পরিসংখ্যান যাই বলুক ২০১৫-ই সেরা বছর

দুর্দান্ত একটা বছর কাটল বাংলাদেশ ক্রিকেটের। ব্যক্তিগত সাফল্যের দিন পেরিয়ে দলগত নৈপুণ্যেই এখন বিশ্ব কাঁপায় বাংলাদেশ। তো, বছরটা সত্যি সত্যিই কতটা ভালো কাটল-সেটাই ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরছেন নোমান মোহাম্মদ। আজকের পর্বে সফল বাংলাদেশ দল।

১৬ বছরের টেস্ট পরিক্রমায় সবচেয়ে সফল বছর নয় ২০১৫। ৩০ বছরের ওয়ানডের পথচলায়ও নয় এটি সফলতম সাল। ১০ বছরের টি-টোয়েন্টি জমানার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য একই কথা। এই ত্রিধারা স্রোত নিয়ে আসুন অভিন্ন মোহনায়। টেস্ট-ওয়ানডে-টিটোয়েন্টির মিলিত হিসাবেও তো বাংলাদেশের জন্য ২০১৫ সাল ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে/ উঁকি মারে আকাশে’র মতো অবস্থা নয়। অন্তত সে সাক্ষ্য দেয় না পরিসংখ্যানের পাতা।

হায়, পরিসংখ্যান যে আস্ত গাধা-প্রবাদটি তো আর শুধু শুধুই হয়নি!

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরশু দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি দিয়ে পর্দা নামে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটবর্ষের। সেটি যে সাফল্যের রামধনুতে কতটা রঙিন, অধিনায়ক-কোচের তৃপ্তির ঢেঁকুরে এর অকাট্য প্রমাণ। মাশরাফি বিন মর্তুজা বলেছেন যেমন, ‘এই বছরে ছেলেরা ভীষণ পরিশ্রম করেছে। আমি সত্যি ওদের প্রতি কৃতজ্ঞ। সেই সঙ্গে কৃতজ্ঞতা কোচিং স্টাফদের প্রতিও। বছরটা আমাদের জন্য সত্যি অনেক বড় ব্যাপার ছিল। ২০১৫ সালের সাফল্য নিয়ে আমি গর্ববোধ করি। আশা করি, ২০১৬ আরো ভালো ক্রিকেট খেলব।’ চন্দিকা হাতুরাসিংহে তো এক কাঠি বেড়ে এটিকে সফলতম বছরের তকমা লাগিয়ে দিতে দ্বিধাহীন, ‘টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর খুব সম্ভবত বাংলাদেশ সেরা বছর কাটাল। এবং আমাদের বর্তমান দলটিও হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা। এই বছরে ক্রিকেটারদের উন্নতির যে ক্রম, তাতে আমি খুব খুশি। টানা পাঁচটি সিরিজ জেতা সহজ নয়। কারণ কখনো কখনো এক-দুটি ম্যাচ খারাপ যেতেই পারে। কিন্তু আমরা ছিলাম খুব ধারাবাহিক।’

বাংলাদেশের এই ধারাবাহিকতা সত্যি বিস্ময় জাগানিয়া। বিশেষত ওয়ানডে ক্রিকেটে। বছরের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ নিয়ে কী জুজুটাই না ছিল সাধারণে! অচেনা উইকেট, অজানা কন্ডিশনের কারণে। অথচ সেই বিশ্বকাপে ঠিকই তো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় বাংলাদেশ! ইংল্যান্ডের মতো পরাশক্তিকে হারিয়ে। শেষ আটে ভারতের বিপক্ষে হারলেও তাতে ছিল বিতর্কের ছোপ। আম্পায়ারিংয়ের পক্ষপাত না থাকলে মেলবোর্নের সেই দ্বৈরথে এমনকি বাংলাদেশের জয় অসম্ভব ছিল না-এমন বিশ্বাসের পক্ষে এখনো জোর হাওয়া।

বিশ্বকাপের বিস্ময় হয়েই শেষ না। মাশরাফির দল এরপর দেশের মাটিতে দৈত্যবধ করে পর পর। এক না, দুই না, টানা তিন সিরিজে। পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ, ভারতের বিপক্ষে প্রথম দুই ম্যাচ জিতে সিরিজ নিশ্চিত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে প্রথম ম্যাচ হেরেও সিরিজ জয়-অকল্পনীয় বললেও তো তাতে কল্পনার সব রং লাগানো হয় না। ধারাবাহিকতায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানের জয় বড্ড অনুমেয়; একেবারে প্রত্যাশিত।

সব মিলিয়ে এ বছর ১৮ ওয়ানডের মধ্যে ১৩টিতেই বিজয়ের উল্লাস বাংলাদেশের। জয়ের অনুপাত ০.৭২ শতাংশ। তবু এটি কিনা জয়ের শতকরা হিসাবে সবচেয়ে সফল নয়। ২০০৯ সালে ১৯ ওয়ানডে খেলে ১৪ জয় ছিল যে! জয়ের অনুপাত ০.৭৩%। সে বছর বাংলাদেশে ত্রিদেশীয় সিরিজে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে একই প্রতিপক্ষের কাছে হারে দুই উইকেটে; জিম্বাবুয়ে বিপক্ষে জেতে তিন-তিনটি সিরিজ আর খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে আরেকটি-এই তো! ২০১৫-র দু’কূলপ্লাবী সাফল্যের সঙ্গে এর তুলনা চলে কিভাবে!

বাংলাদেশের এই ওয়ানডে সাফল্যের সঙ্গে অন্য দুই ফরম্যাটেরও তো তুলনা চলে না। তবু মন্দ আর কী করেছে! এ বছর পাঁচ টেস্ট খেলে চারটিতেই ড্র, হার মোটে এক ম্যাচে। না হয় ভারতের বিপক্ষে একটি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুটি ম্যাচে ব্যাট-বলের টুংটাংয়ের চেয়ে বৃষ্টির রিমঝিম সুরের দাপট ছিল বেশি। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে খুলনা টেস্টের ওই রূপকথামাখা প্রত্যাবর্তন বিশ্ব ক্রিকেট কি ভুলতে পারবে সহসা! তিন টেস্টের মধ্যে দুই জয় এবং এক হারে ২০০৯ সাল পরিসংখ্যানের বিবেচনায় বাংলাদেশের সফলতম। কিন্তু তামিম ইকবাল-ইমরুল কায়েসের বীরত্বপূর্ণ ব্যাটিংয়ের খুলনা টেস্টের সৌজন্যে চলতি বছরটিও স্মরণীয়।

টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ সড়গড় হয়নি এখনো। এ বছর পাঁচ ম্যাচ খেলে দুই জয়, তিন হার। এর মধ্যে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়টি আলাদা উল্লেখের দাবি রাখে। এক ম্যাচে শতভাগ জয়ের সুবাদে টি-টোয়েন্টিতে অভিষেকের সেই ২০০৬ সাল সফলতম হিসেবে দাবিদার। তবে ওই যে, পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের কারণে ২০১৫-কেও মনে রাখতে হবে।

তিন ফরম্যাট মিলিয়েও সাফল্যের হিসাবে ২০১৫-কে সবার ওপরে স্থান দিচ্ছে না পরিসংখ্যান। সেখানেও সবচেয়ে জ্বলজ্বলে ২০০৯। ২৫ ম্যাচের মধ্যে ১৬ জয়ে ০.৬৪ জয়ের অনুপাতে। ৩৩ ম্যাচে ১৯ জয়ে ০.৫৭ অনুপাত নিয়ে ২০০৬ রয়েছে এরপর। তৃতীয়তে এই ২০১৫। ২৮ ম্যাচে ১৫ জয়ে ০.৫৩ জয়ের অনুপাতে।

পরিসংখ্যানের আলোয় তাই ২০১৫ সাল সবচেয়ে আলোকিত না হতে পারে। কিন্তু ওসব নিয়ে ভাবতে বয়েই গেছে ক্রিকেটপ্রেমীদের! বাংলাদেশের জন্য অপূর্ব আলোকরেখায় আঁকা ছিল যে ২০১৫-র পথচলা! অপার্থিব আলোকের ঝরনাধারায় ভেজা আশ্চর্য এক সময় ছিল তা!

পরিসংখ্যান তাই যে সাক্ষ্যই দিক না কেন, ২০১৫ সাল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় খোদাই থাকবে সফলতম বছর হিসেবেই। এবং সেটি কোনো রকম সন্দেহ ছাড়াই!