রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়ন

৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিএনপির সব পর্যায়ের কমিটি নবায়নের কথা থাকলেও তার কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। বিরোধী দল কিংবা বিরোধী শিবিরের রাজনীতি গণতান্ত্রিক ধারায় প্রবাহিত না হলে এবং সরকারি রাজনীতি সহিষ্ণুতা এবং সমন্বয়ের পথে না এগোলে গণতান্ত্রিক বাতাবরণ রচিত হবে না। আর গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিদ্যমান না থাকলে সামাজিক উন্নয়ন হয়তোবা ঝলক দেবে ক্ষণিকের তরে, কিন্তু স্থায়ী উন্নয়নের দেখা মিলবে না। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলে পৌঁছুতে আমাদের টেকসই উন্নয়ন দরকার।

বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, উন্নয়নের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে ওপরের দিকে উঠছে, তাতে সন্দেহ পোষণ করার সুযোগ মনে হয় কমই আছে। তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম প্রধান একটি দরিদ্র দেশ হিসেবে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’র অপবাদ মাথায় নিয়ে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল সত্তর দশকের গোড়ায়, তা এখন ঢ়ঢ়ঢ় (ঢ়ঁৎপযধংরহম ঢ়ড়বিৎ ঢ়ধৎরঃু) শর্তাধীন এউচ-এর বিচারে বিশ্বের বৃহত্তম ২৫টি উদীয়মান বাজারের তালিকায় আশ্চর্যজনক প্রতিযোগী (ঝঁৎঢ়ৎরংরহম বহঃৎধহঃ) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শত ডলারের মাথাপিছু আয় এখন সহস্র ডলার ছাড়িয়ে গেছে। আর এসব উন্নয়ন শুধু সূচকাবদ্ধই নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতাও বটে। ‘রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি’ দেখতে রসুলপুরে গেলে ‘বাড়ি তো নয় পাখির বাসা, ভেন্না পাতার ছানি’ দেখতে পাওয়া যাবে না। দেখতে পাওয়া যাবে না অনাহারের সাক্ষ্য দেয়া ‘পেটটি ভরে পায় না খেতে, বুকের ক’খান হাড়সর্বস্ব আসমানীদের। সত্যিই দারিদ্র্য, মঙ্গা, দুর্ভিক্ষ এখন ইতিহাসের পাতায় বন্দি। একসঙ্গে ১০০ জন ভিক্ষুক খাওয়ানোর মানত করলে তা পালন করতে কাউকে রীতিমতো বিপদে পড়তে হবে। তার মানে রাতারাতি দরিদ্র যে হাওয়া হয়ে গেছে তা বলছি না, তবে দারিদ্র্যের যে আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা, অর্থাৎ প্রতিদিন ১ ডলারের নিচে উপার্জনক্ষম মানুষ বাংলাদেশে নেই বললেই চলে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে চলে যাওয়া যায় পাকা পথ ধরে, মোটরচালিত রিকশা-ভ্যানে চড়ে। পালকির মতো গরু-মহিষের গাড়ি হয়তো এখন জাদুঘরে রাখার বন্দোবস্ত হচ্ছে। ক্ষুধা, দারিদ্র্য, মঙ্গার স্বরূপ সন্ধানে হয়তো গবেষণায় নামতে হবে।
তবে এই দৃশ্যমান টেকসই উন্নয়নের জন্য কাউকে এককভাবে কৃতিত্ব দেয়া যাবে না। বাংলাদেশের ষোল কোটি মানুষের শ্রমে ও ঘামে এই উন্নয়নের বিজয়গাঁথা রচিত হয়েছে। তবে অনুঘটক হিসেবে রাষ্ট্রের এবং সরকারের দিকনির্দেশনার একটা ব্যাপার তো থাকেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য এবং দৃঢ় ও গতিশীল নেতৃত্ব এই দ্রুত উন্নয়নশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণে প্রধান ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে কাজ করছে। বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে, একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন দায়িত্বশীল জাতি হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ ব্যক্তিক অবদানের তুল্যমূল্য বিচারের প্রশ্ন আসলে অবশ্যই সর্বাগ্রে এসে দাঁড়াবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম। তার হাত ধরেই আজ বাংলাদেশের জন্য অর্জিত হয়েছে কিছু বিরল আন্তর্জাতিক সম্মান। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণের স্বীকৃতি হিসেবে তাকে দেয়া হলো ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ পুরস্কার (নিউইয়র্ক, ২৮/৯/১৫)। প্রধানমন্ত্রীর এই সম্মাননা পাওয়ার মধ্যদিয়ে বিশ্ববাসীর জানার সুযোগ হলো যে, বাংলাদেশের জনগণ বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিগুলোর মোকাবেলায় কেবল নিজেরাই প্রস্তুত নয়, সুদূরপ্রসারী কর্মকৌশল গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকেও এই প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করতেও তৎপর। পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীকে জানান যে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই ৪০ লাখ বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ চালু করে বিশ্বের প্রথম ‘সোলার জাতি’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার গৌরব দাবি করতে পেরেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে ছাড়িয়ে গেছে এবং ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়েছে।
‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারপ্রাপ্তি উপলক্ষে শেখ হাসিনার সম্মানে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে মার্কিন কংগ্রেসে পরিবেশ, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি, জনস্বাস্থ্য এবং বাণিজ্যবিষয়ক কমিটির প্রভাবশালী কংগ্রেসম্যান ইডেট ডায়ান ক্লার্ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বের গর্ব’ আখ্যায়িত করে বাংলাদেশের মানুষকে তার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে তথ্যপ্রযুক্তিতে উন্নয়নের স্বীকৃতি হিসেবে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সংস্থা ‘আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার’ দেয়া হয়েছে। দেশের তথ্যপ্রযুক্তিপ্রেমী তরুণদের উদ্দেশ্যে এ পুরস্কার উৎসর্গ করে তিনি তথ্যপ্রযুক্তিবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টিতে একটি নতুন মোমেন্টাম দিলেন। প্রমাণ করলেন যে, তথ্যপ্রযুক্তি এখন আর আমাদের কাছে অধরা স্বপ্ন নয়, নির্জলা বাস্তবতা। এখন আমরাও ঘরে বসে একটি বোতাম চেপেই পৃথিবীকে হাতের মুঠোয় ভরতে পারি। রাষ্ট্রীয় সেবা লাভ করতে পারি একান্ত সুলভে। এছাড়াও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের (গউএ) অংশ হিসেবে শিশুমৃত্যুর হার কমানোয় সাফল্যের জন্য, ২০১০ সালে জাতিসংঘ শেখ হাসিনাকে পুরস্কারে ভূষিত করে। গৌরবময় এসব পুরস্কার বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বীকৃতির আন্তর্জাতিক সনদপত্র।
বস্তুত, একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বিধ্বস্ত অবকাঠামো ও পঙ্গু অর্থনীতি নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। তারপরও প্রায় ১৫ বছর সেনাশাসন আর স্বৈরাচারের জাঁতাকলে পিষ্ট বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিকাশ কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পায়নি। সেসব ব্যর্থতার বোঝা মাথায় নিয়েও বাংলাদেশ বর্তমানে যে উন্নয়ন সাধন করেছে এবং করে চলেছে, তা কোনোভাবেই খাটো করে দেখার নয়। ১৯৭২-৭৩-এর ৫ কোটি ডলারের রপ্তানি এখন ৩ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ২০২১ সালের মধ্যে শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকেই বাংলাদেশ আয় করতে চায় ৫ হাজার কোটি ডলার। এদিকে রেমিট্যান্স ১ হাজার ৬০০ কোটি এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ২ হাজার ৬০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে রেকর্ড স্থাপন করেছে। বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের এই ধারাবাহিক অগ্রগতি সবার নজর কেড়েছে। কাঙ্ক্ষিত বৈদেশিক সহায়তা ছাড়াই বাংলাদেশ স্বল্প সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, লিঙ্গ সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং শিশু মৃত্যুর হার কমানোর ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি সাধন করেছে। বিশেষ করে চরম দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অবদানের কারণে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে সারাবিশ্বে আজ উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাম। তারপরও আরো ভালো হতো, যদি এই উন্নয়নের মাত্রা আরো বেশি হতো। নিরেট বাস্তবতা হলো, দেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত অর্জন এখনো ঘটেনি। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের নিয়ামক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বাজার ও বিদ্যুতের মতো খাতে অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। এগুলোতে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। দারিদ্র্যবান্ধব না হলে এ দেশে কোনো প্রবৃদ্ধিই টেকসই হবে না। দারিদ্র্যবান্ধব অর্থনৈতিক পলিসি গ্রহণের মাধ্যমে শ্রমঘন শিল্প ও কৃষিতে বিশেষ মনোযোগ দরকার। আজ কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে ঠিকই, কিন্তু কৃষকের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় দিশাহারা প্রান্তিক কৃষক। শ্রমিকদের এখনো ন্যায্য বেতন-বোনাসের দাবিতে রাস্তায় নামতে হয়। পুলিশের লাঠি-গুঁতো খেতে হয়। দরিদ্র মানুষ বিশেষত দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের অবাধ সুযোগ সৃষ্টি করা ছাড়া সত্যিকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধন করা সম্ভব নয়। এছাড়া নতুন বিশ্বের চাহিদা মোতাবেক শিল্প উৎপাদন ও সেবা খাতে গুরুত্ব দিতে হবে। অর্থাৎ একটি সমন্বিত সুষম উন্নয়ন কাঠামো বিনির্মাণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ওগঋ) এক সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পলিসিগুলোর প্রশংসা করেছে এবং এর অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাকে বেগবান এবং স্থিতিস্থাপক (ৎড়নঁংঃ ধহফ ৎবংরষরবহঃ) বলে আখ্যায়িত করেছে। তবে পৌনঃপুনিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিশেষ করে ধ্বংসাত্মক হরতাল, ধর্মঘট প্রভৃতিকে উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে উল্লেখ করেছে। যদিও বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি বেশ কিছুকাল ধরে ৬%-এর বৃত্তের চারপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, তবে চলমান অর্থবছরে তা ৬.৪%-এ উন্নীত হতে পারে যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। লস এঞ্জেলস টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জনৈক বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা বলেছেন, কেবল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণেই বাংলাদেশকে ২ বিলিয়ন ডলারের খেসারত দিতে হতে পারে।
অতএব সব বিবেচনাতেই সবচেয়ে বড় কথা হলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশের বর্ধিষ্ণু অর্থনৈতিক উন্নয়নে গলার কাঁটা হয়ে আটকে আছে এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। বর্তমানে এক ধরনের স্থিতাবস্থা বিরাজ করলেও তাকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না। বিএনপি জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। যে উগ্র মূর্তিতে তারা আবির্ভূত হয়েছিল নিকট অতীতে, তার পুনরাবৃত্তি ঘটলে উন্নয়নের অভিযাত্রায় দ্বাদশ ঘটিকার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যাবে। এদিকে নির্বাচনমুখী গণতন্ত্রের ধারায় প্রত্যাবর্তনের কোনো উদ্যোগও তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।
৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বিএনপির সব পর্যায়ের কমিটি নবায়নের কথা থাকলেও তার কোনো চিহ্ন দেখা যায়নি। বিরোধী দল কিংবা বিরোধী শিবিরের রাজনীতি গণতান্ত্রিক ধারায় প্রবাহিত না হলে এবং সরকারি রাজনীতি সহিষ্ণুতা এবং সমন্বয়ের পথে না এগোলে গণতান্ত্রিক বাতাবরণ রচিত হবে না। আর গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিদ্যমান না থাকলে সামাজিক উন্নয়ন হয়তোবা ঝলক দেবে ক্ষণিকের তরে, কিন্তু স্থায়ী উন্নয়নের দেখা মিলবে না। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলে পৌঁছুতে আমাদের টেকসই উন্নয়ন দরকার।

ড. রাশিদ আসকারী: কথাসাহিত্যিক, রাজনীতি বিশ্লেষক ও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক