খাদ্যনিরাপত্তায় সাফল্য

জনবহুল এবং অর্থনীতিতে পিছিয়ে থাকা উন্নয়নশীল প্রতিটি দেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। কেননা উন্নয়নশীল দেশে খাদ্য উৎপাদনে নানামাত্রিক ঝুঁকি বিদ্যমান। বাংলাদেশও জলবায়ুগত কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত দেশ। কিন্তু আশার কথা হলো, সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা এবং তার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের কারণে দেশটি খাদ্য উৎপাদনে সক্ষমতার পরিচয় দিয়ে চলেছে। পাশাপাশি জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির সবগুলো লক্ষ্যমাত্রা পূরণেও এগিয়ে চলেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষিবিষয়ক সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি ইন ওয়ার্ল্ড-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সফলতাসহ সার্বিক খাতের অগ্রগতি তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের এ সাফল্য আমাদের জন্য গৌরবের।
লক্ষণীয় যে, জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির নয়টি সূচকে নির্ধারিত সময়ের আগেই সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ। আরো ১০টি সূচকের অর্জন লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি রয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় এবার কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনের পাশাপাশি পুষ্টি নিরাপত্তায়ও বাংলাদেশের অগ্রগতি জানা গেল। অন্যদিকে খাদ্যনীতি গবেষণাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইফপ্রির ‘গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ‘৭০-এর প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পর বাংলাদেশের প্রবল খাদ্যসংকট এবং ‘৭১-এ নয় মাসের স্বাধীনতাযুদ্ধে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার চিত্র তুলে ধরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ তার আগের অবস্থানে নেই। কৃষিতে আধুনিক ও সময়োপযোগী প্রযুক্তির ব্যবহার বাংলাদেশের কৃষিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যে কারণে প্রাকৃতিক বিপর্যয় উজিয়েও বাংলাদেশ বেশির ভাগ খাদ্য উৎপাদন কয়েক গুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে চালের উৎপাদন তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন খাতের সাফল্য দেশের সামগ্রিক উন্নয়নেরই ইঙ্গিতবাহী।
এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাংলাদেশ স্বাধীনতার এই দীর্ঘদিনে দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা জনগোষ্ঠীর পরিমাণ কমিয়ে আনা, অপুষ্টিতে ভোগা শিশুর সংখ্যা ও খর্বাকৃতি শিশুর সংখ্যা কমিয়ে আনাসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সফলতা দেখিয়েছে। আবার গত দেড় দশকে ক্ষুধা নির্মূলেও দ্বিগুণ সাফল্য অর্জন করেছে। বলাই বাহুল্য, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশের ধারাবাহিক সাফল্য এসেছে কৃষকদের পরিশ্রম ও বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবনের ফলাফল হিসেবে। এছাড়া সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণ এবং তার সফল প্রয়োগও এই সফলতার অন্যতম সহায়ক, যা বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন। সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতেই এখন সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
স্মর্তব্য যে, বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। দেশে এখনো নানা সংকট বিদ্যমান। দেশটি সম্প্রতি নিম্ন-মধ্যম আয়ের বলয়ে ঢুকলেও উন্নত আয়ের দেশে রূপান্তরিত হওয়া নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জের। অন্যদিকে প্রতিবছর নগরায়ণসহ নানাবিধ কারণে দেশের কৃষি জমি হ্রাস পাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। অবশ্য শিল্প ও সেবা খাতের অব্যাহত উন্নতি ঘটলে এবং রপ্তানি বাণিজ্য চাঙ্গা থাকলে আমদানি করেও খাদ্য চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। কিন্তু জনবহুল ও স্বল্পোন্নত বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টিকে কিছুতেই পরনির্ভর করে রাখা উচিত নয়। বিশ্বের শীর্ষ খাদ্য উৎপাদনকারী দেশগুলো জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্যপণ্যের পরিবর্তে জৈব জ্বালানি উৎপাদনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলে এ বাস্তবতায় আমাদের কৃষি খাতকে আরো আধুনিকায়নের ওপর জোর দেয়া আবশ্যক। এজন্য সরকারের কর্তব্য হওয়া দরকার বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফল কাজে লাগানোর ওপরও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া। পাশাপাশি কৃষি জমি রক্ষাসংক্রান্ত আইনের বাস্তবায়নও জরুরি।
আমরা মনে করি, উন্নত রাষ্ট্রগুলোর মতো আমাদের দেশেও ভূমি ব্যবহার বিধি কঠোরভাবে অনুসরণের দিকে সতর্ক হতে হবে। অনস্বীকার্য যে, কৃষি খাত আমাদের বড় শক্তি। এ খাত কেবল মানুষের আহারই জোগায় না, শিল্প ও রপ্তানি খাতের বিকাশেরও বড় উৎস। ফলে আমরা বলতে চাই, কম আয়তনের দেশ এবং বিপুল জনসংখ্যা এবং সম্পদের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে বিশ্বের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে, এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। ভবিষ্যতে খাদ্যনিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি কমাতে কৃষি জমি রক্ষার পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেয়ার বিকল্প নেই।