মাছ উৎপাদনে এবারও বিশ্বে পঞ্চম বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি চাকরির পাঠ চুকিয়ে দেশে এসে কী করবেন তা নিয়ে সংশয়ে ছিলেন আকরাম হোসেন। এক বন্ধুর পরামর্শে গাজীপুরের পৈতৃক জমিতে মাছের খামার গড়ে তুললেন তিনি। ১৩ একর জমির ওই খামারে এখন তাঁর বছরে আয় কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ বছর মাছ চাষে সেরা হিসেবে জাতীয় পদকও পেয়েছেন।
আকরাম হোসেনের এই সাফল্য দেশের চাষের মাছেরই যেন প্রতীক। প্রায় ১৬ কোটি জনসংখ্যার এই ছোট্ট দেশটি এ বছরও মিষ্টি পানিতে মাছ উৎপাদনে বিশ্বের পঞ্চম স্থানটি ধরে রেখেছে। গত আগস্টে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) তাদের কৃষিবিষয়ক বৈশ্বিক পরিসংখ্যান প্রতিবেদন এগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিস্টিক্যাল হ্যান্ডবুক-২০১৫-তে এ তথ্য উল্লেখ করেছে।
২০১৪ সালে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে ওই একই অবস্থানে ছিল। তবে ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ চাষের মাছ উৎপাদনের দিক থেকে বিশ্বের চতুর্থ স্থানে রয়েছে বলে উল্লেখ ছিল। বাংলাদেশ এখন মাছ চাষে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণই নয়, ১০ বছর ধরে চাষের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি দেশের মধ্যে রয়েছে। ২ লাখ ৩০ হাজার মেট্রিক টন মিষ্টি পানির মাছ উৎপাদন করে শীর্ষে রয়েছে চীন। এর পরেই আছে ভারত, মিয়ানমার, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশ।
অথচ ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—অতীতের ওই সুখস্মৃতি একসময় ইতিহাস হয়ে গিয়েছিল। গত এক যুগে উন্নত জাতের চাষ বাঙালির সঙ্গে মাছের সখ্যকে আবারও ফিরিয়ে আনতে শুরু করেছে। আর তা সম্ভব হয়েছে দেশের মৎস্যবিজ্ঞানী ও চাষিদের সম্মিলিত চেষ্টায়। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ১৪টি মাছের নতুন জাত উদ্ভাবন এবং ৫০টি উন্নত প্রযুক্তি চাষিদের হাতে তুলে দিয়েছেন।
বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনকে সৃজনশীলভাবে মাঠে প্রয়োগ করার দিক থেকেও বাংলাদেশ এখন বিশ্বের অনুকরণীয়। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে মাছের ফলন যতটুকু পাচ্ছেন, চাষিরা খামারে তার চেয়ে বেশি পাচ্ছেন। এফএওর মতে, ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বের যে দেশগুলোতে মাছের চাষ সবচেয়ে বেশি বাড়বে, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ।
মাছচাষি ও বিজ্ঞানীদের এই যুগপৎ চেষ্টার ফলাফল হিসেবে দেশের মাছের উৎপাদন যেমন একদিকে বেড়েছে, অন্যদিকে বেশ কিছু মাছের দামও স্থিতিশীল রয়েছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশে রুই মাছের দাম তেমন বাড়েনি। বরং কই, পাঙাশ, কাতলা ও চিংড়ির দাম কমেছে।
২০১২ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ভিয়েতনাম-থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশ ক-এর শংকর করে নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করেছেন। তাঁরা পাবদা ও টেংরা মাছের নতুন চাষ পদ্ধতিও বের করেছেন। এই মাছগুলো এখন নদী ও বিল ছাড়াও কৃষকের খামারে উৎপাদিত হচ্ছে।
তবে মাছ চাষে এই সাফল্য এসেছে সরকারের বড় ধরনের সহায়তা ছাড়াই। দেশের কৃষিঋণের মাত্র ১০ শতাংশ মৎস্যচাষিরা পেয়ে থাকেন। ধান বা পাট রাখার জন্য সরকারি গুদাম থাকলেও মৎস্যচাষিদের জন্য এখনো কোনো হিমাগার নেই। তার পরেও মৎস্য খাতে বাংলাদেশকে বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ বলছে এফএও।
দেশের ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ফিশারিজ বিভাগ রয়েছে। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাছ চাষের নতুন জাত ও উন্নত চাষ পদ্ধতি এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া মৎস্যবিদেরা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে মৎস্যচাষিদের সহায়তা দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৪ সালে দেশে ৩৫ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এ বছর তা ৩৭ লাখ টন হবে বলে আশা করছে সংস্থাটি। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় এক লাখ টন চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ রপ্তানি করে এবং ১২ হাজার টন মাছ আমদানি করে থাকে। দেশে মাছের উৎপাদন ও চাহিদা এখন প্রায় সমান সমান।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক শেখ মোস্তাফিজুর রহমান এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশের মাটি-পানি ও আবহাওয়া মাছ চাষের জন্য অনুকূল। এখানকার জনসংস্কৃতির মধ্যে মাছ চাষের বিষয়টি জোরালোভাবে রয়েছে। ফলে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনগুলোকে চাষিরা দ্রুত প্রয়োগ করতে পারেন। এতেই দেশে দ্রুত চাষের মাছের উৎপাদন বাড়ছে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০১০ সালে দেশে মাথাপিছু দৈনিক মাছের ভোগ ছিল ৪৮ গ্রাম, গত বছর তা বেড়ে ৫২ গ্রাম হয়েছে। বর্তমানে দেশের প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। পাঁচ বছর আগেও যা ছিল ৫০ শতাংশ।
জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার (এফএও) মতে, ২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বে পুকুরে মাছ চাষ সবচেয়ে বেশি বাড়বে বাংলাদেশে। গত নব্বইয়ের দশকে দেশে মাছের চাষ বেড়েছিল উন্নত জাতের রুই ও পাঙাশ চাষের কারণে। গত দুই বছর ধরে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও বাংলাদেশের কই মাছের শংকর হিসেবে যে নতুন কইয়ের জাত উদ্ভাবন হয়েছে, তা সামগ্রিকভাবে দেশের মাছ উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়েছে।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোহাম্মদ জাহের এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, ‘১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত দেশে আমাদের উদ্ভাবিত রুই, পাঙাশ, তেলাপিয়া ও সিলভারকার্প মাছের চাষ সবচেয়ে বেশি হয়েছে। দুই বছর ধরে কই, টেংরা ও গুলশা মাছের চাষ সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া আমরা পাবদা, শিং, টেংরাসহ মোট ১৪ জাতের মাছের উন্নত চাষ কৌশল আমরা উদ্ভাবন করেছি, যা চাষিরা অনুসরণ করে উৎপাদন বাড়াচ্ছেন।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। রুই, পাঙাশ, কইসহ বেশ কিছু সাধারণ মাছের দাম দরিদ্র মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যেই থেকেছে। ফলে গত ১০ বছরে দেশে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ শতভাগ বেড়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে মাথাপিছু মাছের ভোগ বা খাওয়ার পরিমাণ যা বেড়েছে, তার ৭৬ শতাংশই আসছে পুকুর ও জলাশয় থেকে। ১৯৯০ সালে দেশে মোট চাষকৃত মাছ উৎপাদিত হয়েছিল ১ লাখ ৯৩ হাজার টন। ২০০০ সালে তা বেড়ে ৬ লাখ ৫৭ হাজার এবং ২০১৫-তে এসে তা ১০ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ও ইকো ফিশ প্রকল্পের দলনেতা আবদুল ওয়াহাব এ ব্যাপারে প্রথম আলোকে বলেন, দেশে নদীদূষণ ও ভরাটের কারণে মাছের উৎপাদন বেশ কমে গিয়েছিল। মাছে-ভাতে বাঙালি বলে আমরা যে গর্ব করতাম, তা হারাতে বসেছিলাম। গ্রামের সাধারণ কৃষক ও জেলেরা পুকুর ও ঘেরে মাছের উন্নত জাত চাষের মাধ্যমে গত ১০ বছরে দেশের মাছের উৎপাদন দ্বিগুণ করেছেন। বাঙালিও মাছের স্বাদ আবারও ফিরে পেতে শুরু করেছে।