গেইম খেলে পাক্কা ব্যবসায়ী!

মনোপলির মতো ‘টিন-ট্রাপ্রিনিওর ফিউশন’ও একটি পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক খেলা। এখানে গেইমার নিজের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে, বিক্রি বাড়ানোর মাধ্যমে পুঁজি বাড়াতে ও কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসায়িক দুনিয়ায় শীর্ষস্থানীয় পুঁজিপতি হওয়ার পথ তৈরি করতে পারবেন। প্রতিযোগিতা করা যাবে দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়দের সঙ্গে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাণিজ্য বিষয়ের প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যবসায় উদ্যোগ, নীতি, অর্থ ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্র ব্যবসা ইত্যাদি যা শেখানো হয়, তার অনেক কিছুই আছে এ খেলায়। গেইমটিতে জোর দেওয়া হয়েছে দলীয়ভাবে কাজ, ঝুঁকি ও বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ায় দক্ষতা বাড়ানোর ওপর। প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে যে দল সবার আগে পাঁচ হাজার পাউন্ড আয় করতে পারবে, তাদের বিজয়ী ধরা হবে।

যা আছে গেইমটিতে

হোটেল, টেলিকম, রেস্টুরেন্ট, ট্রাভেল এজেন্ট ও দোকান ইত্যাদি বিভাগ রয়েছে গেইমটিতে। গেইমারকে শুরুতে বেছে নিতে হবে ব্যবসায়িক এলাকা। মূল লক্ষ্য একজন খেলোয়াড়কে ব্যবসার শুরু থেকে শিল্পপতি করে তোলা। এখানে ন্যূনতম বিনিয়োগের মাধ্যমে খেলা শুরু করতে হবে। ধীরে ধীরে নানা ঝুঁকি ও সুযোগ সদ্ব্যবহার করে তিনি হয়ে উঠবেন সফল ব্যবসায়ী। বাস্তবের ব্যবসায় যে বিষয়গুলোর মুখোমুখি হতে হয়, তার অনেক কিছুই আছে গেইমটিতে। আছে ব্যাংক থেকে শর্তে ঋণ নেওয়া, শেয়ারবাজারে কেনাবেচা, বিভিন্ন সময়ে ঝুঁকি নেওয়া এবং ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এসব প্রক্রিয়া সুনিপুণভাবে সমন্বয় করে একজন খেলোয়াড়কে নিজ দায়িত্বে তার মূল ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করে খেলায় অগ্রসর হতে হবে। খেলাটি একে অপরের ওপর ব্যবসায়িক নির্ভরশীলতা সম্পর্কেও ধারণা দেবে।

গেইমটির পেছনে সাবিরুল

সাবিরুল ইসলাম। ১৯৯০ সালের ১২ জুলাই জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ তরুণ উদ্যোক্তা, লেখক ও বক্তা। জন্ম ও বেড়ে ওঠা লন্ডনে। বাবার নাম শফিকুল ইসলাম। দাদার বাড়ি বাংলাদেশের সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায়। তাঁর লেখা কাহিনীতে তৈরি গেইম ‘টিন-ট্রাপ্রিনিওর’ যুক্তরাজ্যের ৬৫০টি স্কুলে পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের খেলতে দেওয়া হয়। পাওয়া যায় ১৪টি দেশে। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী ১০০ ব্রিটিশ-বাংলাদেশির তালিকায় নাম আছে তাঁর। তাঁর লেখা বই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট ইওর ফিট’ বিক্রি হয়েছে ৬০ হাজার কপি। তিনি এখন ‘ইনস্পায়ার ওয়ান মিলিয়ন’ কার্যক্রম চালাচ্ছেন। লক্ষ্য বিশ্বজুড়ে ১০ লাখ তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করা। ইতিমধ্যে এই প্রকল্প নিয়ে তিনি বিশ্বের ২৫টিরও বেশি দেশের আট লাখের বেশি তরুণের সামনে কথা বলেছেন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিউ ইয়র্ক স্টক মার্কেটে কাজ শুরু করেন। ১৭ বছর বয়সে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন প্রথম বই-দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট ইওর ফিট। প্রকাশের ৯ মাসে বইটি বিক্রি হয় ৪২ হাজার ৫০০ কপি! আর এই সময়টায় ৩৭৯টি অনুষ্ঠানে নিজের বই ও ভাবনা নিয়ে বক্তব্য দেন তিনি। বইয়ের প্রকাশনা উৎসবে উপস্থিত ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন বলেছিলেন, ‘পৃথিবীতে প্রেরণার প্রতীক হয়ে আলো ছড়াবে এই তরুণ।’ পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরের খ্যাতনামা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মার্শাল ক্যাভেন্ডিস থেকে দ্বিতীয় বই ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যাট ইওর ফিট-থ্রি স্ট্রাইকস টু এ সাকসেসফুল এনট্রাপ্রিনিওর’ প্রকাশিত হয়। বইটি মূলত নানা দেশের ২৫ জন টিন-স্পিকারের (কিশোর বক্তা) সাফল্যগাথা। বই আর বক্তৃতার পাশাপাশি ‘টিন-ট্রাপ্রিনিওর’ গেইম তৈরির ভাবনা নিয়ে স্কুলপড়ুয়া তরুণদের ব্যবসা শেখার মজার এই বোর্ড গেইম শুরু করলেন তিনি। একসঙ্গে শুরু হয় বিশ্বের ১৪টি দেশে বিক্রি। এ পর্যন্ত পাঁচ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে গেইমটি। ইংরেজির বাইরে আরো ১৩টি ভাষায় বের হয়েছে এটি।

গেইম খেলে পাক্কা ব্যবসায়ী!’টিন-ট্রাপ্রিনিওর ফিউশন’-এর স্ক্রিনশট

মেইড ইন বাংলাদেশ

সাবিরুলের সাড়াজাগানো গেইমটি এখন পরিচিত হবে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ হিসেবে। বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের উপযোগী করে নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে এই গেইম। কাজটি করবে দেশের অন্যতম মোবাইল অ্যাপ তৈরির প্রতিষ্ঠান ‘ড্রিম৭১ বাংলাদেশে লিমিটেড’। গত ৬ অক্টোবর সাবিরুল ও ড্রিম৭১-এর মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হয়।

নতুন উদ্যোগে যা হবে

‘টিন-ট্রাপ্রিনিওর ফিউশন’ তরুণ উদ্যোক্তাদের আগ্রহী করতে অ্যানড্রয়েড ও আইওএস প্ল্যাটফর্মের জন্য একটি গেইমিং অ্যাপ্লিকেশন, যা সাবিরুলের সাড়াজাগানো বোর্ড গেইমসের আলোকে তৈরি করা হচ্ছে। বোর্ড গেমসটি যুক্তরাজ্যের ৫৫০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ ২০টির অধিক দেশে তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষাসহায়ক টুল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী একে আরো ইন্টারেক্টিভ ডিজিটাল গেমে রূপান্তর করা হবে। খেলা যাবে অনলাইন ও অফলাইনে। ড্রিম৭১ বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাশাদ কবির বলেন, আমরা সব সময় চেষ্টা করি উদ্ভাবনী কিছু করার। মোবাইল অ্যাপ, গেইম তৈরি করা শুধু আমার কাছে পেশা নয়, নেশাও। সাবিরুলের সঙ্গে টিন-ট্রাপ্রিনিওরে কাজ করতে পেরে ভালো লাগছে। কারণ গেইমের কনসেপ্টটা অনন্য, ধরনটাও আর ১০টা গেইম থেকে আলাদা। আরো ভালো লাগছে, কারণ গেইমটি শিক্ষামূলক। আমাদের তৈরি গেইম খেলে বাচ্চারা শিখবে, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি একজন উদ্যোক্তার জীবনে আর কী হতে পারে! কেন যেন মনেপ্রাণে বিশ্বাস হচ্ছে, অনেক দিন পর বাংলাদেশ থেকে এমন একটি গেইম তৈরি হবে, যেটা নিয়ে আমরা বাংলাদেশের মানুষ সবাই গর্ব করে বলতে পারব গেইমটি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’।

অপেক্ষা কিছু সময়ের

সাবিরুল জানান, বোর্ড গেইমের মাধ্যমে তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়া ও আর্থিক শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে ২০০৯ সালে টিন-ট্রাপ্রিনিওর গেইমটি তৈরি করা হয়। ইতিমধ্যেই সফলতার ছয়টি বছর পেরিয়ে গেছে। নতুনভাবে মোবাইলের জন্য গেইমটি তৈরি করতে যাচ্ছি। এটি ‘টিন-ট্রাপ্রিনিওর ফিউশন’ নামে পরিচিত হবে। আইওএস ও অ্যানড্রয়েড ডিভাইসের জন্য তৈরি হতে যাওয়া গেইমটি একজন সফল উদ্যোক্তা হতে হাতে-কলমে শিক্ষা দেবে। তবে হাতের মুঠোয় গেইমটি পেতে আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। আসছে মার্চে ‘গ্লোবাল মানি উইক’-এ গেইমটিকে বিশ্বব্যাপী প্রকাশ করা হবে। গেইমটির নিয়মিত আপডেট ও রোমাঞ্চকর সব গেইমিং টুলস পেতে www.teentrepreneurfusion.com সাইট থেকে নিবন্ধন করতে হবে।