সোহাগের ‘আলোর ভুবন’

‘এসো পড়ি, দেশ গড়ি’ স্লোগানে রাজশাহী নগরীতে সম্পূর্ণ ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে তোলা পাঠাগার এখন জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছে। অজানা তথ্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান ইতিহাস, ঐতিহ্য সবকিছুর খোঁজ মেলে এখন এ পাঠাগারে। জ্ঞানের মশাল প্রজ্বলিত করার দৃঢ় প্রত্যয়ে এক যুবক নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন এ পাঠাগার।

রাজশাহী কেন্দ্রীয় কিশোর পাঠাগার নামের এ জ্ঞানভাণ্ডারে বসে এখন জ্ঞান আহরণ করে নিজেকে যোগ্য করে তোলা যায়। এ পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা যুবকের নাম সোহাগ আলী। নগরীর তেরখাদিয়া উত্তরপাড়া এলাকায় পাঠাগারের নিয়মিত সদস্য রাজশাহী কলেজের ম্যানেজমেন্ট দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আলী হোসেন। তিনি জানান, অবসর পেলেই এ পাঠাগারে বসেন তিনি। আহরণ করেন অজানা তথ্য। এখানে অনেক বই আছে, যেখান থেকে জ্ঞান আহরণ করে নিজেকে যোগ্য করে তোলা যায়। অবসরে খোশগল্প কিংবা আড্ডা না দিয়ে কিছুটা সময় হলেও কেন্দ্রীয় কিশোর পাঠাগারে সময় কাটান তিনি। সেখানে গিয়ে নতুন কোনো বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারেন। পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা সোহাগ আলী বলেন, ‘জ্ঞানের মশাল প্রজ্বলিত করার দৃঢ় প্রত্যয়ে ‘এসো পড়ি, দেশ গড়ি’ স্লোগানকে সামনে রেখে ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি মাত্র ১৮টি বইকে পুঁজি করে শুরু করি কেন্দ্রীয় কিশোর পাঠাগার। ক্ষুদ্র পরিসরে শুরু হলেও পাঠাগার তৈরির অদম্য ইচ্ছা থেকে পিছুটান ছিল না। নিজের বলতে তেমন কিছু নেই। অভাব-অনটনের সংসার। তাই বলে পাঠাগার তৈরি হবে না! নিজের ইচ্ছা ও আগ্রহের কাছে হার মানেননি সোহাগ। প্রায় দেড় যুগ ধরে অল্প অল্প করে সেই পাঠাগারে বই কিনে এখন পরিণত হয়েছে সমৃদ্ধ তথ্যভাণ্ডার। আবার কেউ আগ্রহী হয়ে কিছু বই উপহার দিয়েছেন। বর্তমানে পাঠাগারটিতে তিন হাজার ১২৮টি বই আছে। পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন দুটি জাতীয় ও তিনটি আঞ্চলিক পত্রিকা সন্নিবেশিত করা হয়েছে পাঠ্য তালিকায়। এ ছাড়া দেশি ও বিদেশি পাঁচটি মাসিক ও ত্রৈমাসিক পত্রিকা রাখা হচ্ছে পাঠাগারটিতে। সোহাগ আলী বলেন, এই পাঠাগারের কারণে ওই এলাকার সামাজিক অবস্থায় পরিবর্তন এসেছে। কয়েক বছর আগে তেরখাদিয়া উত্তরপাড়া এলাকা বেকার ছেলেদের আড্ডার প্রিয় জায়গা ছিল। প্রায় সময় সেখানে যৌন হয়রানি, ছিনতাই, চুরির মতো ঘটনা ঘটত। তবে সে চিত্র এখন পরিবর্তন হয়েছে। সেখানে এখন শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে। তিনি জানান, পাঠাগারের নাম কিশোর হলেও সব শ্রেণির মানুষের জন্যই এটি উন্মুক্ত। আশপাশের শিশু থেকে বৃদ্ধদের মধ্যে পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্থাপিত হয় পাঠাগারটি। সেই থেকে প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলে এর কার্যক্রম। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পাঠাগারটিতে পাঠকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ জন পাঠক এখানে আসেন। এ ছাড়া পাঠাগারটির নিয়মিত সদস্য আছেন ১২০ জন। এ পাঠাগারে বাংলাদেশের পাঁচজন বিখ্যাত ব্যক্তির নামে নামকরণ করা হয়েছে পাঁচটি গ্যালারি। এগুলো হলো-কবিগুরু রবীন্দ্র গ্যালারি, নজরুল গ্যালারি, বেগম রোকেয়া গ্যালারি, বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীর গ্যালারি ও লালন শাহ গ্যালারি। এখানে রয়েছে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার জন্য আলোকচিত্র। ১৯টি আলেকচিত্র দিয়ে সাজানো হয়েছে ফিরে দেখা ১৯৭১ গ্যালারিটি। এখানে আছে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ৩ মার্চের অসহযোগ আন্দোলন, ২৫ মার্চের গণহত্যা, পাকিস্তানিদের হত্যা ও নির্যাতনের চিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা, ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণ ও বিজয়োল্লাসসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ছবি। পাঠাগার-সংলগ্ন দরিদ্র অসহায় ছিন্নমূল পিছিয়ে পড়া শিশুদের আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে গত বছর ১ জানুয়ারি সেখানে প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় কিশোর পাঠাগারে প্রতিদিন সকালে প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চলে। ৩০ জন ছাত্র-ছাত্রী এবং একজন শিক্ষিকা আছেন এখানে।

যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কেন্দ্রীয় কিশোর পাঠাগারে সাধারণ পাঠকদের জন্য রয়েছে কম্পিউটার কর্নার। এ কর্নারে একজন পাঠক বিনামূল্যে সর্বোচ্চ ২০ মিনিট কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারেন। শুধু কি তাই? এখানে আছে কৃষি কর্নারও। কেন্দ্রীয় কিশোর পাঠাগারে গত বছর ১০ জুন স্থাপিত হয় কৃষি কর্নার। কৃষি কর্নারে আছে বাংলাদেশে উৎপাদিত কয়েক জাতের ধানবীজ। বিভিন্ন জাতের দেশীয় ফল ও ক্যাকটাসের গাছসহ কৃষিবিষয়ক বই ও পত্রিকা। পাঠাগারে ছোট একটি র‌্যাকে শুরু হয়েছে মিনি সংগ্রহশালার কার্যক্রম। মুদ্রা, দেশ-বিদেশের ডাকটিকিট, গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র, কাঁসা-পিতল, ক্যামেরাসহ বেশকিছু পুরনো বিষয় স্থান পেয়েছে এ মিনি সংগ্রহশালায়।