পুঁজিবাজার সংস্কারে ২০০০ কোটি টাকা দিচ্ছে এডিবি

বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের উন্নয়নে আরো ২৫ কোটি ডলার অর্থাৎ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। গতকাল রবিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে এনইসি সম্মেলন কক্ষে ঋণদাতা সংস্থাটির সঙ্গে সরকারের এ-সংক্রান্ত একটি চুক্তি সই হয়েছে।

এদিকে শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল নিজ কার্যালয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়ার (এসইবিআই) মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।

এডিবির ঋণ : ‘বাজেট সহায়তার’ অংশ হিসেবে দুই ধাপে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ঋণ দেবে এডিবি। গতকাল এ-সংক্রান্ত চুক্তিতে সই করেন বাংলাদেশের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব সাইফুদ্দিন আহমেদ এবং এডিবির পক্ষে ঢাকায় নিযুক্ত সংস্থাটির আবাসিক প্রধান কাজুহিকো হিগুইচি।

সূত্র জানায়, তৃতীয় পুঁজিবাজার উন্নয়ন কর্মসূচিতে ঋণ দেওয়ার আগে এডিবি বাংলাদেশ সরকারকে ২৬টি শর্ত পূরণের পরামর্শ দিয়েছিল। পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন, বিচারের প্রক্রিয়া শুরু করা, এসইসির কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় করা, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ বা আইডিআরএ-কে শক্তিশালী করা, পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিভিন্ন আইন সংশোধন করাসহ শর্তগুলোর মধ্যে সরকার আটটি পূরণে সক্ষম হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রথম ধাপে আট কোটি ডলার ছাড় করবে এডিবি। আর দ্বিতীয় দফায় ১৮ মাসের বাকি শর্ত পূরণ করতে পারলেই মিলবে ঋণের বাকি ১৭ কোটি ডলার। তৃতীয় পুঁজিবাজার উন্নয়ন

কর্মসূচিটি (সিএমডিপি-৩) আগামী ২০১৭ সালে শেষ হবে। এ প্রকল্পের আওতায় এসইসির বিভিন্ন আইন ও বিধি, আইডিআরএর আইন ও বিধি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু আইন পরিবর্তন ও পরিমার্জন করা হবে।

এই ঋণচুক্তি ছাড়াও এডিবির সঙ্গে গতকাল একটি প্রকল্প চুক্তিও সই হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক মো. সাইফুর রহমান এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) সদস্য কুদ্দুস খান নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রকল্প চুক্তিতে সই করেন।

অনুষ্ঠানে এডিবির আবাসিক প্রধান কাজুহিকো হিগুইচি বলেন, দ্বিতীয় উন্নয়ন কর্মসূচিতে সফলতা আসায় এডিবি তৃতীয় পর্যায়ে পুঁজিবাজার উন্নয়নে আরো ২৫ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে সরকারকে। তৃতীয় প্রকল্পের আওতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসির কৌশল ও নীতিমালায় পরিবর্তন আসবে। এর ফলে এসইসি আরো শক্তিশালী হবে। ২০২০ সালের মধ্যে সরকার মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশে উন্নীত করতে চায়, সে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে দরকার বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো। ২০১০ সালে বাংলাদেশে পুঁজিবাজারে যে ধস নেমেছিল, সেখান থেকে বিনিয়োগকারীদের বাঁচাতে ওই বছর এডিবি ৩০ কোটি ডলার ঋণ দিয়েছিল। সে প্রকল্পে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

যুগ্ম সচিব সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘তৃতীয় পুঁজিবাজার উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে (সিএমডিপি-৩) এডিবি ২৫ কোটি ডলার বাজেট সহায়তা দেবে। ২ শতাংশ হারের সুদে ১০ কোটি ডলার সহজ শর্তের ঋণ (এডিএফ), আর বাকি ১৫ কোটি ডলার কঠিন শর্তের ঋণ (ওসিআর)। পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২৫ বছরে বাংলাদেশ এ ঋণ পরিশোধ করতে পারবে। এ ছাড়া ১৫ কোটি ডলার তিন বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ১৫ বছরে শোধ দেওয়া হবে। এ ঋণের সুদের হার নির্ধারিত হবে লন্ডন ইন্টার ব্যাংকের (লাইবর) ভিত্তিতে।’

আইডিআরএর সদস্য কুদ্দুস খান বলেন, ‘বীমা খাত নিয়ন্ত্রণ করতে এখনো অনেক বিধিবিধান প্রণয়নের প্রয়োজন রয়েছে, সেখানে এই অর্থ ব্যয় হবে।’

‘শেয়ারবাজারে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুন’ : বাংলাদেশ ও ভারতে শেয়ারবাজার ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গতকাল একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ সমঝোতা স্মারকে সই করেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ও সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়ার (এসইবিআই) চেয়ারম্যান।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুই দেশের শেয়ার মার্কেট উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক একটি মাইলস্টোন হিসেবে বিবেচিত হবে। দুই দেশের জনগণের অর্থনৈতিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে এই এমওইউ অর্থনৈতিক বিকাশে বিপুল সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি জোরদারে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে অন্যতম প্রধান উৎসব ক্যাপিটাল মার্কেট। বাংলাদেশ সরকার একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ, টেকসই ও শক্তিশালী ক্যাপিটাল মার্কেট গড়ে তুলতে অব্যাহত চেষ্টা চালাচ্ছে।’

শেয়ারবাজার সংস্কারে গৃহীত পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এসব সংস্কার উদ্যোগ বিএসইসিকে ক্যাটাগরি ‘বি’ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নয়নে সহায়ক হবে। ক্যাপিটাল মার্কেটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিনিয়োগকারীদের, বিশেষ করে তরুণদের শেয়ার মার্কেট সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিতে আর্থিক বিষয়ে শিক্ষা ছাড়াও সক্ষমতা সৃষ্টিতে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শিল্প-কারখানা ও অবকাঠামো উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পুঁজি সংগ্রহে বাংলাদেশ সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সব সময়ই সজাগ থাকবে এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এ ক্ষেত্রে সরকার বিএসইসিকে সব ধরনের সহযোগিতা দেবে।”

প্রধানমন্ত্রী শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেন, ‘দেশ ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে শেয়ারবাজারে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করুন।’

অনুষ্ঠানে দুই কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও প্রধানমন্ত্রীর অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা মসিউর রহমান উপস্থিত ছিলেন।