আইন ও বিচার দ্রুততম বিচারে ৬ জনের ফাঁসি

দুই শিশুর প্রতি নির্মম আচরণের সর্বোচ্চ শাস্তি তাঁদের পেতেই হলো। আদালত গতকাল রোববার পৃথক রায়ে সিলেটের সবজিবিক্রেতা শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন (১৪) ও খুলনায় গ্যারেজ-কর্মী শিশু রাকিব (১২) হত্যা মামলার রায়ে ছয়জনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত।
বহুল আলোচিত এ দুটি হত্যাকাণ্ডের এ দণ্ডাদেশকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায় ঘোষণার নজির বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। দুই হত্যা মামলার একটিতে ১৭ বিচারিক কার্যদিবস ও অপরটিতে ১০ কার্যদিবস শেষে গতকাল এ রায় ঘোষণা করা হয়।
রাজন হত্যা মামলা: সিলেটের রাজন হত্যা মামলার ১৩ আসামির মধ্যে প্রধান আসামি কামরুল ইসলামসহ (সৌদি আরবে পালিয়ে ধরা পড়ে দেশে ফেরত) চারজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। ফাঁসির সাজা পাওয়া অন্য তিন আসামি হলেন সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকার পীরপুর গ্রামের বাসিন্দা, সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডের চৌকিদার সাদেক আহমদ ওরফে বড় ময়না (৩৫), শেখপাড়া গ্রামের তাজউদ্দিন আহমদ ওরফে বাদল (২৪) ও সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ঘাগটিয়া গ্রামের জাকির হোসেন ওরফে পাবেল ওরফে রাজু মিয়া (২০)। জাকির হোসেন পলাতক রয়েছেন। সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আকবর হোসেন মৃধা এ রায় দেন।

এই মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডাদেশ পাওয়া ব্যক্তি হলেন জালালাবাদ থানা এলাকার জাঙ্গাইল গ্রামের বাসিন্দা ঘটনার ভিডিও
চিত্র ধারণকারী নূর আহমদ ওরফে নূর মিয়া (২০)। তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে দুই মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাত বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে কামরুলের তিন ভাই মুহিত আলম, আলী হায়দার ওরফে আলী ও শামীম আহমদকে। শামীমও পলাতক রয়েছেন।
খুলনায় শিশু রাকিব হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডা​েদশপ্রাপ্ত দুই আসামি মো. শরীফ (বাঁয়ে) ও মিন্টু খান l প্রথম আলোএ ছাড়া নির্যাতনের প্রত্যক্ষদর্শী দুলাল আহমদ ও আয়াজ আলীকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী ফিরোজ আলী, আজমত উল্লাহ ও রুহুল আমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে তাঁদের।
মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) মফুর আলী বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সাত দিনের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপিল করার নির্দেশনা রয়েছে।
আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ভিডিও চিত্র ধারণকারীর অসংলগ্ন কথাবার্তা ও হাসিঠাট্টা নির্মম তামাশা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। তাঁর অপরাধ হত্যাকাণ্ডের একজন প্ররোচনাকারী হিসেবে বিবেচিত। তাই তাঁকে (দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাজা) যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
গত ৮ জুলাই চুরির অপবাদ দিয়ে কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন শেখপাড়ায় পিটিয়ে হত্যা করা হয় জালালাবাদ থানার বাদেয়ালি গ্রামের শিশু রাজনকে। ঘটনার দৃশ্য ধারণ করে নির্যাতনকারীরা ভিডিও চিত্রটি ফেসবুকে প্রকাশ করেন। ১২ জুলাই ভিডিও চিত্র নিয়ে প্রথম আলোয় ‘নির্মম পৈশাচিক!’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
এই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে জালালাবাদ থানায় মামলা করে। ১৬ আগস্ট ১৩ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ঘটনার পরপরই সৌদি আরবে পালিয়ে যাওয়া আসামি কামরুলকে সৌদি কর্তৃপক্ষের সহায়তায় গত ১৫ অক্টোবর ফিরিয়ে আনা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, গত ৭ সেপ্টেম্বর মামলাটি বিচারের জন্য মুখ্য হাকিম আদালত থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তরিত হয়েছিল। ১ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ১৭ কার্যদিবসে মামলার বিচার-প্রক্রিয়া শেষ হয়।
গতকাল বেলা ১১টা ২০ মিনিটে কড়া পুলিশি পাহারায় আসামিদের ভিড়ে ঠাসা আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় ১১ আসামি কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।
রায়ের পর আসামিপক্ষের আইনজীবী হাবিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা ন্যায়বিচার পাইনি। হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল না। এ কারণে আসামিরা উচ্চ আদালতে জামিন চাইবেন।’ আর সিলেটের সরকারি কৌঁসুলি মিসবাহউদ্দিন সিরাজ বলেন, বিড়াল যেমন ইঁদুরকে ধরে খেলে, ঠিক সে রকম রাজনকে ধরে খুনিরা খেলা করেছেন। আদালত এর পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘটনার সঙ্গে আলোচিত এরশাদ শিকদার প্রসঙ্গ এনেছেন।
রায় ঘোষণাকালে রাজনের বাবা মাইক্রোবাসচালক শেখ আজিজুর রহমান, মা লুবনা আক্তারসহ পরিবারের সদস্য এবং গ্রামবাসী আদালতপাড়ায় উপস্থিত ছিলেন। রায় শুনেই রাজনের বাবা হাঁটু মোড়া করে দুই হাত ওপরে তুলে কান্নায় ভেঙে পড়েন। পাশে রাজনের মা-ও ফুপিয়ে কাঁদছিলেন।
খুলনায় রাকিব হত্যার রায়
মোটর গ্যারেজের কর্মী রাকিব (১২) হত্যার ঘটনায় প্রধান দুই আসামি মো. শরীফ ও মিন্টু খানের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালত। অপর আসামি বিউটি বেগমকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
ফাঁসির দণ্ড পাওয়া তিন আসামি (বাঁ থেকে) ময়না মিয়া, জাকির হোসেন ও তাজউদ্দিন l ছবি: প্রথম আলো১০ কার্যদিবসে বিচার-প্রক্রিয়া শেষ করে গতকাল দুপুরে আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন বিচারক দিলরুবা সুলতানা। এর আগে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যে বেলা পৌনে ১২টায় এ তিন আসামিকে খুলনা জেলা কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়।
বেলা পৌনে একটায় বিচারক রায় পড়ে শোনানো শুরু করেন। আদেশে মো. শরীফ ও মিন্টু খানের বিরুদ্ধে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ে বলা হয়, আসামিরা অভিনব কৌশলে যে মারাত্মক অস্ত্র দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, তা নিষ্ঠুরতার চরমতম উদাহরণ বলে বিবেচিত। বাংলা ভাষায় নিষ্ঠুরতার যত সমার্থক শব্দ আছে, তার সব এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে। আসামিপক্ষের দাবি, ইয়ার্কি করতে গিয়ে কাজটি ঘটে গেছে। তাদের ইয়ার্কির বলি কখনোই একজন শিশু হতে পারে না। কথিত এ ধরনের ইয়ার্কি জঘন্য ও নিষ্ঠুরতম।
রায় শুনানিকালে তিন আসামিই আদালতে উপস্থিত ছিলেন। রায় ঘোষণার পর ১টা ১০ মিনিটে কড়া পুলিশি পাহারায় তাঁদের প্রিজন ভ্যানে কারাগারে ফেরত পাঠানো হয়। বিউটি বেগমকে বেকসুর খালাস দেওয়ায় অসন্তুষ্ট রাকিবের স্বজন ও গ্রামবাসীরা এ সময় প্রিজন ভ্যানটি আটকানোর চেষ্টা করেন।
তবে রায়ের পর বাদীপক্ষের আইনজীবী মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘রায়ে আমরা খুশি।’ অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী তৌহিদুর রহমান চৌধুরী বলেন, ‘এটা আবেগতাড়িত রায়। মামলায় ৩৮ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন। আমরা উচ্চ আদালতে যাব।’
গত ৩ আগস্ট বিকেলে খুলনার টুটপাড়ায় শরীফ মোটরস নামের গ্যারেজে মোটরসাইকেলের চাকায় হাওয়া দেওয়ায় ব্যবহৃত কমপ্রেসর মেশিনের নল রাকিবের মলদ্বারে দিয়ে শরীরে বাতাস ঢোকানো হয়। এতে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং ওই দিন রাত ১০টার দিকে মারা যায়।
অভিযোগ ওঠে, এই গ্যারেজের কর্মী রাকিব বিভিন্ন সময় মারধরের শিকার হয়ে এবং ঠিকমতো মজুরি না পেয়ে সেখান থেকে অন্য একটি কারখানায় কাজ নিয়েছিল। এতে ক্ষুব্ধ হন শরীফ। পরে সুযোগ পেয়ে রাকিবকে ধরে এনে সহযোগীকে নিয়ে ওই নির্যাতন চালান।
এ হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে শরীফ মোটরসের মালিক শরীফ, তাঁর সহযোগী মিন্টু ছাড়াও শরীফের মা বিউটি বেগমকে জনতা গণপিটুনি দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছিল। হত্যাকাণ্ডের পরদিন রাকিবের বাবা মো. নুরুল আলম এ তিনজনের বিরুদ্ধে খুলনা সদর থানায় হত্যা মামলা করেন।
গত ২৫ আগস্ট খুলনা মহানগর হাকিম আদালতে তিনজনকে অভিযুক্ত করে এবং ৪০ জনকে সাক্ষী রেখে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খুলনা সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কাজী মোস্তাক আহম্মদ।