দারিদ্র্য জয়ের পুরস্কার পেলেন ছয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা

একদিন তাঁরা ছিলেন হতদরিদ্র; যা এখন কথার কথা মাত্র। কারণ, শূন্য থেকে শুরু করে তাঁরা এত দিনে ‘বিন্দু থেকে সিন্ধু’ গড়ে তোলার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। নিজেদের দারিদ্র্যকে জয় করে সচ্ছল জীবনযাপনই শুধু নয়, বরং কর্মসংস্থান তৈরির মাধ্যমে আরও কিছু মানুষকে নিয়ে এসেছেন সুন্দর ভবিষ্যতের পথে।
সাফল্যের সোপান বেয়ে ওপরে ওঠা এ রকম ছয়জন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পেয়েছেন দশম সিটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পুরস্কার (সিএমএ)। একই সঙ্গে ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী দুটি সংস্থাকেও এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
সিটি ফাউন্ডেশনের সহায়তায় সিটিব্যাংক এনএ ও ক্রেডিট ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) পুরস্কারটি দিয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে গতকাল শনিবার এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। এতে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম আবদুল মান্নান প্রধান অতিথি হিসেবে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন।
আর সিটির এশিয়া প্যাসিফিক করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ম্যানেজিং ডিরেক্টর রেজিনা সো বিজয়ীদের হাতে প্রাইজ মানি বা পুরস্কারের অর্থ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সিটি মাইক্রোএন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যাওয়ার্ডস (সিএমএ) উপদেষ্টা পর্ষদের চেয়ারপারসন রোকিয়া আফজাল রহমান সনদ হস্তান্তর করেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশে ভারপ্রাপ্ত সিটি কান্ট্রি অফিসার সাজেদুল ইসলাম এবং সিএমএ বাছাই কমিটির চেয়ারপারসন ও ক্রেডিট ডেভেলপমেন্ট ফোরামের (সিডিএফ) নির্বাহী পরিচালক আবদুল আওয়াল।
এবারে চুয়াডাঙ্গার শাহাপুরের মো. ওলি উল্লাহ পেয়েছেন ‘বছরের সেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা’ পুরস্কার। শিক্ষানবিস শ্রমিক থেকে হয়ে ওঠেন জনতা ইঞ্জিনিয়ারিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক; যেটি ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, লাঙলসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করে। এটিই তাঁর ভাগ্য বদলে দেয়। পুরস্কার ছাড়াও তিনি সাড়ে চার লাখ টাকার প্রাইজ মানি পান। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘কেউ যদি সঠিকভাবে কাজ করেন, তাহলে তিনি অবশ্যই সফল হবেন।’
একই শ্রেণিতে রানারআপ পুরস্কার হিসেবে এক লাখ টাকার প্রাইজ মানি পান বগুড়ার দেবখণ্ডের মো. নুরুল ইসলাম শেখ।
‘বছরের সেরা ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা’ পুরস্কার পেয়েছেন ঠাকুরগাঁওয়ের পশ্চিম কাদিরহাটের ফাতেমা খাতুন। তিনি মাত্র পাঁচ হাজার টাকার ক্ষুদ্রঋণ নিয়ে মেসার্স ফাতেমা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য পুরস্কার পান। প্রতিষ্ঠানটি গার্মেন্টসের ঝুট কাপড় দিয়ে মাদুর ও জায়নামাজ তৈরি করে; যা তাঁর ভাগ্য গড়ে দেয়। সাড়ে তিন লাখ টাকার প্রাইজ মানি পাওয়া ফাতেমা বলেন, ‘সাহস ও সদিচ্ছা যেকোনো নারীকে সফল করে তুলতে পারে।’
একই শ্রেণিতে গাজীপুরের মেলা দেশিপাড়ার মোমেনা আক্তার রানারআপ হন। তিনি পান এক লাখ টাকা।
‘কৃষি খাতে বছরের সেরা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা’ পুরস্কার লাভ করেন যশোরের চাঁচড়ার প্রহ্লাদ বর্মণ। তিনি বলেন, ‘আমি প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করি। কিন্তু এরপর আর পড়ালেখা করতে পারিনি দারিদ্র্যের কারণে। তিনি ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে ২০০ টাকা ধার করে তিন কাঠা জমি লিজ নিয়ে শুঁটকি তৈরির ব্যবসায় নামেন। ব্যস, আর তাঁকে আর কখনো পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বর্তমানে নিজস্ব চার বিঘা ও লিজ নেওয়া ৫৪ বিঘা জমিজুড়ে বিস্তৃত তাঁর মৎস্য চাষ। তাঁর দেখাদেখি এলাকার আরও অন্তত ১৫ জন এই ব্যবসায়ে এসেছেন। তিনি প্রাইজ মানি পান সাড়ে তিন লাখ টাকা।
একই শ্রেণিতে চুয়াডাঙ্গার লক্ষ্মীপুরের মো. উসমান গণি রানার হিসাবে এক লাখ টাকার প্রাইজ মানি লাভ করেন।
এদিকে ‘বছরের সেরা ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে সাজিদা ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটি তিন লাখ টাকার প্রাইজ মানি পায়।
এ ছাড়া ‘বছরের সবচেয়ে উদ্ভাবনী ক্ষুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে পুরস্কার লাভ করেছে সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট ইনোভেশন অ্যান্ড প্র্যাকটিস (সিদিপ। এই প্রতিষ্ঠান পায় চার লাখ টাকার প্রাইজ মানি।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান বলেন, দেশে দারিদ্র্যের হার কমে ২২-২৩ শতাংশে নেমে এসেছে; যা ছয়-সাত বছর আগেও ছিল ৪৪ শতাংশ। একই সঙ্গে হতদরিদ্রের হারও কমে ১০ শতাংশের নিচে চলে এসেছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আরও এগোতে হবে। এ জন্য আমাদের বেসরকারি খাত ও ব্যক্তিগত পর্যায় থেকেও সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় সহযোগিতা প্রয়োজন।
এই পুরস্কারের মিডিয়া পার্টনার হয়েছে ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার ও চ্যানেল আই টিভি।
সিটিগ্রুপের জনহিতকর সংস্থা সিটি ফাউন্ডেশন ২০০৫ সালে সিটি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা পুরস্কার প্রবর্তন করে।