ধানখেত থেকে বিশ্বমঞ্চে

মজার একটা তথ্য দিয়ে শুরু করি। ক্রিকেট দিয়েই মানুষ আমাকে চিনেছে। কিন্তু আমার খেলোয়াড়ি জীবন শুরু হয়েছিল ফুটবল দিয়ে। স্কুলজীবনে প্রচুর ফুটবল খেলেছি। কেউ যদি আমার মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যান, দেখবেন স্কুলের দেয়ালে একটি ফুটবল দলের ছবি রয়েছে। সেই ছবির সামনের সারিতে আমি। ক্রিকেটও খেলতাম। তবে কেবল শীতকালে। একটা পর্যায়ে মনে হলো ক্রিকেটই আমাকে বেশি টানে। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্যখানে। স্কুলে নিয়মিত গেলেও কখনোই শ্রেণিকক্ষের মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে আমাকে বিবেচনা করা হতো না। করা হবে কী করে? পড়াশোনায় যে খুব একটা মনোযোগ ছিল না।

পড়াশোনায় মনোযোগী হতে বাবা আবুল কাসেম গাজী ও মা মাহমুদা খাতুন ভীষণ তাগাদা দিতেন। বড় ভাই মাফুজার রহমান, মেজো ভাই জাকির হোসেন ও সেজো ভাই মোখলেছুর রহমানও চেয়েছিলেন লেখাপড়া করেই বড় কিছু হই। বাবার স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হব। কিন্তু পড়ার টেবিলে বসলেও মন পড়ে থাকে মাঠে। পরিবারের সবার বারবার তাগাদায় বলেই ফেলি, পড়ালেখা আমার মাথায় ঢোকে না, কী করব আমি!

একটা সময় বাড়ির সবাই ব্যাপারটা বুঝতে পারেন। খেলাধুলার প্রতি আমার তীব্র টান আর আবেগের বিরোধিতা না করে বরং উৎসাহ দিতে শুরু করেন। তবে তাঁদের পরামর্শ ছিল, লেখাপড়াটাও যাতে একই সঙ্গে চালিয়ে যাই।
ছেলেবেলা থেকেই দেখেছি লেখাপড়ার ফাঁকে বড় ভাইয়েরা নিয়মিত খেলাধুলা করতেন। গ্রামের মাঠ ছাড়াও ফাঁকা ধানখেত, কখনো-বা বাড়ির উঠানটাই রূপ নিত খেলার মাঠে! হতো জমজমাট ক্রিকেট।

বছর পাঁচেক আগে আমাদের স্কুলে একটা টুর্নামেন্ট শুরু হলো। সেজো ভাইয়ের বন্ধু মিলন ভাই আমাদের সঙ্গেই খেলতেন। ওই টুর্নামেন্টে আমার কোনো ম্যাচ খেলা হয়নি। তবে ম্যাচের আগে-পরে ভাইদের অনুশীলনে বল করতাম। আমার বোলিং দেখে মিলন ভাই সেজো ভাইকে বললেন, ‘তোর ভাই ভালো বোলিং করে। সাতক্ষীরায় বয়সভিত্তিক বাছাই শুরু হলে খবর দেব। ওকে নিয়ে আসিস।’

এরপর সাতক্ষীরা জেলার হয়ে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে সুযোগ পেলাম। সাতক্ষীরা শহরটাই তখন চিনতাম না। বাড়ি থেকেই রওনা দিতাম। আমাদের বাইক ছিল। মেজো ভাইয়ের দোকান থেকে নাশতা ও বাইকের তেল কেনার টাকা নিয়ে সেজো ভাই প্রতিদিন সকালে ৩৫ কিলোমিটার দূরে সাতক্ষীরায় আমাকে নিয়ে যেতেন। অনুশীলন চলত দুই-তিন ঘণ্টা। অনুশীলন শেষে আবার নিয়ে আসতেন।

বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ভালো করার পর আত্মবিশ্বাস বাড়ে। ওপরে ওঠার তাড়না অনুভব করি। সুযোগ পাই খুলনা বিভাগীয় দলে। সেখানে প্রয়াত শেখ সালাউদ্দিন স্যারের অধীনে অনেক কিছু শিখেছি। বোলিংয়ে আমার রানআপ ভালো ছিল না। তিনি সেগুলো দেখিয়ে দিলেন। এতে নতুন সমস্যা দেখা দিল। আগের মতো ভালো বোলিং করতে পারতাম না। ধীরে ধীরে তা ঠিক হয়ে গেল। সালাউদ্দিন স্যার মানুষ হিসেবে ছিলেন অসাধারণ। সাতক্ষীরার আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে আমার সঙ্গে নানা ইয়ার্কি-ঠাট্টা করতেন। ছোট ছিলাম তো, অনেক যত্ন নিতেন।

২০১২ সালে মিরপুরে পেস ফাউন্ডেশন ক্যাম্পে মূলত তিনিই পাঠিয়েছিলেন। মিরপুরে ক্রীড়াপল্লিতে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মিরপুরে অনুশীলনের ফাঁকে জাতীয় দলের ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে বোলিং করতে হতো। শুরুতে জাতীয় দলের ব্যাটসম্যানদের বিপক্ষে বোলিং করতে ভয়ই লাগত। এত দিন তারকা ক্রিকেটারদের দূর থেকে দেখেছি। এখন তাঁদেরই বিপক্ষে বোলিং করছি। বলুন, ভয় পাওয়াই স্বাভাবিক না!

ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। জাতীয় দলের অনুশীলনে শিখলাম ‘কাটার’ মারা। গল্পটা বহুবার বলেছি। এনামুল হক বিজয় ভাইকে হঠাৎ একটা কাটার মেরেছিলাম। খেলতে পারেননি। উনি উৎসাহিত করেছিলেন সেটা আবারও করতে। অনেক কথায় কাজ হয় না। আবার কারও সামান্য কথায় বিরাট কাজ হয়। এটাও ছিল তেমন।

জাতীয় দলের নেটে ভালো করে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে চলে এলাম। গত বছর খেললাম যুব বিশ্বকাপে। একই বছর মে মাসে ‘এ’ দলের হয়ে গেলাম ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে। তবে সেখানে কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ পাইনি। একরকম ‘পিকনিক’ করে চলে এলাম!

অনেকে প্রশ্ন করেন, আগের জীবন আর এখনকার জীবনের পার্থক্য কী? বলি, কিছুই না। আগের মতোই আছি। পার্থক্য কেবল এতটুকুই—আগে মুস্তাফিজকে মানুষ চিনত না, এখন চেনে। আগে এলাকায় খেলতাম, এখন দেশ-বিদেশে খেলি জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটা ঘটল গত এপ্রিলের ২৪ তারিখে, সুযোগ পেলাম পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে। আন্তর্জাতিক অভিষেক, মনে রোমাঞ্চ কাজ করলেও খুব একটা চাপ অনুভব করিনি। আমার মধ্যে আসলে খুব একটা টেনশন কাজ করেও না। মাঠে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি। ম্যাচটি খেলতে পারব কি না নিশ্চিত ছিলাম না। তবে আগের দিন কোচ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, খেলার সম্ভাবনা আছে।

এরপর ভারতের বিপক্ষে স্বপ্নের মতো অভিষেক। অবশ্য প্রথম ওয়ানডেতেই অভিষেক হবে কি না নিশ্চিত ছিলাম না। কারণ, দলে চার পেসার। চারজন একসঙ্গে খেলবে কি না এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। তবে এ নিয়ে যে খুব ভাবছিলাম, তা নয়।

ম্যাচ চলার সময় কত কিছুই তো ঘটে। কটাই বা মনে রাখা যায়! তবে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডের একটা ঘটনা বেশ মনে পড়ে। চার উইকেট পাওয়ার পরও আমার কয়েকটি ওভার বাকি ছিল। তখন সাকিব ভাই বলছিলেন, ‘পাঁচ উইকেট পেলে দেখবি কী হইচই হয়! এখন হয়তো বুঝবি না, তবে অনেক দিন পর যখন মনে পড়বে ভারতের বিপক্ষে পাঁচ উইকেট পেয়েছিস, ভীষণ ভালো লাগবে।’ পাঁচ উইকেট পেয়েও গেলাম। ম্যাচসেরাও হলাম। এরপরই সেই ‘ভয়ংকর’ মুহূর্ত!

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে ভড়কে গেলাম। ব্যাটসম্যানদের মোকাবিলা করতে খুব একটা ভয় কাজ করে না, যতটা লাগে সংবাদ সম্মেলনে। ভয়ংকর এক জায়গা! মাইক্রোফোন দেখলেই ভীষণ অস্বস্তি হয়! কী বলব বুঝতে পারি না। এখনো পর্যন্ত যে কটা ম্যাচ খেলেছি, মাঠে তেমন স্নায়ুচাপে ভুগিনি, যতটা ভুগেছি সংবাদ সম্মেলনে।

টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি—সব মিলিয়ে ১১টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছি। এ কটি ম্যাচে আমার কাছে সব উইকেটই গুরুত্বপূর্ণ। তবে অভিষেক টি-টোয়েন্টিতে শহীদ আফ্রিদির উইকেটটা পেয়ে সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছিল। এরপর ধোনির উইকেট। সুরেশ রায়নাকে পরপর তিন ম্যাচে আউট করাটাও স্মরণীয়। চট্টগ্রাম টেস্টে কুইন্টন ডি ককের স্টাম্প উড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্যটাও ভীষণ আনন্দ দিয়েছে।

মাঠে চুপচাপ থাকতেই ভালো লাগে। পেসারদের স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক মেজাজ আমার নেই। কাউকে স্লেজিং করি না, কেউ স্লেজিং করলেও গায়ে মাখি না। আমার কাজ বোলিং করা। সেটাই ঠিকঠাক করার চেষ্টা করি। খেলার কারণে রোজার ঈদে বাড়ি যেতে পারিনি। মনটা ভীষণই খারাপ হয়েছিল। তবে ৮ আগস্ট বাড়ি ফেরার সময় আমাকে নিয়ে মানুষের বিপুল আগ্রহ দেখে ভীষণ চমকে গিয়েছিলাম। এর আগে ও পরে আরও বাড়ি গিয়েছি। কিন্তু ওই মাত্রায় মাতামাতি হয়নি। হাজার হাজার মানুষ এসেছিল আমাকে বরণ করে নিতে। সাতক্ষীরার শ্যামনগর থেকে ১৩-১৪ বছর বয়সী এক ক্যানসার রোগীর কথা মনে পড়ে। অসুস্থ অবস্থায় চলে এসেছিল আমাকে দেখতে।

এলাকায় গেলে কেবল ভক্ত-সমর্থকই নন, আগে যাঁদের সঙ্গে খেলতাম, যাঁদের ভীষণ শ্রদ্ধা করি, তাঁরাও আমাকে দেখতে চলে আসেন। আমার সঙ্গে ছবি তুলতে চান। আমার জন্য ব্যাপারটা কখনো কখনো বেশ বিব্রতকর। অনেকে প্রশ্ন করেন, আগের জীবন আর এখনকার জীবনের পার্থক্য কী? বলি, কিছুই না। আগের মতোই আছি। পার্থক্য কেবল এতটুকুই—আগে মুস্তাফিজকে মানুষ চিনত না, এখন চেনে। আগে এলাকায় খেলতাম, এখন দেশ-বিদেশে খেলি। শুধু খেলার জায়গাটারই পরিবর্তন হয়েছে, আমার হয়নি।

মুস্তাফিজুর রহমান: জাতীয় দলের ক্রিকেটার