক হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে উৎপাদন করবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ সড়কের চেয়ে রেলের যাত্রীর সংখ্যা ২০ শতাংশ বাড়ানো এবং যানজট কমিয়ে যানবাহনের কার্বন নিঃসরণ ১৫ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনার কথা জানায়। কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার এমনভাবে বাড়ানোর কথা বলেছে, যাতে চাষের কাজে গরুর ব্যবহার ৫৫ শতাংশ কমবে। জৈব সারের ব্যবহার ৩৫ শতাংশ ও কম্পোস্ট সারের ব্যবহার ৫০ শতাংশ বাড়ানোর কথাও বলা হয় প্রতিবেদনে।
আইএনডিসি প্রতিবেদনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অভিযোজন ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কত টাকা লাগবে, সেই হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। বলা হয়েছে, ২০১৫ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় মোট চার হাজার কোটি ডলার লাগবে। আর ১০টি খাতে অভিযোজন বাবদ লাগবে চার হাজার ২০০ কোটি ডলার।
এ ব্যাপারে জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলের (জিসিএফ) পর্যালোচনা কমিটির সদস্য আহসান উদ্দিন আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত আলোচনার শুরুতে মূলত শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকারের বিষয়টি যুক্ত ছিল। পরবর্তীকালে শিল্পোন্নত রাষ্ট্রগুলো চালাকি করে কার্বন নিঃসরণের ওই অঙ্গীকার বিশ্বের সব দেশের ওপরে চাপিয়ে দেয়। এ বছর তারা কার্বন নিঃসরণ কমানোর অঙ্গীকারের কথা না বলে আরও চতুরভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর জন্য অবদান শব্দটি যোগ করেছে। অর্থাৎ কোন দেশ কী পরিমাণে কার্বন নিঃসরণ কমাবে, তা স্বাধীনভাবে নির্ধারণ করবে। আর দেশগুলো কার্বন কমাল কি না, তা দেখা বা তদারকির কোনো ব্যবস্থাও থাকল না।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই) ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ চীন। এ দেশটি একাই বিশ্বের মোট কার্বনের ২৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ নিঃসরণ করছে। এর পরেই রয়েছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৫ শতাংশ, ভারত ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। আর মাথাপিছু বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলো যথাক্রমে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাপান, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ব্রাজিল, মেক্সিকো ও ব্রাজিল।
ডব্লিউআরআইয়ের হিসাবে, শিল্পবিপ্লবের পর থেকে অর্থাৎ ১৮৫০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত মোট কার্বন নিঃসরণের দিক থেকে বিশ্বে সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পরে যথাক্রমে চীন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, রাশিয়া, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, ভারত, জাপান, কানাডা ও মেক্সিকো।
কারা ক্ষতিগ্রস্ত: জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যানেল ইউএনএফসিসি গত বৃহস্পতিবার বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন রোধে শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত প্রয়াস নেওয়ার আহ্বান জানায়। ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন নাউ ২০১৫’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে প্রধান কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলোকে গ্রিনহাউস গ্যাস কমানোর জন্য প্যারিস সম্মেলনে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জার্মানভিত্তিক গবেষণা সংস্থা জার্মান ওয়াচের ‘ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বেশির ভাগই দরিদ্র। বাংলাদেশ ওই তালিকায় সব সময়ই প্রথম সারিতে রয়েছে।
জার্মান ওয়াচের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষতিগুলো হয়েছে তা বিচারে শীর্ষ ১০টি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকা করেছে। তাতে দেখা গেছে, ওই ১৯ বছরে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে ফিলিপাইনে, সংখ্যায় ৩২৮টি। এর পরেই রয়েছে বাংলাদেশ, ২২৮টি দুর্যোগ আঘাত হেনেছে এখানে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মোট ক্ষতি ও ঝুঁকির বিবেচনায় শীর্ষে রয়েছে হন্ডুরাস। আর বাংলাদেশের অবস্থান ৬ নম্বরে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯ বছরে বাংলাদেশের মোট জিডিপির ১ দশমিক ২ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর মোট আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩১২ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার মার্কিন ডলারের। এ দুই দিক থেকেই বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়।