বাংলাওয়াশেই শেষ হলো স্বপ্নের বছর

উসাইন বোল্টের দৌড়ের সময় ঠিক এভাবেই হাজার জোনাকি জ্বলে গ্যালারিতে, কাল যেমন জিম্বাবুয়ের শেষ উইকেটটি তুলে নিতে মাশরাফি বিন মর্তুজা স্লিপ থেকে পয়েন্টে আটজনের অর্ধবৃত্ত দাঁড় করাতেই জ্বলে উঠেছিল দর্শকদের সব মোবাইল। দৌড়ের প্রথম ৫০ মিটার পর্যন্ত টাইসন গে কিংবা আসাফা পাওয়েল ঘাড়ের ওপর নিঃশ্বাস ফেললেও সবার আগে ফিনিশিং লাইন অতিক্রম করেন জ্যামাইকান স্প্রিন্টারই, কাল যেমন এলটন চিগুম্বুরা আর শন উইলিয়ামস কিছুক্ষণ চোখ রাঙালেও জিতেছে বাংলাদেশই। সিরিজের ফল ৩-০, প্রত্যাশিতভাবেই।

প্রত্যাশিত ফলে আর মজা কোথায়! তবে সিরিজের শেষ ওয়ানডেতে বিনোদনের বেশ ঝাঁঝালো মসলাই কিন্তু ছড়িয়েছে মিরপুরের আকাশে। রান আউট ভেবে প্রায় ড্রেসিংরুমের কাছে চলে আসা মাহমুদ উল্লাহকে আম্পায়ার ফিরিয়ে আনার প্রতিক্রিয়ায় তো একটা সময় মনে হচ্ছিল বুঝি মাঠই ছেড়ে যাবে জিম্বাবুয়ে। সে কেলেঙ্কারিটি আর হয়নি, প্রায় মিনিট দশেক থমকে থাকা ম্যাচে কখনো আম্পায়ার, কখনো মাহমুদ অথবা নন-স্ট্রাইকিং এন্ডে থাকা মাশরাফির সঙ্গে বাদানুবাদ করতে দেখা গেছে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটারদের। বাংলাওয়াশেই শেষ হলো স্বপ্নের বছর সেটার বদলা হিসেবেই কি স্লিপে আট ফিল্ডার দাঁড় করিয়ে নিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক? একটা সময় টেস্টে দেখা যেত এমনটা, ওয়ানডেতে বিরল এমন দৃশ্য টি-টোয়েন্টির যুগে অদৃশ্যই হয়ে গেছে। তাই মাশরাফির ‘মাস্তানি’টা উজাড় করে বিনোদন দিয়েছে দর্শকদের, যা নিশ্চিতভাবে অপমানিতও করেছে জিম্বাবুয়েকে। ২০১৫ সাল যেন পদে পদেই ফিরিয়ে আনছে সেসব দিনের স্মৃতি, যখন হার আর যাবতীয় অপমান বরাদ্দ থাকত শুধু বাংলাদেশের জন্যই। ৩-০’র পথে এমন অদ্ভুতুড়ে ফিল্ডিং সাজানোর সময় কি সেসব দিনের কথা মনে পড়ছিল বাংলাদেশ অধিনায়কের? নাকি মাহমুদ উল্লাহর ‘ফেরা’ নিয়ে জিম্বাবুয়ের শোরগোলটাই ভুলিয়ে দিয়েছিল তাঁকে সেসব দিনের কথা? অবশ্য এমন ফিল্ডিংয়ের অনুমোদন আছে ক্রিকেট আইনে, সর্বোচ্চ বীরত্বের খেতাবও এমন আগ্রাসী মনোভাবের জন্য। হাজারটা লড়াইয়ে জেতা মাশরাফির মুকুটে বীরত্বের পালকটাই বেশি মানায়!

অধিনায়কত্বের মুকুট ফিরে পাওয়ার পর টানা পঞ্চম ওয়ানডে সিরিজ জেতা মাশরাফি আজন্ম যোদ্ধা। ইনজুরির সঙ্গে অবিশ্বাস্য লড়াইয়ের ফাঁকে ফাঁকে ক্রিকেট মাঠেও নিরন্তর বৈরিতার মুখোমুখি তিনি। ফিল্ডিংয়ের আইন বদলেছে বারবার, কিন্তু মাশরাফির বোলিং দায়িত্ব বদলায়নি। ওভার দ্য টপ ব্যাটিং আবিষ্কার পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষিক্ত তিনি, তাই সইতে হয়েছে প্রতিপক্ষ ওপেনারদের তুলে মারার ধাক্কা। ডেথ ওভারে ব্যাটসম্যানদের স্লগ থামাতেও অধিনায়ক সযত্নে সঞ্চয়ে রাখতেন মাশরাফির কয়েকটি ওভার। অধিনায়ক মাশরাফিও নিজেকে বোলিং করাচ্ছেন সেই ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যেই। শুরুর পাওয়ার প্লের পর দ্বিতীয় স্পেলে আসছেন ব্যাটিং পাওয়ার প্লের সময়। মুস্তাফিজুর রহমানের মাত্র নবম ম্যাচে তৃতীয়বারের মতো ৫ উইকেট পাওয়ার দিনে মাশরাফির জন্য এক ছত্র প্রশংসা বরাদ্দ তাঁর সাহসিকতার জন্য। দিন বদলালেও ঝুঁকিপূর্ণ পথ পেরোনোর দায়িত্ব এড়িয়ে যান না মাশরাফি। এ কারণেই দলে তিনি ‘বস’।

শুধু নিজে ঝুঁকি নিলেই তো হয় না, কখন কার কাছ থেকে কিভাবে সেরাটা বের করে আনা যাবে, সেটাও যেন নিজের হাতের তালুর মতোই জানেন মাশরাফি। প্রথম ওভারে উইকেট পাওয়া মুস্তাফিজ যখন প্রথম স্পেলে চতুর্থ ওভারের জন্য তৈরি, তখন তাঁকে সরিয়ে নাসির হোসেনের হাতে বল তুলে দেন মাশরাফি। তৃতীয় বলে ক্রেইগ আরভিনকে তুলে নিয়ে অধিনায়কের আস্থার প্রতিদানও দিয়েছেন নাসির। চিগুম্বুরা টানা তৃতীয় ম্যাচে বেগড়বাই করছিলেন দেখে হঠাৎই সাব্বির রহমানের দ্বারস্থ অধিনায়ক, সুফলও মিলেছে। ব্যাটিং পাওয়ার প্লের প্রথম ওভারে আক্রমণে ফেরা আল আমিন তুলে নেন ম্যালকম ওয়ালারকে। পরের ওভারেই প্রতিপক্ষের সবচেয়ে দামি উইকেটের (শন উইলিয়ামস) মালিক বনে যান অধিনায়ক নিজে। আর মাশরাফি খুব ভালো জানেন বলটা একটু পুরনো হলে ‘কাটার’ মুস্তাফিজ আরো ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। গতকাল তো আরেকটি হ্যাটট্রিকের সম্ভাবনাও জাগিয়েছিলেন বাঁহাতি এ পেসার। সেটি না হলেও ৩৪ রানে ৫ উইকেট পেয়ে ম্যাচ শেষ করেছেন মুস্তাফিজ। তাঁর অষ্টম ওভারের শেষ চারটি বলে ক্রিকেট বিশ্ব দেখেছে অবিশ্বাস্য সে দৃশ্যটি- উইকেটকিপারসহ ৯ জন দাঁড়িয়ে মুজারাবানির ব্যাট ছুঁয়ে আসা ক্যাচের আশায়। রোমাঞ্চ মিললেও ওই ওভারে মুস্তাফিজের উইকেটসংখ্যা আর বাড়েনি। ইনিংসের ৪৪তম ওভারে জিম্বাবুয়ের ইনিংস গুটিয়েছে দলের ওয়ার্কিং ক্লাসের বদৌলতে। আরাফাত সানির তারকাখ্যাতি নেই, তবে কার্যকারিতা আছে। সিরিজের শেষ উইকেটটি যেন তারই পুরস্কার হিসেবে জুটল বাঁহাতি এ স্পিনারের ভাগ্যে।

স্মারক স্টাম্প তুলে দুই দলের নিয়মমাফিক হ্যান্ডশেকের পর পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জানা গেল, ম্যাচ সেরা হয়েছেন তামিম ইকবাল। যদিও সেঞ্চুরি ফসকে যাওয়ার অন্তর্দহনে পোড়ার কথা তাঁর। প্রথম ম্যাচে সেট হয়েও আউট হওয়া নিয়ে আগের তিনটি দিন বিস্তর পুড়েছেন বলেই জনশ্রুতি আছে। কাল ৭৩ রানে আউট হয়ে সেঞ্চুরিবঞ্চনা কি আর ম্যাচসেরার পুরস্কারে ভুলতে পারেন তামিম! অবশ্য দল জিতলে ব্যক্তিগত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ভুলে থাকাটাই বাংলাদেশের ‘টিম রুলস’। তিনিও ভুলে থেকেছেন। তবে একটা সেঞ্চুরি হলেই একটা রেকর্ড পুরোপুরি নিজের করে নিতে পারতেন তামিম। ছয় শতক নিয়ে ওয়ানডের সেঞ্চুরি তালিকার শীর্ষে তাই এখনো সাকিব আল হাসানের সঙ্গে আটকে থাকলেন তামিম।

তামিমের আগে অবশ্য একই হতাশা নিয়ে ফিরে গেছেন ইমরুল কায়েস, সেই ৭৩ রান করে, স্টাম্পড হয়েই! বিশ্বকাপের পর আগের ম্যাচেই প্রথম সুযোগ পেয়ে স্নায়ুচাপ ছিল, কাল সেই চাপমুক্তির ছাপ ইমরুলের ব্যাটে। দলের আস্থা যে একজন ব্যাটসম্যানকে কতটা মেলে ধরতে সাহায্য করে, এ সিরিজে বাঁহাতি এ ওপেনারের দুটি ফিফটি যেন তারই সাক্ষ্য-প্রমাণ। তবু দুবার সেঞ্চুরি মিস করার আক্ষেপ ইমরুলেরও থাকার কথা, তামিমের চেয়ে একটু বেশিই। সৌম্য সরকার ফিরে এলে এ সিরিজের পারফরমেন্স ইমরুলের রক্ষাকবচ হবেই, এমন নিশ্চয়তা নেই যে!

তো, এই তামিম-ইমরুলের ১৪৭ রানের জুটিই দিনের বাকি অংশে দাপট দেখানোর সাহস জুগিয়েছে বাংলাদেশকে। উদ্বোধনী জুটি এত দূর নিয়ে আসার পর সিরিজে প্রথমবার তিন শ টপকে যাওয়া ভবিতব্যই মনে হচ্ছিল। কিন্তু মিডল অর্ডারের ছন্দপতনে সেটি আর হয়নি। মাহমুদ উল্লাহ ৪০ বলে ৫২ রানের ইনিংসটা না খেললে টানা দ্বিতীয় ম্যাচেও হয়ত আড়াই শর নিচে আটকে যেতে হতো বাংলাদেশকে। বরং লোয়ার অর্ডারে ১১ বলে ১৬ রানের ‘ক্যামিও’তে দলকে পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছেন মাশরাফি।

বাংলাদেশ তিন শ ছুঁতে না পারলেও সিরিজে প্রথমবারের মতো দুই শ টপকেছে জিম্বাবুয়ে- সফরকারীদের একমাত্র প্রাপ্তি সম্ভবত এটাই।