নতুন বাজার বাড়ছে পোশাকের

গত বছর দেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়ে নেতিবাচক প্রচারণা থাকলেও নতুন বাজারে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয় বাড়ছে। এমনকি প্রচলিত বাজারগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপ্রচলিত বাজারের রপ্তানি আয়। ফলে গত তিন বছরের এসব বাজার থেকে আয় বেড়েছে ৩৯৭ কোটি ৫৬ লাখ ডলারের বেশি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছর নতুন বা অপ্রচলিত বাজারে যেখানে রপ্তানি আয় হয়েছিল দুই হাজার ১৫১ কোটি ৫৭ লাখ ৩০ হাজার ডলারের, সেখানে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছে দুই হাজার ৫৪৯ কোটি ১৪ লাখ ডলারের। নতুন বাজারে রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধিকে দেশের পোশাকশিল্পের জন্য খুবই ইতিবাচক বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের শীর্ষ কয়েকটি বাজারের মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশ। বছরে যে ২৪ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হচ্ছে তার প্রায় ৬০ শতাংশই আয় হয়েছে এসব বাজার থেকে। কিন্তু এসব বাজারে প্রতিযোগী অন্য দেশের প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় তৈরি পোশাকের নতুন বাজার সৃষ্টিতে জোর দেওয়া হয়। নতুন বাজারের প্রতি রপ্তানিকারকদের আকৃষ্ট করতে সরকার রপ্তানির ওপর তিন শতাংশ প্রণোদনারও ব্যবস্থা করেছে। নতুন বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধি সম্পর্কে তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি মো. আতিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রানা প্লাজার পর দেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বড় আকারের ধাক্কা এসেছিল। এ কারণে প্রধান বাজারগুলোতে পোশাক রপ্তানি কমেছিল। কিন্তু আমাদের নতুন বাজারগুলোর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই খারাপ পরিস্থিতিতেও নতুন বাজারগুলোতে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় বেড়েছে। এটা আমাদের জন্য একটি ভালো খবর। তবে এসব বাজারে চাহিদা আরো ব্যাপক রয়েছে। আমরা যদি সুযোগ কাজে লাগাতে পারি তাহলে আগামী দুই বছরের মধ্যেই নতুন বাজারে রপ্তানি আয় আরো বাড়াতে সক্ষম হব।’

ইপিবি সূত্রে জানা গেছে, ১৫টির অধিক এই নতুন বাজারে গড়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ২০ শতাংশের ওপরে। যেখানে প্রচলিত বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি মাত্র দুই শতাংশেরও নিচে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের নতুন বাজারগুলোর মধ্যে গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় চীনে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪২.৮১ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ২০.৮ শতাংশ। এ ছাড়া ভারতে ১২.৬৭ শতাংশ, জাপানে ১০.৪৩ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৮.৯৫ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ৮.২১ শতাংশ, ব্রাজিলে ৬.৫৯ শতাংশ এবং মেক্সিকোতে ৩.৯৬ শতাংশ। তবে রাশিয়া, তুরস্ক এবং আর্জেন্টিনায় রপ্তানি আয় কমেছে। এদিকে নতুন বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান বাজার জাপান ওভেন পোশাকের পাশাপাশি নিটওয়্যারেও শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। গত এপ্রিলে জাপান সরকার বাংলাদেশকে এ সুবিধা দেয়। ঢাকার জাপান দূতাবাস থেকে ইপিবিকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘এ বছরের ১ এপ্রিল থেকে জাপানে নিট পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে জিএসপি রুলস অব অরিজিন শিথিলপূর্বক দুই স্তরের পরিবর্তে এক স্তর করা হয়েছে। এখন থেকে আমদানিকৃত কাপড় দিয়ে নিট পোশাক তৈরির পর রপ্তানি করা হলেও জাপানে জিএসপি সুবিধা পাওয়া যাবে।’ আগে এ সুবিধা ছিল দুই স্তর, অর্থাৎ সুতা আমদানির পর কাপড় তৈরি এবং সেই কাপড় থেকে প্রস্তুতকৃত পোশাক রপ্তানিতে জিএসপি সুবিধা ছিল। এ ছাড়া ২০১১ সাল থেকে জাপানে ওভেন পোশাকও জিএসপি সুবিধা পেয়ে আসছে। এখন নিটওয়্যারের ক্ষেত্রে এ সুবিধা শতভাগ দেওয়ায় জাপানের বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি ব্যাপক বাড়বে বলে জানান উদ্যোক্তারা।

নতুন বাজারের মধ্যে এশিয়ার দেশ জাপানকেই বেশি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখছেন উদ্যোক্তারা। কেননা বিশ্ববাজারে জাপান দ্বিতীয় পোশাক আমদানিকারক দেশ। প্রতিবছর দেশটি ৩০ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করে থাকে। এর অর্ধেকও যদি বাংলাদেশ দখল করতে পারে তাহলে ২৪ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে নেওয়া সম্ভব হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) প্রথম সহসভাপতি আসলাম সানী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন বাজারগুলোকে আমরা তৈরি পোশাকের জন্য খুবই সম্ভাবনার দুয়ার হিসেবে দেখছি। নতুন বাজারের মধ্যে চীন, জাপান, রাশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার দিকে আমরা বেশি নজর দিচ্ছি। এসব বাজারে আমাদের প্রাধান্য বাড়লে ২০২১ সালের আগেই আমরা ৫০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াতে পারব।’

– See more at: http://www.kalerkantho.com/print-edition/industry-business/2015/10/14/278765#sthash.i1kgVCIf.dpuf