বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ার ছড়ায় সাড়ে ৩৩ কোটি টাকার প্রকল্প

দীর্ঘকাল আত্মপরিচয়বিহীন কুড়িগ্রামের দাসিয়ার ছড়াসহ ১২টি বিলুপ্ত ছিটমহলের উন্নয়নের জন্য সরকার প্রায় সাড়ে ৩৩ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

সদ্যবিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ার ছড়া বাসিন্দাদের জন্য বিদ্যুৎসহ সবরকমের নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিভিন্ন কর্মসূচির উদ্বোধনের পাশাপাশি সূধী সমাবেশ উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীকাল দাসিয়ার ছড়া সফরে আসছেন।

১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান দেশ বিভাগের সময় সৃষ্ট এই সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহলে এটাই দেশের কোন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম আগমন। যার হাত ধরে ৬৮ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ছিটমহলবাসী দেশ পেয়েছে, সেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমনকে কেন্দ্র করে সমগ্র দাসিয়ার ছড়াতেই উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মামুন-অর-রশিদ সাংবাদিকদের জানান, ২০টি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে কুড়িগ্রামের অধুনালুপ্ত ১২টি ছিটমহলের উন্নয়নে সরকার ৩৩ কোটি ৬০ লাখ ৪৭ হাজার টাকার উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ‘১৯৭৪ সালে সম্পাদিত মুজিব-ইন্দিরা চুক্তির আলোকে শেখ হাসিনার হাত ধরেই ৬৮ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ছিটমহলবাসী আত্মপরিচয় খুঁজে পেয়েছে।’

নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দিয়ে এ বছর ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় সম্পন্ন হয়। আর এর মাধ্যমেই এই অঞ্চলের মানুষের প্রায় সাত দশক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়।

ছিটমহল বিলুপ্তির দিন থেকেই ছিটমহলবাসীর মাঝে মুক্তির যে আনন্দ-উচ্ছাস সৃষ্টি হয় তাতে বাড়তি প্রেরণা যোগাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর এই দাসিয়ার ছড়া আগমন।

দাসিয়ার ছড়ার সর্বত্রই পরিবর্তনের ছোয়া স্পষ্ট। নতুন সড়ক নির্মাণ চলছে। তোরণ আর ব্যানারে ছেয়ে গেছে সমগ্র এলাকা। স্থানীয় কালিঘাট বাজারে দাশিয়ার ছড়া বাংলাদেশ-ভারত সমন্বয় কমিটির এক সাবেক নেতা আশরাফুল আলম বাসসকে জানান, ‘কোন রাস্ট্রীয় কাঠামো না থাকায় তারা কোন রাষ্ট্রীয় আইন-শৃংখলা বা বিধিবিধানের অধীন ছিলেন না।এখানে এখনো মধ্যযুগীয় গ্রাম পঞ্চায়েতের শাসন।’

তিনি বলেন, সমগ্র দাশিয়ার ছড়ায় কোন বিদ্যালয়,কোন পাকা সড়ক এমনকি কোন প্রকার বিদ্যায়নই এতদিন ছিল না। এখন রাস্তা-ঘাট হবে,স্কুল-কলেজ হবে,চাকরী-বাকরী,ব্যবসা-বাণিজ্যেও সুযোগ সৃষ্টি হবে। এই দাসিয়ারছড়ার কালিরহাট বাজারেই বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুধী সমাবেশে যোগ দেবেন বলে সাংবাদিকদের বলেন তাঁর উপ-প্রেস সচিব মামুন-অর-রশিদ।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী দাসিয়ারছড়ার ৬৪৩টি পরিবারে বিদ্যুৎ সংযোগ উদ্বোধন করবেন। উল্লেখ্য, বিদ্যুতের মতোই অন্যান্য সেবার কোন সুবিধাই ছিটমহলবাসীর ছিল না । ছিল না কোনও স্কুল কিংবা হাসপাতাল। ভূমি বিনিময়েরও কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিলা না। ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বিনিময় হওয়া মোট ১৬২টি ছিটমহলের মধ্যে ৩৭ হাজার বাসিন্দাসহ ভারতের এরকম ১১১টি ছিটমহল পেয়েছে বাংলাদেশ। একইভাবে ১৪ হাজার বাসিন্দাসহ ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ৫১ টি ছিটমহল পেয়েছে ভারত। যাতে প্রায় ১০ একর ভ’মি বেশি পেয়েছে বাংলাদেশ।

ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশের পাওয়া ছিটমহলগুলোর মধ্যে কুড়িগ্রামে রয়েছে ১২টি। এ ছিটমহল মহলগুলোর মোট বাসিন্দা ৮১৩২ জন। এরমধ্যে দাসিয়ারছড়াতেই বাস করেন ৬৬০৮ জন।

মামুন-অর-রশিদ বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে- স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ নতুন একটি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মান, ইউনিয়ন তথ্য কেন্দ্র নির্মাণ, ৫২ কিলোমিটার বিদ্যুৎ সরবরাহ ও বিতরণ লাইন নির্মাণ, তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ, একটি পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র নির্মাণ।

বয়স্ক ভাতা, দুস্থ ভাতা, টিআর, কাবিখাসহ সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও বিলুপ্ত ছিটমহল এলাকায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প বাস্তবায়ন, কম্পিউটার শিক্ষা, সমিতি গঠন করানো এবং কৃষি বিষয়ক সাতটি প্রকল্পও হাতে নেয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। বাসস।