পাহাড়ের জুমে নতুন তুলা

‘কার্পাস মহল’ পার্বত্য চট্টগ্রামের পুরনো নাম। পাহাড়ের জুমে ‘কার্পাস তুলা চাষের কারণে ব্রিটিশ আমলে এই নামকরণ হয়েছিল। এমনকি মোগল ও ব্রিটিশ আমলে এই তুলা দিয়ে খাজনা আদায় করত প্রজারা। কালের পরিক্রমায় কার্পাস তুলার চাষাবাদ কমে গেছে। সেই কার্পাস জাতের তুলার মতোই দেখতে ‘আমেরিকান তুলা’ পার্বত্য চট্টগ্রামে নতুন করে এসেছে। জুমের সাথি ফসল হিসেবে পরীক্ষামূলকভাবে আবাদ শুরু হয়েছে। এটি পাহাড়ি কৃষকদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) অর্থ ও কারিগরি সহায়তা নিয়ে তুলা উন্নয়ন বোর্ড এগিয়ে এসেছে।

পাহাড়ের প্রসিদ্ধ কার্পাস তুলা আজকাল নেই বললেই চলে। কিছু পাহাড়ি জুমিয়া ঐতিহ্য ধরে রাখতেই জুমের সঙ্গে নামমাত্র জুম তুলা বা পাহাড়ি তুলার চাষ করে। অনেকে এটিকে কার্পাস তুলা অথবা কুমিল্লা তুলা নামেও চেনে; যদিও তুলা উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এটিকে সেই ‘কার্পাস’ বলে মানছেন না। অবশ্য তুলা চাষে খুব আগ্রহ ছিল না পাহাড়ি জুমিয়াদের। তাই জুমের কৃষকদের উৎসাহিত করতে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের সহায়তায় পাহাড়ে ‘আমেরিকান তুলা’ এনেছে তুলা উন্নয়ন বোর্ড। দেখতে কার্পাস তুলার মতো এই তুলা করা হচ্ছে জুম ফসলের সঙ্গেই। বিশেষত দুই লাইন জুম ধানের সঙ্গে এক লাইন তুলা চাষের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে সাফল্য দেখিয়েছেন কৃষি গবেষকরা। তাতে খুশি জুমিয়া কৃষকরাও। জুমের সবজি, আদা, হলুদ, তিলসহ হরেক রকম ফসলের সঙ্গে এই তুলাও ভালো আবাদের আশা জাগাচ্ছে।

আমেরিকান তুলার বৈশিষ্ট্য

তুলা গবেষণা কর্মসূচির পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম বলেন, তুলাটির ধরন পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী কার্পাস তুলার মতো হলেও জেনেটিক্যালি পার্থক্য রয়েছে। স্থানীয় তুলায় বল (গোটা) ধরে নিচের দিকে, আর আমেরিকান তুলা ওপর মুখ করে। পাহাড়ি তুলার আঁশ স্বল্পদৈর্ঘ্য, অন্যদিকে উন্নত তুলার আঁশ ২৮ মিলিমিটারের বেশি হয়। পাহাড়ি তুলা এক বিঘায় যেখানে মাত্র ৪৫ থেকে ৫০ কেজি উৎপন্ন হয়, সেখানে আমেরিকান তুলা ১৫০ থেকে ২০০ কেজি হয়ে থাকে। কেবল তুলাই নয়, জুমের ধানও হয় বেশি।

তুলা উন্নয়ন বোর্ডের অতিরিক্ত পরিচালক আখতারুজ্জামান জানান, সমতলে চাষাবাদ হওয়া তুলাই হলো কার্পাস তুলা। ‘কার্পাস তুলা’ ‘আমেরিকান তুলা’ নামে নতুন করে পাহাড়ে এসেছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তথ্যটি সঠিক নয়। জমিতে চাষাবাদ হয় এমন সব তুলাকেই কার্পাস তুলা বলা হয় বলে দাবি করেন তিনি।

কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের (কেজিএফ) সাইট কো-অর্ডিনেটর তপন চৌধুরী জানান, প্রচলিত জুম চাষের সঙ্গে উন্নত জাতের তুলাটির চাষাবাদের প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কেজিএফ প্রযুক্তিগত ও অর্থ সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তুলা ও ধানের বীজ, সার, কীটনাশক, প্রশিক্ষণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, কেজিএফের আর্থিক সহায়তায় তিন বছর ধরে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে নতুন জাতের তুলা চাষের গবেষণা ও একই সঙ্গে প্রদর্শনী প্লট করা হচ্ছে। জুমের সঙ্গে তুলা চাষের গবেষণা শুরু হয় ২০১২ সালে। সেই গবেষণালব্ধ প্রযুক্তির মাধ্যমে গত দুই বছরে খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে এক হাজার ৪০০ চাষির জুমে ও সমতলে এই তুলার চাষাবাদ করা হয়েছে। মূলত জুম ধান উঠে যাওয়ার পরপরই তুলাগাছ দ্রুত বাড়ে। ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সীমিতভাবে উত্তোলন শুরু হবে।

মাটিরাঙার দক্ষিণ মুসলিমপাড়া এলাকার কৃষক করাইয়্যা মোহন ত্রিপুরা জুম চাষের নতুন ধারণায় অনেকটাই উল্লসিত। তিনি বলেন, গত বছর জুমের সঙ্গে তুলা চাষ করে তিনি লাভবান হয়েছেন। তাই এ বছর অন্যান্য জুমিয়াও তা দেখে উৎসাহিত হন। রাবার বাগান এলাকার মিতালি ত্রিপুরা ও বাদ্রা ত্রিপুরা তুলা বোর্ডের সহযোগিতায় এবার জুমে ধানের সঙ্গে আমেরিকান তুলার চাষ করেছেন। তাঁরাও নতুন প্রযুক্তির জুমের তুলা চাষে বেশ আগ্রহী।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হামিদুর রহমান বলেছেন, জুমের সাথি ফসল হিসেবে আমেরিকান উন্নতজাতের তুলা মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে পারলে বাংলাদেশের প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। তাতে জুমচাষিরা খাদ্য চাহিদা পূরণের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও স্বাবলম্বী হতে পারবে। বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক ড. ফরিদ উদ্দিন এ ব্যাপারে জানান, বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম তুলা আমদানিকারক দেশ। পাহাড়ের প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে আন্তর্জাতিক মানের এই তুলা উৎপাদন করা সম্ভব।

সম্প্রতি কৃষিসচিব শ্যামল কান্তি ঘোষ নিজেই কৃষকের মাঠে প্রযুক্তির সাফল্য দেখতে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙায় এসেছিলেন। তিনি উন্নতজাতের তুলা চাষের সফলতার ব্যাপারে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেন, পাহাড়ি মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে নতুন জাতের তুলাটি খুলবে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।