সম্ভাবনাময় সাইকেল রফতানি

নাজমুল শুভ
দেশে বাইসাইকেল তৈরি শুরু হয় গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে। এর দীর্ঘদিন পর ২০০০ সাল থেকে বিদেশে যেতে থাকে সাইকেল। তবে রফতানিতে ব্যাপক প্রবৃদ্ধির শুরু ২০০৮ সাল থেকে। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৮ কোটি ৪৫ লাখ ডলার মূল্যের বাইসাইকেল রফতানি হয়। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ১২ কোটি ৬০ লাখ ডলার। এ হিসাবে গত ছয় বছরে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৯ শতাংশ।

তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে হঠাৎ করে বাইসাইকেল রফতানিতে ব্যাপক ছন্দপতন ঘটেছে। ইপিবির তথ্যানুযায়ী জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ কোটি ৩৪ লাখ ডলারের রফতানি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩২ শতাংশ কম। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অগি্ন দুর্ঘটনায় মেঘনা গ্রুপের একটি সাইকেল কারখানা বন্ধ হওয়ায় রফতানিতে এ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গ্রিসে মন্দার কারণে ইউরোপের বাজারে অস্থিরতাও রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন তারা। তবে খুব শিগগির এ অবস্থার উন্নতি ঘটবে বলে আশা করছেন রফতানিকারকরা।
চলতি বছর ১৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম প্রান্তিকে লক্ষ্যমাত্রা ৩ কোটি ১৯ লাখ ডলারের রফতানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বিপরীতে ২ কোটি ৩৪ লাখ ডলার মূল্যের সাইকেল
রফতানি হয়েছে।
ইইউভুক্ত দেশগুলোর বাণিজ্য সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরো স্ট্যাটের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে সাইকেল রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম। ২০০৯ সালে ইউরোপের বাজারে বাইসাইকেল রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল নবম। ২০১০ সালে তা পঞ্চম স্থানে উঠে আসে, যা এখনও অটুট রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিবেদন লুসিনটেলের তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালে বাইসাইকেলের বৈশ্বিক বাজারের আকার ৬ হাজার ৪০০ কোটি ডলার হতে পারে। এ বাজারের বড় অংশ দখলের একটি সুযোগ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন রফতানি সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ২০০০ সাল থেকে ইপিবি বাইসাইকেল রফতানির হিসাব রাখা শুরু করে। যদিও এর আগে স্বল্প পরিমাণে রফতানি হয়েছে। রফতানি হওয়া বাইসাইকেলের ৮০ শতাংশই যায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে। বাকিটা যায় ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে।
২০০৮ ও ২০০৯ সালে যথাক্রমে ৩ লাখ ৭১ হাজার ও চার লাখ ১৯ হাজারটি বাইসাইকেল রফতানি হয়। ২০১৪ সালে রফতানির পরিমাণ দাঁড়ায় ছয় লাখে।
প্রায় ২০ বছর আগে ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে তাইওয়ানভিত্তিক আন্তর্জাতিক কোম্পানি এলিটা বাংলাদেশ স্বল্পপরিসরে বাংলাদেশ থেকে বাইসাইকেল রফতানি শুরু করে। পরে এ ধারায় যুক্ত হয় মেঘনা গ্রুপ। বর্তমানে দেশের মোট বাইসাইকেল রফতানির প্রায় ৭০ শতাংশই রফতানি করছে মেঘনা। ১৯৯৬ সালে তেজগাঁওয়ে সরকারি বাইসাইকেল তৈরির প্রতিষ্ঠান কিনে এ খাতে যাত্রা শুরু করে গ্রুপটি। এরপর ১৯৯৯ সাল থেকে রফতানি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
মেঘনা গ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, গত মে মাসে আগুনে পুড়ে চারটি কারখানার মধ্যে একটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায়। সাইকেল সংযোজনের বড় অংশের কাজ হতো এখানে। তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামগ্রিক রফতানিতে প্রভাব পড়েছে। তবে ডিসেম্বরের শেষ থেকেই
পুরোদমে কারখানাটিতে উৎপাদন শুরু হবে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে ফ্রিস্টাইল, মাউন্টেন ট্র্যাকিং, ফ্লোডিং, চপার, রোড রেসিং, টেন্ডমেড (দু’জনে চালাতে হয়) ধরনের বাইসাইকেল রফতানি হচ্ছে। এসব সাইকেল তৈরির বেশিরভাগ যন্ত্রাংশই দেশে তৈরি হচ্ছে। বিশেষত চাকা, টিউব, হুইল, প্যাডেল, হাতল, বিয়ারিং, আসন তৈরি করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। কিছু যন্ত্রাংশ এখনও দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হলেও বেশিরভাগ যন্ত্রাংশই দেশে
তৈরি হচ্ছে।
আলিতা বাংলাদেশের মহাব্যবস্থাপক এএসএম ফেরদৌস সমকালকে বলেন, বর্তমানে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বছরে প্রায় ২ লাখ পিস বাইসাইকেল রফতানি হচ্ছে।
সাইকেলের রফতানি ও স্থানীয় বাজারকে সামনে রেখে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বড় বিনিয়োগ করেছে প্রাণ-আরএফএলের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রংপুর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ। বছরে পাঁচ লাখ উৎপাদন ক্ষমতার এ কারখানায় উৎপাদিত ‘দুরন্ত’ সাইকেল দেশের বাজারে বিক্রির পাশাপশি গত মে মাস থেকে রফতানিও হচ্ছে। ২০১৫ সালে এক লাখ সাইকেল রফতানির লক্ষ্য ঠিক করেছে গ্রুপটি।
এ ছাড়া জার্মান-বাংলা, এলিটা ও নর্থবেঙ্গল নামের প্রতিষ্ঠানগুলো ঢাকা, গাজীপুর ও
চট্টগ্রামের কারখানায় তৈরি সাইকেল বিদেশে রফতানি করছে।