দেশি জাহাজে ৫০ শতাংশ পণ্য পরিবহন বাধ্যতামূলক হচ্ছে

পণ্য আমদানিতে জাহাজ ভাড়ায় প্রতিবছর ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। এ ব্যয়ের বড় অংশ যাচ্ছে বিদেশি জাহাজ কোম্পানিগুলোর পকেটে। বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় ও দেশি শিপিং লাইনের সংকট কাটাতে পণ্য আমদানির অন্তত ৫০ শতাংশ দেশি জাহাজে পরিবহন বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

এ জন্য বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ (সংরক্ষণ) আইন-২০১৩ সংশোধন করে দেশি শিপিং লাইনের জাহাজের মাধ্যমে পণ্য আমদানির পরিমান বাড়ানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। আইনের খসড়া ইতিমধ্যে প্রায় চূড়ান্ত করেছে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়। বর্তমান আইনে আমদানির ৪০ শতাংশ দেশি জাহাজে পরিবহনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইতিমধ্যে খসড়া তৈরিতে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন ও বাংলাদেশ ওশান গোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মতামত নেওয়া হয়েছে। উভয় পক্ষ ৫০ শতাংশ দেশি জাহাজে আমদানি বাধ্যবাধকতার বিষয়টিকে ইতিবাচক উল্লেখ করে মতামত দিয়েছে। এমন মত পাওয়ার পর আইনটি সংশোধন করে চূড়ান্ত রূপ দিতে সম্প্রতি নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদীর সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শিগগিরই এ খসড়া আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত জানতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জাহাজ ভাঙা শিল্পের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত দেশি জাহাজ কোম্পানিগুলো এখন নানামুখী সংকটে রয়েছে। বিশেষ করে জাহাজ তৈরিতে ব্যবহৃত সরঞ্জামের দাম কমায় নতুন করে আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিষ্ঠান এ ব্যবসায় যোগ দিচ্ছে। এতে পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলো উল্লেখযোগ্য সময়ে কাজ না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানের কাজ কমে গেছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন স্থানীয় শিপিং লাইনের উদ্যোক্তারা।
বাংলাদেশ ওশান গোয়িং শিপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এইচআরসি শিপিংয়ের চেয়ারম্যান এসএম মাহফুজুল হক সমকালকে বলেন, দেশি জাহাজ কোম্পানিগুলো এখন নানান সমস্যায় রয়েছে। পণ্য পরিবহনে দেশীয় জাহাজ ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা বাড়ানোর উদ্যোগ এ খাতের জন্য সহায়ক হবে। এতে অনেকেই জাহাজ ব্যবসায় উৎসাহ ফিরে পাবেন। তিনি বলেন, প্রতিবছর জাহাজ ভাড়ার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ বিদেশিরা নিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় জাহাজে পণ্য পরিবহন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রার আয় দেশের অভ্যন্তরেই থাকবে। দেশের অর্থনীতিতে যা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
জানা গেছে, এতে ৫০ শতাংশ স্থানীয় শিপিং লাইনের মাধ্যমে পরিবহন বাধ্যবাধকতার পাশাপাশি আরও একটি নতুন বিষয় সংযোজন করা হয়েছিল। সেটি হলো_ দেশি শিপিং লাইনের অগ্রাধিকার দিতে দরপত্র প্রক্রিয়ায় দেশি জাহাজের দরপত্রদাতার দর সর্বনিম্ন না হলেও তাদের কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য বিদেশি পতাকাবাহী জাহাজের অনুকূলে পাওয়া সর্বনিম্ন দরে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ সম্মত হলে পণ্য পরিবহনে সেটিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তবে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও কয়েকবার কাজ না পেলে পরে বিদেশি জাহাজগুলো এ ধরনের দরপত্রে অংশগ্রহণ করবে না। তখন দেশীয় জাহাজের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে এ খাতে নানা সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে এ বিষয়টি খসড়া থেকে বাদ দিয়ে বিদ্যমান নিয়মে সর্বনিম্ন দরদাতা জাহাজ কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার বিষয়টি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) জাহাজ ভাড়াসহ ৬৫৬ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। জাহাজ ভাড়া বাদ দিয়ে আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৯১ কোটি ডলার। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জাহাজ ভাড়াসহ পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল চার হাজার ৫১৯ কোটি ডলার। জাহাজ ভাড়া বাদ দিয়ে আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল চার হাজার ৬৮ কোটি ডলার। এভাবে প্রতি অর্থবছর প্রায় ৫০০ কোটি ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় পণ্যের ভাড়া পরিশোধে। বিদ্যমান আইনে এ ভাড়ার ৬০ শতাংশের বেশি নিয়ে যায় বিদেশি জাহাজ কোম্পানি। তবে দেশীয় জাহাজে পণ্য পরিবহন বাড়লে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় কমবে।
বিদ্যমান আইনে ৪০ শতাংশ স্থানীয় শিপিং লাইন ব্যবহার করে যে দেশ থেকে পণ্য আমদানি হবে, সেখানকার জাহাজ ব্যবহার করে ৪০ শতাংশ এবং তৃতীয় কোনো দেশের মাধ্যমে ২০ শতাংশ আমদানির বিধান রয়েছে। তবে সংশোধনীতে ৫০ শতাংশ দেশীয় জাহাজ, রফতানিকারক দেশের জাহাজ ব্যবহার করে ৪০
শতাংশ এবং তৃতীয় দেশের মাধ্যমে ১০ শতাংশ আমদানির
কথা বলা হয়েছে।