গ্যাপ আসছে বাংলাদেশেও

ইউরোপের রিটেইল স্টোরগুলোর কমপ্লায়েন্স বা মানের চাহিদা পূরণ করতে ২০০৫ সাল থেকে গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ) অনুসরণ করছে আফ্রিকার দেশ কেনিয়া। গ্যাপের নিয়মনীতি মেনে চাষ করলে দেশটির কৃষকদের স্বীকৃতি দেওয়ার একটি ব্যবস্থা আছে, যা ‘কেনিয়াগ্যাপ’ নামে পরিচিত। সে দেশের কোনো কৃষক বা কৃষিভিত্তিক ফার্ম ‘কেনিয়াগ্যাপ’ মেনে ফল ও সবজি উৎপাদন করলে তাকে সনদ দেওয়া হয়। এতে উন্নত দেশের সুপারস্টোরগুলোতে ফল ও সবজি রপ্তানি সহজ হয়।

গ্যাপ অনুসরণের সুফল পাচ্ছে কেনিয়া। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস ফল ও সবজি রপ্তানি। বর্তমানে কেনিয়ার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৩ শতাংশ আসে ফল ও সবজি রপ্তানি থেকে। দেশটিতে ৪৫ লাখ মানুষ এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। কেনিয়ার মতো সবজি ও ফল রপ্তানিকারক প্রায় সব দেশই এখন গ্যাপ অনুসরণ করছে। গ্যাপ অনুসরণ করে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো তাদের কৃষিকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে।

এবার বাংলাদেশও গ্যাপ অনুসরণের উদ্যোগ নিয়েছে। এ দেশে গ্যাপ অনুসরণ করলে একটি সনদ দেওয়া হবে, যার নাম ‘বাংলাগ্যাপ’। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে দেশের কৃষিপণ্য উন্নত দেশের বাজারে রপ্তানি সহজ হবে এবং দেশের মানুষও খেতে পারবে নিরাপদ পণ্য। এতে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার কমবে এবং ক্ষতিকর রাসায়নিকও ফলমূলে থাকবে না।

গ্যাপ বেসরকারিভাবে সৃষ্ট ও অনুসৃত একটি মানব্যবস্থা। বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোকে পোশাক তৈরিতে যেমন কমপ্লায়েন্স বা সার্বিক মান অনুসরণ করতে হয়, তেমনি গ্যাপ অনুসরণ করলে ধনী দেশগুলোর সবজি ও ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বাজারে প্রবেশ করা সহজ হয়। ক্রেতারাও আস্থার সঙ্গে ওই সব পণ্য কেনে।

১৯৯০-এর দিকে ইউরোপের সুপারমার্কেটগুলো ও তাদের প্রধান সরবরাহকারীরা নিরাপদ পণ্য নিশ্চিত করতে একটি সাধারণ মান তৈরি করে, যার নাম ছিল ‘ইউরিপগ্যাপ’। ২০০৭ সালে ‘ইউরিপগ্যাপ’ নাম পরিবর্তন করে হয় ‘গ্লোবালগ্যাপ’। এখন ইউরোপের প্রধান ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কাছে পণ্য বিক্রি করতে গেলে গ্লোবালগ্যাপ অনুসরণ করার সনদ চায়। অবশ্য বেশির ভাগ দেশই গ্লোবালগ্যাপের মতো করে নিজেদের গ্যাপ তৈরি করে নিয়েছে। এখন বিভিন্ন রপ্তানিকারক দেশের ফার্ম অথবা কৃষক গ্লোবালগ্যাপ থেকেও স্বীকৃতি নিতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় স্বীকৃতিও পেতে পারে। ইন্দোনেশিয়ার নিজস্ব গ্যাপের নাম ‘ইন্দোগ্যাপ’, যা তারা ২০০৪ সাল থেকে অনুসরণ করছে। এ ছাড়া ফিলিপাইন ২০০৫ থেকে ‘ফিলগ্যাপ’, ভিয়েতনাম ২০০৮ থেকে ‘ভিয়েতগ্যাপ’, থাইল্যান্ড ২০০৭ থেকে ‘থাইগ্যাপ’ অনুসরণ করছে।

বাংলাদেশে গ্যাপ : বাংলাদেশে গ্যাপ সনদের প্রস্তাবিত নাম ‘বাংলাগ্যাপ’। কৃষক বা কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে গ্যাপ সনদ দেবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই)। আইএসও ১৭০০৬৫-এর অধীনে ডিএইকে অ্যাক্রেডিটেশন দেবে বাংলাদেশ বোর্ড অব অ্যাক্রেডিটেশন (বিএবি)।

বাংলাদেশে গ্যাপ চালুর জন্য ডেভেলপমেন্ট অব লোকালি অ্যাপ্রোপ্রিয়েট গ্যাপ প্রোগ্রামস নামের একটি প্রকল্প শেষ হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মালদ্বীপে গ্যাপ সনদ প্রদান ব্যবস্থা চালু নিয়ে কাজ করছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। সার্ক গ্যাপ স্কিম নামের ওই প্রকল্পের আওতায় বাংলাগ্যাপের লোগো তৈরি, কাঠামো তৈরি, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য কাজ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) পরিচালক (টিটিএমইউ) ড. মিঞা সাঈদ হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাগ্যাপের প্রাথমিক কাজগুলো করা হচ্ছে। প্রকল্প চলতে থাকলে ২০১৭ সাল নাগাদ দেশে গ্যাপ অনুসরণের সনদ দেওয়া যাবে।’

মিঞা সাঈদ হাসান আরো বলেন, ইউরোপের গ্যাপ অনুসরণ করতে হলে সাড়ে তিন হাজার ইউরো ফি দিয়ে তাদের কাছ থেকে সনদ নিয়ে পণ্য উৎপাদন করতে হবে। এরপর তাদের কর্মকর্তাদের বিমান ভাড়া ও অন্যান্য খরচ দিয়ে এ দেশে এনে সব কিছু পরীক্ষার পর তাদের স্বীকৃতি মিলবে। কিন্তু বাংলাগ্যাপ সনদে কোনো ফি লাগবে না।

সুফল কী : ২০০৭ সালে কেনিয়ার রপ্তানিকারকরা ‘কেনিয়াগ্যাপ’ তৈরি করে তা অনুসরণ শুরু করে নিজেদের উদ্যোগে। তখন সরকার শুধু তাদের সহায়তা করেছিল। ২০১৪ সালে ইউরোপের বাজারে ফল ও সবজি রপ্তানি করে কেনিয়া এক বিলিয়ন ডলার আয় করেছিল। বর্তমানে ইউরোপে ফল ও সবজি রপ্তানি বাজারের ১০ শতাংশ তাদের দখলে আছে। শুধু রপ্তানি নয়, গ্যাপ অনুসরণের পর থেকে কেনিয়ার কৃষকদের কীটনাশকের খরচ ৪০ শতাংশ কমে যায়। তারা তাদের পণ্যের ভালো দাম পাওয়া শুরু করে।

মিঞা সাঈদ হাসান বলেন, গ্যাপ অনুসরণ করলে বাংলাদেশের কৃষক বা ফার্মগুলো পণ্যের ভালো দাম পাবে। পাশাপাশি রপ্তানিও বাড়বে। কারণ বাংলাদেশের ফল ও সবজি তখন বিভিন্ন দেশে গ্রহণযোগ্য হবে।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ সবজি রপ্তানি করে ১০ কোটি ডলার আয় করেছে। যা আগের বছরের চেয়ে ৩০ শতাংশ কম। একই বছর ফল রপ্তানি করে আয় হয়েছে তিন কোটি ৮৪ লাখ ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৮ শতাংশ কম। ইউরোপের বাজারে মান নিয়ে প্রশ্নের কারণে রপ্তানি কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি সেখানে বেশ কিছু সবজি ও পান রপ্তানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এসব সবজি ও ফলের মূল ক্রেতা সেখানকার অ-ইউরোপীয়রা। ইউরোপের চেইন স্টোর ও সুপারশপগুলোতে বাংলাদেশি ফল ও সবজি ঢুকতে পারে খুবই সামান্য। মান নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে গ্যাপ অনুসরণের চাপ বাড়ছে ইউরোপ থেকে।

গত মৌসুমে আমেরিকার চেইন স্টোর ওয়ালমার্টে আম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দ্বীপ ইন্টারন্যাশনালের মালিক পরিতোষ চন্দ্র দাস কালের কণ্ঠকে বলেন, গ্যাপ সনদ পাওয়া পণ্য রপ্তানি করতে পারলে ইউরোপের মূল বাজারে প্রবেশ করা সহজ হবে। তিনি বলেন, ‘থাইল্যান্ডে এক লাখ ৬০ হাজার কৃষক গ্যাপের আওতায় আছে। তারা রপ্তানিতে ভালো করছে। আমরা মাত্র শুরু করছি।’

নিরাপদ হবে কৃষি : বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১০ লাখ টন আম হয়। মোটামুটি তিন মাসের মধ্যে সেই আম খেয়ে শেষ করে দেশের ১৬ কোটি মানুষ। কীটনাশক, রাসায়নিক, পোকা বা কোনো রোগের উপস্থিতি থাকলেও আম বাজারে বিকোতে বিশেষ কোনো অসুবিধা হয় না। কিন্তু গ্যাপ অনুসরণ করলে ওই রোগবালাই থেকে দূরে থাকতে বেশ কিছু নিয়মনীতি মানতে হবে।

আম চাষে এশিয়ান ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার কো-অপারেশন ইনিশিয়েটিভের (এএফএসিআই) অর্থায়নে গ্যাপ অনুসরণের একটি ম্যানুয়াল তৈরি করেছে বিএআরসি। এতে দেখা যায়, গ্যাপের সাতটি উপাদান আছে। এগুলো হলো-স্থান নির্বাচন, পরিবেশ ও চাষ পদ্ধতি, পানির গুণাবলি ও সেচ, শস্য সংরক্ষণ, ফসল সংগ্রহের আগের ও পরের ব্যবস্থাপনা, কৃষক ও কর্মীর স্বাস্থ্য ও পরিছন্নতা এবং তথ্যাদি সংরক্ষণ। এসবের অধীনে অনেক নিয়ম-কানুন আছে। ড. মিঞা সাঈদ হাসান জানান, এসব নিয়ম-কানুন সম্পর্কে ডিএইর কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তাঁরা কৃষককে জানাবেন।