সাইবার নিরাপত্তায় একসঙ্গে কাজ করবে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র

অকপটতা ও স্বচ্ছতা না থাকলে একটি সংগঠন বা সংস্থা বড় হয় না, শ্রদ্ধা পায় না। আমি বিটিআরসিতে এই দুটোর বিষয় রক্ষা করব। বিটিআরসিতে যোগ দেয়ার আগে আমি এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে অনেক মিথ, মিস্ট্রি শুনেছি। আমি এই সংস্থাকে জনগণের কাছে নিয়ে যাব। এই যাওয়ার পথের বাহন হবেন আপনারা (সাংবাদিকরা)। বিটিআরসির অন্যতম কাজ শুধু টেলিযোগাযোগ খাত থেকে সরকারের জন্য রাজস্ব আদায় নয়। এ খাতের সেবার গুণগতমান বজায় রাখার ব্যবস্থা করাও এ সংস্থার অন্যতম দায়িত্ব। টেলিযোগাযোগ শুধু টেলিফোনে কথা বলা নয়। এর অন্যান্য সেবার মানও উন্নত করতে হবে। দেশের জনগণ এখনো মানসম্মত সেবা সম্পর্কে সচেতন নয়। তাদের এসব সেবার মান সম্পর্কে জানাতে হবে। সবার জন্য সব ধরনের মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়টির ওপর আমার নজর থাকবে।

গতকাল টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ বা টিআরএনবির সাথে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন বা বিটিআরসির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ। গত ২৫ অক্টোবর বিটিআরসির ষষ্ঠ চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেয়ার পর এটিই ছিল সাংবাদিকদের সাথে তার প্রথম সভা। এ সভায় বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান ব্রি. জে. (অব.) আহসান হাবিব খান, মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড লাইসেন্সিং) এ কে এম শহীদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। সভাটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন বিটিআরসির সচিব মো. সরওয়ার আলম। সভায় বিটিআরসির পক্ষে জানানো হয়, সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের চুক্তি হতে যাচ্ছে।

ড. শাহজাহান মাহমুদ যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা এবং ওয়াশিংটন মেট্রো আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া তিনিই হচ্ছেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথম ব্যক্তি যিনি টেলিকম বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন প্রকৌশলী এবং সরকারের সচিব বা সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না। নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, ‘আমেরিকাতে আমি কাজ করতাম। বসে থেকে সোশ্যাল সিকিউরিটি খেতাম না। ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ার ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে আমেরিকাতে আমি ইকোনমিক্সে ডিগ্রি নেয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সেখানে এ চেষ্টায় সফল হইনি। পরে স্ট্যাটিক্সে চলে যাই। পিওর গবেষণা এরিয়াতে (৬.০ ও ৬.১) কাজ করেছি। সেখানে নেভিতে টেকনিক্যালÑ বিশেষ করে সফটওয়্যার বিভিন্ন ডিজাইনের ওপর কাজ করেছি। এরপর মেরিন কোরে পলিসি ফরমুলেশন ও কমিউনিকেশন সিস্টেমের ওপর কাজ করেছি। এসব কাজের মাধ্যমে ওয়ার ফিল্ডে কমান্ডারদের ইনফরমেশন দেয়া হতো।

বিটিআরসিতে আপনার প্রথম তিন মাসের কর্ম পরিকল্পনা কি? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, মাত্র দুই সপ্তাহ হলো এখানে বসেছি। সে কারণে এখন যা বলব তা পরিবর্তন হতে পারে। তার পরও বলছি, আমার প্রথম কাজ হবে কলটার্মিনেশন রেট ঠিক করা। এরপর থাকবে মানসম্মত টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেয়া। আর বিটিআরসির সুনাম যাতে বাড়ে সে লক্ষ্যে কাজ করা।

কলড্রপ সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, এ সমস্যার সমাধান পরশু দিনের মধ্যেই হয়ে যাবে আমি সে কথা বলব না। তবে দ্রুত মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা হবে।

টেলিযোগাযোগ খাতে লাইসেন্স প্রদান, পাওনা টাকা আদায়Ñ এসব বিষয়ে বিটিআরসি বেশ কয়েক বছর ধরেই রাজনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে বলে শোনা যায়। এ বিষয়ে আপনার অভিজ্ঞতা কী? জবাবে ড. শাহজাহান মাহমুদ বলেন, ‘গত দু’সপ্তাহে কোনো রাজনৈতিক চাপের অভিজ্ঞতা পাইনি।’ ভিওআইপির অবৈধ কারবার বন্ধ করা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এর জন্য শিগগিরই পুরো কমিশনের সাথে বসব। একটা মাস্টার প্লান মতো করব।’ আগের চেয়ারম্যানের বিদায়বেলায় সিম রেজিস্ট্রেশন নিয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ও বিটিআরসির কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয় বলে জানা গেছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে বিটিআরসি যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ার কারণেই প্রতিমন্ত্রীকে এ বিষয়ে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হয়েছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন? এর জবাবে শাহজাহান মাহমুদ বলেন, কাজ হওয়া নিয়ে কথা। মন্ত্রণালয়ের সাথে আমি কথা বলেছি। এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাথে বিটিআরসি যৌথভাবেই কাজ করছে।

এ পর্যায়ে বিটিআরসির ভাইস চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আহসান হাবিব খান বলেন, সিম রেজিস্ট্রেশনের বিষয়ে আজ কালের মধ্যেই মোবাইল ফোন অপারেটরদের কাছে বিটিআরসির নির্দেশনা যাচ্ছে।

মতবিনিময় সভায় ড. শাহজাহান মাহমুদকে দেশের সাইবার সিকিউরিটির অভাব বিষয়ে নানা তথ্য দিয়ে এ ক্ষেত্রে তার করণীয় জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে সাইবার সিকিউরিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। আমেরিকাতেও প্রচুর হ্যাকিং হয়। এ সমস্যা সমাধানের জন্য সেখানে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। সেখানে সিম রেজিস্ট্রেশের কোনো সমস্যা নেই। যখন তখন টেলিফোনে আড়িপাতা যায় না। এজন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকেও পারমিশন নিতে হয়। পারমিশন ছাড়া আড়ি পেতে কোনো ডকুমেন্ট পেলে সে ডকুমেন্ট আদালতে গ্রহণযোগ্যতা পায় না। ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে সাইবার অপরাধ ঘটছে। কিন্তু এসব সামাজিক যোগাযোগ আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণায়ের অধীনে ন্যাশনাল টেলিকম মনিটরিং সেল (এনটিএমসি) কাজ করছে। বিটিআরসি তাদের সাথে সমন্বয় করে এ বিষয়ে কাজ করছে।

বিষয়টি সম্পর্কে বিটিআরসির সচিব ও মুখপাত্র মো. সরওয়ার আলম জানান, দেশে ফেসবুকের একটি সার্ভার বসিয়ে এ মাধ্যমটিকে পর্যবেক্ষণে রাখার পদক্ষেপ নেয়ার পরিকল্পনা হয়েছে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা হয়েছে। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সাথে একটি সমঝোতা চুক্তি হতে যাচ্ছে। চুক্তিটি সম্পন্ন হলে বাংলাদেশ একই ছাতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করবে।