প্রধানমন্ত্রীর সফর ও ছিটমহলের উন্নয়ন

‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র-মেদিনী’_ এ প্রবাদটি উদ্ধৃত করছি কারণ সুচের অগ্রভাগের মতো সামান্য ভূমিও কেউ যুদ্ধ ছাড়া অর্জন করতে পারেনি। আর যুদ্ধ মানেই রক্তক্ষরণ ও প্রাণক্ষয়। ছিটমহল বিনিময় দু’দেশের শুধু জমির মালিকানার পরির্বতন করেনি; দেশ দুটির মানচিত্রেরও বদল ঘটিয়েছে। কোনো দেশের মানচিত্র সে দেশের নাগরিকদের আবেগের বড় জায়গা। শুধু ছিটমহল বিনিময় নয়; বিনা অর্থে ১০ হাজার একরের বেশি ভূমি রাষ্ট্রের হস্তগত করা নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। ছিটমহল বিনিময় বিশ্বব্যাপী প্রধানমন্ত্রীর পরিচ্ছন্ন ইমেজকে আরও উজ্জ্বলতর করেছে। সেই ছিটমহলে প্রথমবারের মতো পরির্দশনে আসছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। উভয় দেশের মধ্যে তিনি প্রথম কোনো সরকারপ্রধান, যিনি ৬৯ বছরে ইতিহাসে ছিটমহলে এলেন। সেদিক থেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর একটি ইতিহাস গড়লেন। ছিটমহলবাসীর কাছে তিনি মুক্তিদাতা। সঙ্গত কারণে ছিটমহলে তার আগমন আনন্দ ও গৌরবের।

আমরা যারা বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি করে মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলাম, তারা চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর সংগঠনটির অবলুপ্তি ঘোষণা করেছিলাম। তবে অবলুপ্ত ছিটমহলের নাগরিকদের অধিকার আদায়ে তাদের পাশে থাকার জন্য ওই সংগঠনের সবাইকে নিয়ে ‘নাগরিক অধিকার সমন্বয় কমিটি’ গঠন করেছিলাম। সুখবর হচ্ছে, এ প্রতিষ্ঠানটিকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম করতে হয়নি। পক্ষান্তরে কোচবিহার-দিনহাটায় নাগরিক অধিকার সমন্বয় কমিটিকে দাবি আদায়ের জন্য প্রায়শ মিছিল-মিটিং করতে হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা ছিটমহলে যে উন্নয়নযজ্ঞ শুরু করেছেন তা শুধু নজর কাড়াই নয়, বরং অনেকের জন্য ঈর্ষণীয়। অনেকেই ইতিমধ্যে দুই দেশের ছিটমহলে উন্নয়নগত পার্থক্য লক্ষ্য করছেন। ছিটমহল আজ আলোকিত। আগামী ডিসেম্বরেই ছিটমহলের সবার গৃহে আলো জ্বলবে। ছিটমহলের মানুষদের পাশে থাকা একজন কর্মী হিসেবে এসব দেখে স্বস্তিবোধ করছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সে কারণে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আজ কোনো দাবি বা উন্নয়ন প্রস্তাব সুপারিশ করছি না। তবে ছিটমহলে সম্ভাব্য জটিলতা এড়াতে মোটা দাগে তিনটি প্রস্তাব করছি_

ক. অবলুপ্ত ছিটমহলবাসীর বর্তমানের মূল সমস্যা জমির মালিকানা সংক্রান্ত। অতীতের রেকর্ডভুক্ত কাগজ ভারতীয় রাষ্ট্রের কাছে আছে, তা বাংলাদেশের হস্তগত করা এবং সেসব নথিপত্র সংশ্লিষ্ট মালিকদের সরবরাহ করা ও ভূমি জরিপ করা। খ. পশ্চাৎপদ নাগরিক বিবেচনায় কর্মসৃজন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে তাদের জন্য কোটা প্রবর্তন এবং দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার কর্মসূচি নেওয়া। গ. মুক্তির জন্য মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি বাস্তবায়নে নানা সংগ্রাম করেছেন ছিটমহলবাসী। যে লড়াই চুক্তি বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কূটনৈতিক অভিযানকে ত্বরান্বিত করেছে; এ সবকিছুকে নিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি ‘ছিটমহল জাদুঘর’ নির্মাণ করার অনুরোধ করি। যেখানে প্রজন্ম শুধু চুক্তির কপিই পাবে না, পাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ দু’দেশের ছিটমহল নিয়ে সব কর্মের ইতিহাস।

এখন কার্তিক মাস। আশ্বিন-কার্তিক মানেই অভাব আর মন্বন্তর ছিল নিত্য দৃশ্য। কুড়িগ্রাম আজ মঙ্গামুক্ত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দারিদ্র্যবিরোধী সংগ্রাম কুড়িগ্রামকে মঙ্গার কলঙ্ক থেকে মুক্তি দিয়েছে। আজ কুড়িগ্রামে ঘোর কার্তিকে ভাতের অভাব নেই। একদা মানুষ অভাবে বলত ‘কী খাই’। আজ বলে ‘কী দিয়ে খাই’। তারপর এখনও কুড়িগ্রাম জেলা দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে পিছিয়ে আছে। এখানে দারিদ্র্যের হার ৬৩ ভাগ, যা অন্য জেলাগুলোর চেয়ে সর্বোচ্চ। আমরা মঙ্গামুক্ত হয়েছি, কিন্তু দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারিনি। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে গেলে কুড়িগ্রামকে সবার আগে দারিদ্র্যমুক্ত করতেই হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি_ তিনি দূরদর্শী এবং স্বপ্ন দেখানো সাহসী মানুষ। তিনি যদি কুড়িগ্রামের জন্য কিছু কর্মসূচি গ্রহণ করেন তা হবে সমগ্র উত্তরাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নে সহায়ক। বাড়ির পাশের সব জেলাতে একাধিক আন্তঃনগর ট্রেন, কুড়িগ্রামে একটিও নেই_ বিষয়টি ভাবতে হবে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য কুড়িগ্রাম গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। কুড়িগ্রামের একটি থানা বাদে সব থানাই ভারতীয় সীমান্তবেষ্টিত। ভারতের তিনটি রাজ্য এ জেলার সীমান্ত, যা অন্য কোনো জেলার নেই। এখানে ভারত প্রতিবেশী; চীন, ভুটান ও নেপাল আমাদের পাশের গ্রাম। এখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে। সোনাহাট, মোগলহাট এবং রৌমারী স্থলবন্দরের উন্নয়ন প্রয়োজন। দেশ বিভাগের পর লালমনিরহাট-ভূরুঙ্গামারী রেলপথ বন্ধ। সেটিসহ সোনাহাট স্থলবন্দরকে ধরে কুড়িগ্রাম-নাগেশ্বরী-সোনাহাট রেলপথ তৈরি করা। বন্ধ হয়ে থাকা মোগলহাট স্থলবন্দরটিকে নবনির্মিত কুলাঘাট ব্রিজের যাতায়াত সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করে কোচবিহারের দিনহাটা-রংপুর সড়কটি চালু করা। এতে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট থেকে কোচবিহারের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার কমে আসবে। ভুটানে যোগাযোগ অন্য যে কোনো রুটের চেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী হবে। লালমনিরহাট বিমানবন্দরটি চালু করা। সোনাহাট ব্রিজ ও স্থলবন্দর রাস্তা যেমন কুড়িগ্রাম পর্যন্ত করা জরুরি, তেমনি করা দরকার ব্রহ্মপুত্র ব্রিজ। দাঁতভাঙ্গা থেকে মোল্লারহাট পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের সরু চ্যানেলে একটি ব্রিজ হলে ঢাকা-কুড়িগ্রাম শুধু দূরত্বই কমবে না; আসামের সঙ্গে সড়কপথে যোগাযোগ সহজ হবে। একদা মঙ্গা-মন্বন্তরের কুড়িগ্রামে ‘ইন্টারন্যাশনাল পভার্টি এলিভিয়েশন ইউনিভার্সিটি অব কুড়িগ্রাম’ নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে মঙ্গা-বিমুক্তি ও উন্নয়ন শিক্ষা প্রদান করা হবে। আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকাসহ পৃথিবীর নানা দেশ থেকে ছাত্ররা মঙ্গা-বিমুক্তি ও উন্নয়ন বিষয়ে পড়তে আসবে। তারা জানতে পারবে বাংলাদেশের দারিদ্র্যমুক্তির কৌশল।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী; সাবেক রাকসু নেতা, অবলুপ্ত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির উপদেষ্টা