ক্ষুদ্রঋণ, জিডিপি ও দারিদ্র্য বিমোচন

বাংলাদেশকে বলা হয় ক্ষুদ্রঋণের সূতিকাগার যা সারা বিশ্বে পরিচিত পেয়েছে বিশেষত ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ ব্যাংকের নোবেল পুরস্কার বিজয়ের মাধ্যমে ২০০৬ সালে। বস্তুত ক্ষুদ্রঋণের অনুশীলন এর আগেও হয়েছে বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিন্তু এর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ সারা বিশ্বে করে দিয়েছে বিশ্ব মাইক্রোক্রেডিট সামিট। ১৯৯৮ সালে যার নেতৃত্বে ছিলেন বাংলাদেশের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস যিনি বর্তমানে সামাজিক ব্যবসা নামে একটি ধারণা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে ব্রত রয়েছেন। এরই মধ্যে ক্ষুদ্রঋণের প্রচার ও প্রসার সারা দেশে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে তা বিশ্বে গবেষণার ফলাফল ও সরকারি প্রতিবেদন থেকে পাওয়া যায়। বর্তমানে ৩.৫ কোটি ঋণগ্রহীতা যারা কেউই প্রথাগত ঋণ কাঠামো থেকে সুবিধা পায় না সেব সদস্যই এই হিসেবের অন্তর্গত যার সিংহভাগ হতদরিদ্র মহিলা বলে পরিচিত। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন উন্নয়নের কথা বিবেচনায় রেখে যে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের কোনো বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি আছে কিনা?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাব এম এম আকাশ তার এক প্রবন্ধে বলেছেন ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন একটি মইয়ের মতো যার কতগুলো স্তর থাকে যার একটি হলো ক্ষুদ্রঋণ যার সুদের হার একেবারেই কম নয় যার মাধ্যমে ঋণগ্রহীতা আয় অর্জনের একটি সুযোগ পায় যাকে বলা হয় উদ্যোক্তা। সময়ের আবর্তে ঋণের চাহিদা বাড়ে এবং ব্যবসার প্রসার ঘটে ধীরগতিতে যাকে দারিদ্র্য বিমোচন কোনোভাবেই বলা যায় না। কারণ এই কল্পিত বাস্তবতাটির বহুমাত্রিক রূপ রয়েছে যা কেবল আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বোঝা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ ব্যবসায় আয়-উন্নতি, লাভ-লোকসান পাশাপাশি সহাবস্থানে বিচরণ করে যা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। জনাব আকাশের মতে ভূমিহীনকে ভূমিদান ও পর্যায়ক্রমে আয়বর্ধনমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টি যা থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি আয় অনেক সময় ধরে স্থিতিশীল হবে তা কেবল দারিদ্র্য বিমোচনের একটি পর্যায় হতে পারে তবে শেষ পর্যায় নয়। এর একটি সামাজিক দিকও রয়েছে কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্ষুদ্রঋণ সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার কিনা সে প্রশ্নটি বিগত চার দশকে সেভাবে গবেষণায় প্রতিফলিত হয়ে আসেনি। এখন প্রশ্ন আসে এ ধরনের ক্ষুদ্রঋণের ভবিষ্যৎ কি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আয় গণনায় যারা নিয়োজিত তারা অর্থনীতির খাতকে তিন শ্রেণিতে বিভাজন করে থাকেন যেমন কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত। তা হলে ক্ষুদ্রঋণ কোন খাতের অন্তর্ভুক্ত এবং যারা দেশের জিডিপিতে ক্ষুুদ্রঋণের অবদানকে গণনা করেন তারা এই ক্ষুদ্রঋণকে কোন খাতে অন্তর্ভুক্ত করেছে এই প্রশ্নগুলো রয়েই যায়। যেমন সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব মাইক্রো ফাইন্যান্সের (আইএনএম) একটি গবেষণায় উঠে এসেছে গ্রামীণ অর্থনীতিভিত্তিক জিডিপিতে ক্ষুদ্রঋণের অবদান ৮.১৪ শতাংশ থেকে ১০.৯১ শতাংশ।

গবেষণায় বলা হয় দেশে এক বছরে বিতরণকৃত ক্ষুদ্রঋণের ৪৭ শতাংশ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয় যার মধ্যে রয়েছে কৃষি খাত (শস্য খাত), পশুপালন (দুগ্ধবতী গাভী লালন-পালন, গরু মোটাতাজাকরণ), মৎস্য চাষ, বনায়ন ইত্যাদি। কিন্তু প্রশ্ন আসে আর যে ৫৩ ভাগ অনুৎপাদনশীল খাত রয়ে গেল তারা কি কেবল ক্ষুদ্র ব্যবসা- এক বাজার থেকে পণ্য কিনে আরেক বাজারে বিক্রয়ের ব্যবস্থা যাকে বলা হয় ট্রেডিং। অপরদিকে যারা উৎপাদনশীল কৃষি পণ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত তারা কি তাদের সঠিক মূল্য বাজার থেকে পাচ্ছে- সম্ভবত নয়। কারণ বাজার বিপণন ব্যবস্থার ত্রুটির কারণ লক্ষণীয় যার সমাধান এখনো হয়নি। এই গবেষণার তথ্যের ওপর আলোচিত কর্মশালায় একজন বলেছেন ক্ষুদ্রঋণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অর্থায়নের একটি সম্প্রসারিত রূপ মাত্র। তবে দেশের সামগ্রিক কল্যাণে ক্ষুদ্রঋণ কী ভূমিকা রাখছে তা জিডিপির অবদান দিয়ে বোঝা সম্ভব নয়।

এই তো গেল সংখ্যাতত্ত্বের বিষয় এবং যদি ধরা যায় ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের গুণগত বিষয় তখন কি দেখতে পাওয়া যায় অবশ্যি তা আলোচনার দাবি রাখে। কারণ একজন ঋণগ্রহীতা সমাজেরই একটি অংশ এবং সে যখন ঋণের কিস্তির শর্ত পূরণে অপারগ হয়ে চারদিক ছুটে যায় তখন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সনাতন ধারাবাহিকতায় ঋণ আদায়ে ব্যস্ত থাকে, কোনো মানবিক দিক সেখানে স্থান পায় না। অর্থাৎ মানবিক দারিদ্র্য নিরসনে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তেমন কোনো কর্মসূচি চোখে পড়ে না কেবলমাত্র গ্রামীণ ব্যাংক ছাড়া যদিও এ ব্যাপারে অনেক বিতর্ক রয়েছে। দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাসকারী লোকের সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার এক চতুর্থাংশ এবং এই জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যাটিও বৃদ্ধি পায়। তাই শতাংশের হারে দারিদ্র্য কম মনে হলেও সামগ্রিক দারিদ্র্য কমছে না। এই অবস্থায় ক্ষুদ্রঋণ ছাড়া কি সামগ্রিক অর্থে বাংলাদেশের চার দশকেরও বেশি পথ চলায় এমনকি কোনো জাতীয় মডেল উদ্ভাবন করতে পারেনি যেখানে দারিদ্র্য বিমোচনের সবগুলো উপাদানই স্থান করে নিয়েছে। বাস্তবে তা হয়নি কারণ বাংলাদেশে জাতীয় ভিত্তিতে কোনো মডেল অন্তত এ বিষয়ে স্বীকৃতি সরকারের পক্ষ থেকে আসেনি। ফলে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য ব্যবসা এখন জমজমাট বিশেষত এনজিও পরিচালিত কার্যক্রমগুলোতে এবং এ ব্যবসার মুনাফা থেকে এখন সে সব প্রতিষ্ঠান কেউ বা ব্যাংক, কেউ বা বিশ্ববিদ্যালয়, কেউ বা নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। আবার কেউ রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছে।

এখন ক্ষুদ্রঋণ থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে বৃহৎ উদ্যোক্তা- এই যে রূপান্তর ঘটে চলছে তার শেষ কোথায় যা দেশের নব্য ক্যাপিটালিজমকে মনে হয় আরো জোরদার করে চলছে। ফলে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীরা বেশ লাভবান এবং ক্ষুদ্রঋণ সমাজ পরিবর্তনের নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারছে না। আবার যারা ব্যবসার বাহিরে সমাজ চিন্তায় ব্যস্ত থাকে তাদের ভাবনা হলো ঋণ একটি আয় বর্ধনের অর্থনৈতিক উপাদান মাত্র। তার পাশাপাশি সামাজিক উপাদান যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, পুষ্টি, সামাজিক ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা ইত্যাদি যদি অনুশীলন না হয় তা হলে দারিদ্র্যজনের দীর্ঘমেয়াদিভাবে স্থায়িত্বশীলতার কোনো সুযোগ নেই এবং এক শ্রেণির উদ্যোক্তা বা প্রতিষ্ঠানটিকে পুঁজি করে বড় হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকবে এবং থাকছে। এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য সংস্কার অপরিহার্য। যদিও বাজার অর্থনীতির যুগে সামাজিক উপাদানগুলো খুব সংকটাপন্ন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারি দারিদ্র্য বিমোচনের কোনো নীতিমালা আছে বলে জানা নেই এবং এটি যে সরকারি অর্থনৈতিক নীতিমালার একটি অংশ তা গণতান্ত্রিক বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ম্যানিফেস্টো থেকে সহজেই অনুমেয়। কারণ দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান সরকারের অগ্রাধিকার খাত এবং সেভাবেই অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ও বাজেট বিষয়টি স্থান করে নিয়েছে গুরুত্বসহকারে।

বাংলাদেশের জাতীয় সরকারের প্রায় চৈাদ্দটি মন্ত্রণালয় ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি পরিচালনা করে থাকে বিভিন্ন মডেলে বা বিভিন্ন ক্রেডিট লাইনে। এমনকি এক মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিভিন্ন দপ্তর অধিদপ্তর ও পরিদপ্তর বিভিন্ন ক্রেডিট লাইন অনুশীলন করে থাকে। আবার যদি বিদেশি সাহায্যপুষ্ট কোনো ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি হয় তা হলে সেই দাতা সংস্থার মডেল অন্তর্ভুক্ত হয়। আবার বিভিন্ন এনজিওদের তাদের নিজস্ব মডেল রয়েছে।

এখন একটি দেশে এই যে ক্ষুদ্রঋণের মালটি এজেন্সি মডেল তা দেশের দারিদ্র্য বিমোচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তার একটি প্রশাসনিক সমাধান প্রয়োজন। কারণ দেশটি একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে এবং বর্তমানে মুক্তিযুুদ্ধের পক্ষের দল ক্ষমতায় রয়েছে। এখনই প্রকৃষ্ট সময় সমাজের অসঙ্গতিগুলো দূর করে সর্বস্তরে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং সেই আলোকে দেশের ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থাকে ঢালাওভাবে সাজাতে হবে যাতে হতদরিদ্ররা তাদের ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ন্যায়বিচার পায়, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নিরাপদে অংশগ্রহণ করতে পারে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সফল অবদান রাখতে পারে ন্যায়ের ভিত্তিতে, ন্যায্য পাওনার ভিত্তিতে, সম্মানের তথা আত্মসম্মান বোধের ভিত্তিতে। তাহলেই দেশ এগিয়ে যাবে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে এবং দারিদ্র্য বিমোচন সফলতার বাতায়নে স্থান করে নেবে।