দেশে ১৫ বছরে দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নেমেছে

আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস আজ

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ৮০ শতাংশ মানুষ ছিল দরিদ্র। এখন সে অবস্থা নেই। সত্তর ও আশির দশকের তুলনায় পরবর্তী সময়ে দারিদ্র্য কমেছে বেশি হারে। গত ১৫ বছরে দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নেমেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অনুসারে ২০১৫ সালের টার্গেট তিন বছর আগেই অর্জন করে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে।

দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও এখনও প্রায় ৪ কোটি মানুষ দরিদ্র। এর মধ্যে চরম দরিদ্রের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি। আর সারাবিশ্বে চরম দরিদ্র প্রায় ৭০ কোটি লোক। সম্প্রতি জাতিসংঘ বিশ্বব্যাপী পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অনুমোদন করেছে। এর এক নম্বর লক্ষ্য চরম দারিদ্র্যের হার শূন্যে নামিয়ে আনা।
এমন বাস্তবতায় আজ ১৭ অক্টোবর পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস। ১৯৯৩ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। ১৯৯২ সালের ২২ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ সভায়
১৭ অক্টোবরকে দারিদ্র্য বিমোচন দিবসের মর্যাদা দেওয়া হয়। এ দিবসের এবারের বিষয়বস্তু হলো :টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণ :দারিদ্র্য এবং বৈষম্য দূর করতে ঐক্য।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন দিবসটি উপলক্ষে এক বাণীতে বলেছেন, ‘এই দিনে আমরা চরম দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে চিন্তা করার, সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং এক সঙ্গে কাজ করার পুনরায় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। পৃথিবীতে যাতে একটি মানুষও দরিদ্র না থাকে তার পরিকল্পনা করছি। আমাদের লক্ষ্য অবধারিতভাবে সবার কল্যাণ।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী ২০০০ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪৮ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০০৫ সালে কমে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশে। ২০১০ সালে আরও কমে হয় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই জরিপের ভিত্তিতে পরিকল্পনা কমিশনের প্রাক্কলন হলো, ২০১৫ সালে দারিদ্র্যের হার ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ। আর চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ৫ শতাংশ।

প্রধানত দুটি কারণে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। এর একটি হলো_ শ্রমের মজুরি বৃদ্ধি। অন্যটি জনসংখ্যার প্রকৃতিতে পরিবর্তন। মোট জনসংখ্যায় কর্মক্ষম লোকের অংশ বেড়ে যাওয়ায় মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বাংলাদেশের ওপর গতকাল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক আয় ও মজুরির পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্যের দাম কম থাকাকে দারিদ্র্য হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মতামত জানতে চাইলে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে অসাধারণ সাফল্যের মূল কারণ মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ধারাবাহিকভাবে ছয় শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি। এর বাইরে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্বব্যাংক গতকাল এক চিঠিতে বলেছে, দক্ষিণ এশিয়ায় চরম দারিদ্র্যের হার সাড়ে ১৩ শতাংশে নেমে আসবে। অবশ্য বাংলাদেশে দারিদ্র্য পরিমাপের পদ্ধতি বিশ্বব্যাংকের অনুরূপ নয়। বিশ্বব্যাংক এতদিন দিনে ১ ডলার ২৫ সেন্টের কম ব্যয় করতে পারে এমন লোককে দরিদ্র বলত। চলতি মাসে তা সংশোধন করে ১ ডলার ৯০ সেন্ট করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিমাপ পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তি দৈনিক নূ্যনতম ২ হাজার ১২২ ক্যালরির কম খাদ্য খেলে তাকে দারিদ্র্যসীমার নিচে বলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ১ হাজার ৮০৫ ক্যালরির কম হলে অতি দরিদ্র বিবেচনা করা হয়।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন সমকালকে বলেন, দারিদ্র্য বিমোচনে ভালো কর্মসংস্থান খুব জরুরি বিষয়। হতদরিদ্ররা মজুরি পায় খুব কম। ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বাইরে ভালো চাকরি পাওয়া কষ্টকর হয়ে গেছে। পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে এ সংকট কাটানো যেতে পারে।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি) ২০১০ সালে বিবিএসের জরিপের ওপর ভিত্তি করে দারিদ্র্যের হার প্রাক্কলন করে। জিইডি সদস্য ড. শামসুল আলম সমকালকে বলেন, প্রবাসী আয় ও রফতানি বৃদ্ধি এবং কৃষি উৎপাদনে ধারাবাহিক সাফল্যের কারণে দ্রুত দারিদ্র্য কমছে। তবে ঘনবসতির দেশ হওয়ায় এখনও একটি বড় শ্রেণী হতদরিদ্র থেকে গেছে। তিনি বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় দারিদ্র্য বিমোচন সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা ইকোনমিক এমপাওয়ারমেন্ট অব পুওরেস্টের (ইইপি) গবেষণা প্রধান ড. জুলফিকার আলী সমকালকে বলেন, দেশের অগ্রগতির আলো থেকে কিছু লোক পুরোপুরি বঞ্চিত। এমন জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কম নয়। নৃগোষ্ঠী, চর, হাওর, দুর্গম পাহাড়, উপকূল, রেললাইনের পাশে এবং ফুটপাতে বসবাসকারীরা দেশের নাগরিক হলেও তারা অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দারিদ্র্য বিমোচন পরিকল্পনায় তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।