জঙ্গি দমনে জিরো টলারেন্স

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে সরকার জিরো টলারেন্স কৌশল নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বুধবার মধ্যরাতে রাজধানীর গাবতলীতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আলবানী ওরফে মাহফুজ ওরফে হোজ্জা ভাই (৩৮) নিহত হয়। নিহত আলবানী ‘নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবির একটি জঙ্গি সেলের প্রধান’। পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে কোনো জঙ্গি নিহত হওয়ার এটি দ্বিতীয় ঘটনা। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহের ত্রিশালে পুলিশ ভ্যানে হামলা ও একজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে ২ জঙ্গি ছিনতাই করে জঙ্গিরা। ওই ঘটনায় পরবর্তীকালে জঙ্গি নেতা হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, রাষ্ট্র ও জনগণকে নিরাপদ করতে এ ধরনের চরমপন্থা কৌশল সামনের দিনগুলোয়ও অব্যাহত থাকবে। অপরাধী জঙ্গি না সন্ত্রাসী তখন এ বিবেচনা করা হবে না।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ রাজধানীর হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলা, আশুলিয়ায় পুলিশ হত্যা এবং সাভারে ব্যাংক ডাকাতির ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ৫ জেএমবি সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে জঙ্গি হামলা ও জঙ্গিবাদের পরিকল্পনার নানা তথ্য।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তার স্বার্থে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সে লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের টানা অবরোধ-হরতালে ঢাকায় যেন বড় ধরনের কোনো নাশকতামূলক কর্মকা-ের ঘটনা না ঘটে সেজন্য পুলিশ-র‌্যাবকে চরমপন্থা কৌশল নিয়ে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ওই নির্দেশনার পর রাজধানী রক্ষায় কঠোর অবস্থানে যায় পুলিশ। সে সময় ৫ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এক মাসে রাজধানীতে র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৮ জন নিহত হয়। তাদের মধ্যে জামায়াত-শিবির ও ছাত্রদল নেতাকর্মীও ছিলেন। ওই চরমপন্থা কৌশল অবলম্বনের পর ধাপে ধাপে গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ কমে আসে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে ইতালি নাগরিক, পরবর্তীকালে রংপুরে জাপানি নাগরিক হত্যা, পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে গলা কেটে হত্যা, পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলা, রাজধানীর গাবতলীতে পুলিশের এএসআই হত্যা, শাহবাগে প্রকাশক হত্যা, আশুলিয়ায় পুলিশ কনস্টেবল হত্যাসহ বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় রাষ্ট্র ও জননিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। সন্ত্রাসী হামলা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ অবস্থার মধ্যেই বুধবার রাতে গাবতলীতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে হোসেনি দালান গ্রেনেড হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ও অপারেশন কমান্ডার নিহত হয়। ভবিষ্যতে হোসেনি দালানের মতো সন্ত্রাসী ও জঙ্গি হামলায় জড়িতদের একই পরিণতি হবে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ব্যাপারে কঠোর হতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে।
২০০৫ সালে দেশজুড়ে সিরিজ বোমা হামলা ও পরবর্তীকালে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় বোমা হামলার ঘটনায় র‌্যাব ও পুলিশ বিপুল সংখ্যক জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে ছিলেন জেএমবির আমির শায়খ আব্দুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই, আতাউর রহমান সানিসহ জেএমবির বিভিন্ন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত অপারেশন কমান্ডার, এহসার সদস্য এবং গায়েরে এহসার সদস্য। এদের কেউই সে সময় র‌্যাব-পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়নি। তবে আত্মঘাতী হামলাকালে বেশ কয়েকজন আহত হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, কোনো পুলিশ সদস্য অথবা সাধারণ মানুষের ওপর হামলার চেষ্টা কিংবা সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি বা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর কেউ হামলা করতে এলে সেটি প্রতিরোধের যে কোনো ব্যবস্থা আমরা করব। এটি আমাদের দায়িত্ব। এজন্য যা যা করার দরকার আমরা করছি। পুলিশ আক্রান্ত হলে আত্মরক্ষার আইনগত অধিকার তাদেরও রয়েছে।
বন্দুকযুদ্ধে জঙ্গি দমন প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, যিনি নিহত হয়েছেন, তিনি জঙ্গি কিনা সেটা পুলিশই জানবে। ধরলে পরে তার কাছে অনেক তথ্যও জানার কথা। এভাবে জঙ্গি দমন করা গেলে সিরিয়াসহ অনেক রাষ্ট্রে এতদিন জঙ্গিমুক্ত হতো বলে মনে করেন তিনি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন আরও বলেন, শুধু রাইফেল দিয়ে জঙ্গি দমন হবে না, এর সঙ্গে আরও অনেক বিষয় আছে। জঙ্গি দমনে পুরো দেশবাসীকে একত্রিত করতে হবে।
৫ জেএমবি সদস্য গ্রেপ্তার
জেএমবি নেতা হোজ্জা ভাই নিহত হওয়ার পর রাজধানীর কয়েকটি এলাকা থেকে আরও পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ। তারা হলেনÑ চাঁন মিয়া, ওমর ফারুক ওরফে মানিক, শাহজালাল, হাফেজ কারি আহসান উল্লাহ মাহমুদ ও কবির হোসেন রাসেদ ওরফে আশিক।
পুলিশ বলছে, এরা আশুরায় পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে গ্রেনেড হামলা, আশুলিয়ার চেকপোস্টে পুলিশ হত্যা, সাভারে ব্যাংক ডাকাতি, ত্রিশালে আসামি ছিনতাই, খিজির খান হত্যাকা-ের ঘটনায় অংশ নিয়েছিল। তাদের কাছ থেকে একটি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ১২ রাউন্ড গুলি, একটি চাকু ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। এ ব্যাপারে বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে মহানগর পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, হোসেনি দালানে হামলার তদন্ত করতে গিয়ে ৫ আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের তথ্যের ভিত্তিতে বালুরমাঠে অভিযান পরিচালনা করতে গেলে হোজ্জা ভাই নিহত হয়। তখন জানতে পারি এরা জেএমবির সদস্য। আর মাহফুজ ওরফে হোজ্জা ভাই এবং রাশেদ ওরফে আশিক জেএমবির সুইসাইডাল স্কোয়াডের সদস্য। তারা হোসেনি দালানে বোমা হামলায় ‘সরাসরি’ অংশ নিয়েছিলেন। অন্যরা বাড়ি ভাড়া করে দেওয়া এবং অর্থ জোগানোসহ বিভিন্নভাবে এই জেএমবি সদস্যদের সহযোগিতা দিয়ে আসছিলেন।
মনিরুল ইসলাম বলেন, হামলাকারীদের টার্গেট ছিল মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদে হামলা করা। কিন্তু এরা জানতে পারে হোসেনি দালান শিয়াদের সবচেয়ে বড় মসজিদ। যে কারণে হামলাকারী কবির হোসেন ওরফে আশিক নিকটবর্তী কামরাঙ্গীরচরে একটি বাসা ভাড়া নেয়। হামলার টার্গেট ছিল ২২ অক্টোবর। কিন্তু এর মধ্যেই দারুস সালামে চেকপোস্টে এক পুলিশ সদস্যের ওপর হামলার ঘটনার পর এদের পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়। এরপর আশুরার দিন ২৩ অক্টোবর হোজ্জা ভাই নিজেই হামলা করে। চট্টগ্রামে পুলিশ হেফাজতে এক জেএমবি সদস্য বোমা বিস্ফোরণে নিহত হওয়ার কারণে এরা পুলিশ হত্যার টার্গেট করে।
যুগ্ম-কমিশনার আরও বলেন, গ্রেপ্তারদের মধ্যে চাঁন মিয়া জেএমবি জঙ্গিদের গাড়ি চালানোসহ গাড়ি চালনায় প্রশিক্ষণ দিতেন। গতবছর ২৩ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রিজন ভ্যানে বোমা হামলা ও গুলি চালিয়ে পুলিশ হত্যা করে জেএমবির মৃত্যুদ-প্রাপ্ত তিন জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার যে ঘটনা ঘটেছিল তাতে চাঁন মিয়া মিনি ট্রাক নিয়ে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। খিজির খান হত্যা ও সাভারে ব্যাংক ডাকাতিতেও সে গাড়িচালক ছিল। অন্যরা ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বাসা ভাড়া করে দিয়ে এবং অর্থের জোগান দিয়ে এই জেএমবি জঙ্গিদের কর্মকা- চালাতে সহযোগিতা দিয়ে আসছিল। জেএমবিতে যোগ দেওয়া এসব নতুন সদস্য এক সময় শিবিরকর্মী ছিল।
গত ২৩ অক্টোবর প্রথম প্রহরে পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে আশুরার তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির মধ্যে ওই বোমা হামলায় ১১৫ জন আহত হন। ওই রাতেই ঢাকা মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাজ্জাদ হোসেন নামের এক কিশোর এবং পাঁচদিন পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জামাল উদ্দিন নামে ৫৫ বছর বয়সী আরেকজনের মৃত্যু হয়। ঘটনার দুই দিন পর অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করে পুলিশ। এরপর দুই সপ্তাহ না যেতেই ৪ নভেম্বর সকালে সাভারের আশুলিয়ায় বাড়ইপাড়া তল্লাশি চৌকিতে হামলা চালিয়ে মুকুল হোসেন নামের এক কনস্টেবলকে হত্যা এবং আরও একজনকে জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় তিনজন।