কেরানীগঞ্জের সবজি ঢাকায় আসছে, যাচ্ছে বিদেশেও

ভোরের আলো তখনো ভালো করে ফোটেনি। কিন্তু ততক্ষণে কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া বাজারে হরেক রকমের শীতকালীন শাকসবজির হাট শুরু হয়ে গেছে। সবজিচাষিরা একদিকে ভ্যান ও মাথায় করে শাক আর সবজি আনছেন আর পাইকারি ক্রেতারা তা দরদাম করে কিনে পাঠিয়ে দিচ্ছেন রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে। আবার এখান থেকে বাছাই করা কিছু সবজি চলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশেও।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া, ভাকুর্তা, সিরাজনগর, তারানগর, আঁটিবাজার, হজরতপুরের চাষিদের আবাদ করা শীতের সবজির এটিই সবচেয়ে বড় হাট। প্রতি শনিবার এই হাট বসে।
গত শনিবার সকাল ছয়টায় এই হাটে সরেজমিনে দেখা গেছে, পাঁচ শ-এর মতো বিক্রেতা এসেছেন এই হাটে। আর রাজধানীর বিভিন্ন বাজারের পাইকারি বিক্রেতারা ছোট ট্রাক বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে তা দরদাম করে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। বিক্রেতারা জানান, বর্ষার পানি কমতে শুরু করায় দুই সপ্তাহ থেকে শীতকালীন শাকসবজির সরবরাহ বেড়েছে। এই হাটে লাউ, বেগুন, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, করলা, বরবটি, পটোল, শিম, চালকুমড়া, ফুলকপি, বাঁধাকপিসহ বেশ কয়েক ধরনের তাজা সবজি মিলছে। এ ছাড়া লাউশাক, লালশাক, সরিষাশাক, পালংশাকসহ আরও নানা জাতের শাক পাওয়া যাচ্ছে। রাজধানীর বাজার থেকে প্রতি কেজিতে দাম গড়ে ১০-১৫ টাকা কম।
স্থানীয় চাষিরা জানান, এই হাটের শাকসবজি কারওয়ান বাজার, নবাবগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর বাজার, কৃষি মার্কেট, বাবুবাজার এলাকায় বেশি যায়। প্রতিদিন এখানে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার সবজি কেনাবেচা হয়।
বাবুবাজারের খুচরা ও পাইকারি সবজি বিক্রেতা কবির আকন্দ ছোট একটি পিকআপ নিয়ে এসেছেন এই হাটে। এক এক করে বিভিন্ন পদের শাকসবজি কিনছিলেন। তিনি বলেন, ‘কেরানীগঞ্জেই আবাদ হয় বইলা সকালে এই বাজারে তাজা সবজি পাওয়া যায়। দামও কিছুটা কম পড়ে। বেশি সবজি কিনলে লাভও ভালো টেকে। তাই এই হাট থাইকা সবজি কিনি।’
আরেক পাইকারি ক্রেতা ঢাকার নবাবগঞ্জ বাজারের সৈয়দ আলী জানালেন, তিনি রোজ সকালে এই হাট থেকেই সবজি কেনেন। সব ধরনের শাক ও সবজি এখানে পাওয়া যায় বলে এখান থেকে তাঁর সবজি কিনতে সুবিধা হয়। কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা মহীউদ্দিন বললেন, তাঁর বাড়ি এই এলাকাতেই। প্রতিদিন সকালে তিনি এই হাট থেকে সবজি কিনে কারওয়ান বাজারে বিক্রি করেন। তাঁর দেখাদেখি আরও অনেক বিক্রেতা এখান থেকে শাকসবজি কিনছেন।
কেরানীগঞ্জের দক্ষিণ ডালিকান্দির বাসিন্দা সাইফুল খেতের বরবটি নিয়ে এসেছেন এই হাটে বিক্রির জন্য। তিনি বলেন, ‘একদম তাজা। কোনো ওষুধ দেই না। একেবারে ফ্রেশ সবজি পাওয়া যায় আমাগো এই হাটে।’
মিরাজনগরের বাসিন্দা মো. লিটন বিক্রি করছিলেন ফুলকপি। প্রতিটি ফুলকপি বিক্রি করছেন ১৮ টাকায়। তিনি বলেন, ‘আমাগো হাটের নামডাক আছে। ব্যাপারীরা জানে এই হাটের মাল ভালো আর দামেও পড়তা পড়ে।’
ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে দেখা গেল কিছু ভালো মানের সবজি হাটের এক পাশে একটি ঘরের নিচে জমা করে রাখা হচ্ছে। আর কয়েকজন মানুষ তা যত্ন নিয়ে প্যাকেট করছেন। জানা গেল, বাছাই করা সবজি বিদেশে পাঠানো হয়।
প্রায় ৩০ বছর ধরে সবজি বিক্রি করেন এই এলাকার কলাতিয়ার মিঠাপুর গ্রামের বাসিন্দা জলিল মিয়া। তিনি জানালেন, ঢাকার কয়েকজন ক্রেতা আছেন, যাঁরা বাছাই করা তাজা সবজি নেন। তাঁরাই এগুলো বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
জলিল মিয়া বলেন, ‘বিদেশে ফ্রেশ সবজি পাঠাইতে হয়, তাই বাজারের সবজি যে দামে পাওয়া যায় তার থেকে এই সবজির দামে বেশি। এতে লাভও কিছুটা বেশি। প্রতি সপ্তাহে তিনি প্রায় এক লাখ টাকার সবজি বিদেশে পাঠান। এই হাটে জলিল মিয়ার মতোই আরও একইভাবে বিদেশে সবজি পাঠান আমান উল্লাহ, আকসু মিয়া, সাহাব উদ্দিন। তাঁরা জানালেন, এই হাটের বাছাই করা সবজি কুয়েত, কাতার, জার্মানি, ইতালি, লন্ডন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় নিয়মিত পাঠানো হয়।