জমি কমলেও চাল উৎপাদন বেড়েছে ৩ গুণ

১৯৭১ থেকে ২০১৫—যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দরিদ্র দেশ থেকে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে বাংলাদেশ। এই ৪৪ বছরের পরিক্রমায় এ দেশে ধানসহ বিভিন্ন দানাদার খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ৩ থেকে ৭৫৭ গুণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। এই সময়ে দেশের প্রধান কৃষিপণ্য উৎপাদনের চিত্র তুলে ধরে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
বিবিএসের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪৪ বছরে দেশের ধান চাষের জমি ১৮ শতাংশ কমেছে। কিন্তু একই সময়ে চালের উৎপাদন বেড়েছে ৩ দশমিক ১৬ গুণ।
তবে কৃষিবিজ্ঞানীদের অনেকে ফসলের উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সার, কীটনাশক ও সেচের পেছনে খরচ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হচ্ছে। একে দেশের টেকসই কৃষি উন্নয়নের পথে অন্তরায় হিসেবে দেখছেন অনেক কৃষিবিজ্ঞানী।
শুধুই কি ধান? অন্য ফসলেও উৎপাদন বৃদ্ধি বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। বিবিএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৪ বছরে দেশের আলু চাষের জমি সাড়ে ৫ গুণ বেড়েছে, আর ফলন বেড়েছে ১০ দশমিক ৯০ গুণ। এই সময়ে গমের উৎপাদন বেড়েছে ১২ দশমিক ২৫ গুণ। ভুট্টার ফলন বৃদ্ধির হার তো রীতিমতো চোখ ধাঁধানো। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশে ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে ৭৫৭ গুণ। আর এই ফসলের জমির পরিমাণ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ।
এ ব্যাপারে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, ‘ধানের জাত উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আমরা উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির উপযোগী জাত উদ্ভাবনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছি। খাদ্যশক্তির জন্য শুধু চালের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে আমরা ’৯৯ সালে দেশে ভুট্টা চাষ জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নিই।’ ভুট্টায় ভিটামিন এ এবং ডি থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ভুট্টা ও গম মিলিয়ে যে আটা হয় তা দেশের মানুষের বড় অংশের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। এভাবে কৃষকের উৎপাদিত পণ্য যাতে মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা মেটায় সেদিকে মনোযোগ দিয়ে আমরা উৎপাদন বাড়ানোর দিকে সরকারের উদ্যোগ অব্যাহত রাখব।’
তবে স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল ও রপ্তানি দ্রব্য পাটের চিত্র ধান, গম ও ভুট্টার মতো নয়। বরং উল্টো চিত্রই দেখা যায়। ৪৪ বছরে দেশে পাট চাষের জমির পরিমাণ কমেছে ২৫ শতাংশ। তারপরও উৎপাদন বেড়েছে ১৫ শতাংশের মতো।
দেশের দানাদার ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এই বিপুল অগ্রগতির কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক মাহবুব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, দেশের ধান-গম-ভুট্টার উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে কৃষকের পরিশ্রম ও উদ্যোগের পাশাপাশি বিজ্ঞানীদের নতুন নতুন উন্নত জাত উদ্ভাবনের সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে বাজারে এসব কৃষিপণ্যের চাহিদা বাড়ায় কৃষক কৃষিতে বেশি বিনিয়োগে আগ্রহী হয়েছেন।
জমির পরিমাণ না বাড়ার পরও ফসলের উৎপাদন এত বাড়ার উত্তরও বিবিএসের পরিসংখ্যানেই রয়েছে। ১৯৭০ সালে দেশের ফসলি জমিতে গড়ে একটি ফসল হতো। ২০১৫ সালের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী জমিতে বছরে গড়ে প্রায় দুটি ফসল হয়। এর মধ্যে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০ লাখ একর জমিতে লবণাক্ততার কারণে এখনো একটি ফসল হয়। দেশের হাওর এলাকায়ও বছরে একটির বেশি ফসল হয় না। দেশের বাকি এলাকায় বছরে দুই থেকে তিনটি ফসল হয়ে থাকে।
উৎপাদনের সঙ্গে বিপদও বাড়ছে: কৃষিবিজ্ঞানীদের একাংশ দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অন্য বিপদের কথাও বলছেন। তাঁদের মতে, পঞ্চাশের দশকে দেশের বেশির ভাগ ফসলের চাষ হতো স্থানীয় জাত দিয়ে। ষাটের দশকে সবুজ বিপ্লবের নামে উন্নত জাতের ধানের চাষ শুরু হয়। উফশী জাত রাসায়নিক সার, কৃত্রিম সেচ ও কীটনাশকনির্ভর হওয়ায় ধান চাষে খরচের পরিমাণও বেড়ে যায়। আর উফশী ধানের চাষ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে।
এ ব্যাপারে দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ একাডেমি অব এগ্রিকালচারের সাধারণ সম্পাদক গুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, রাসায়নিক সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ জমিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে কমে গেছে। একটি সুষম স্বাস্থ্যের মাটিতে চার শতাংশ জৈব উপাদান থাকার কথা। কিন্তু ওই ৬০ শতাংশ জমিতে তা এক শতাংশে নেমে এসেছে।
গুল হাসান আরও বলেন, মাটিতে জৈব উপাদান কমে যাওয়ায় তা আঠালো অথবা বালু হয়ে যাচ্ছে। এতে মাটির পানি ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। ফলে মাটিতে সেচ বেশি দিতে হচ্ছে। অন্যদিকে সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বাড়ায় ফসলের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সব সময় চেষ্টা করেছি কৃষককে দেশের চাহিদা ও পরিবেশের উপযোগী ফসলের নতুন জাত ও প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করতে। তবে বেশি ফসল উৎপাদন করতে গিয়ে যাতে মাটি ও পানির ক্ষতি না হয়, সেদিকে আমরা মনোযোগ দিচ্ছি। সুষম সার ব্যবহারের জন্য আমরা ইউরিয়া ও অন্যান্য সারের দামে সমন্বয় করেছি।’ এ ব্যাপারে জৈব সার ও বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়াতে সরকারের উদ্যোগ আরও বাড়বে বলে জানান তিনি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ টন রাসায়নিক সার ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ২০১৪ সালে দেশে ইউরিয়া সার ব্যবহৃত হয়েছে ২৪ লাখ ৫০ হাজার টন এবং অন্য সব রাসায়নিক সার মিলিয়ে ব্যবহৃত হয়েছে ২১ লাখ টন।
স্বাধীনতার সময় থেকে এ পর্যন্ত দেশের ধান চাষের ক্ষেত্রে মৌসুমভিত্তিক বদলও হয়েছে। ৪৪ বছর আগে দেশের বেশির ভাগ ধান উৎপাদিত হতো প্রকৃতিনির্ভর আমন ও আউশ থেকে। ১৯৭০-৭১ সালে দেশের মাত্র ২০ শতাংশ ফসল আসত বোরো থেকে। আর এখন দেশের ৫৫ শতাংশ চাল আসে বোরো থেকে। বোরোর মোট উৎপাদন বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।
৪৪ বছরে দেশে বর্ষার পানিনির্ভর আউশের চাষ কমেছে এক-তৃতীয়াংশ জমিতে। আর আমনের চাষ কমেছে ৪৪ শতাংশ। তারপরও এই সময়ে চালের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি।
ধানের এই উৎপাদন বাড়ার জন্য চাষি ও বিজ্ঞানীদের অবদানকে সবার আগে রেখেও বাংলাদেশের মাটিরও বিশেষ গুণের কথা বলেছেন জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মাইক রবসন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলো প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পলি নিয়ে এসে প্লাবনভূমিতে ফেলে। বন্যায় ওই পলি কৃষিজমিতে ছড়িয়ে যায়। হিমালয় থেকে বয়ে আসা ওই উর্বর পলি বাংলাদেশের ফসলের উৎপাদন বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) সূত্রে জানা গেছে, সংস্থার বিজ্ঞানীরা ১৯৭১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৭৪টি উচ্চফলনশীল (উফশী) ও চারটি হাইব্রিড ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে ১৪টি জাত লবণাক্ততা, বন্যা ও খরাসহিষ্ণু। এ ছাড়া বাংলাদেশ আণবিক কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা ১৬টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন, যার চারটি লবণাক্ততা ও খরাসহিষ্ণু জাত।