পাটের দাম বাড়ছে

শরীয়তপুরের মুননা ইউনিয়নের লাউখোলা গ্রামের এক কৃষক ৫৬ শতাংশ জমিতে পাটের আবাদ করেছিলেন। সেখান থেকে তিনি পেয়েছেন প্রায় ১২ মণ পাট। মৌসুমের শুরুতে তিনি পাঁচ মণ পাট এক হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন। এখন সেই পাটের দাম উঠেছে এক হাজার ৮০০ টাকায়। কিছুদিন পর সবজি চাষের টাকা জোগাড় করতে বাকি পাট বিক্রি করবেন তিনি।

আবুল মোল্লা বলেন, ‘দাম যা-ই হোক, পাট নিয়ে বাজারে গেলে ব্যাপারীরা কদর করে। গত বছর পাট নিয়ে বাজারে বলতে হতো, ভাই আমার পাটগুলা একটু দেখেন। এবার আদর করে ডেকে বলে, ভাই এদিকে আসেন।’

পাটচাষিদের ওই কদরের কারণ এ বছর পাটের ফলন কম হয়েছে। অতি বৃষ্টিতে পাটের ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। তাঁরা বলছেন, যে জমিতে গত বছর ছয় মণ পাট হয়েছিল, এবার সেখানে চার মণ হয়েছে। কোরবানির ঈদের আগেও পাটের মণপ্রতি দর ছিল এক হাজার ৬০০ থেকে এক হাজার ৭৮০ টাকা। এখন সেটা এক হাজার ৭০০ থেকে এক হাজার ৯৫০ টাকায় উঠেছে।

পাটের দাম বাড়ছে

এই বাড়তি দামের সুফল পাচ্ছেন কিছু সচ্ছল কৃষক ও ফড়িয়া। যেসব কৃষক মৌসুমের শুরুতে পাট বিক্রি করে দেননি তাঁরা এখন ভালো দামে বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন। তবে বেশির ভাগ কৃষকই বড় অংশের পাট বাজারে বিক্রি করে দিয়েছেন। তাঁদের পাট কিনে যারা মজুদ করেছিল তারা লাভবান হচ্ছে। পাটকলগুলো এখন বিপাকে আছে। কারণ তাদের বেশি দাম দিয়ে পাট কিনতে হচ্ছে।

বিশ্বের মোট পাটের ৯০ শতাংশ উৎপাদিত হয় বাংলাদেশ ও ভারতে। দুই দেশই নিজের ব্যবহারের পাশাপাশি চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাট, পাট সুতা ও পাটের তৈরি বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে। ভারতেও পাটের দামের একই অবস্থা। পশ্চিমবঙ্গে পাটের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় মজুদদারি ঠেকাতে কমিটি গঠন করেছেন জুট কমিশনার। এদিকে বাংলাদেশেও এক হাজার মণের বেশি পাট মজুদ রাখা নিষিদ্ধ করেছে সরকার।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব অনুযায়ী ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ৭৫ লাখ বেল (এক বেলের ওজন ১৮২ কেজি) পাট উৎপাদিত হয়েছে। যা আগের বছরের চেয়ে ৬৫ হাজার বেল বেশি। তবে মাস দুয়েক আগে শেষ হওয়া মৌসুমে কত পাট হয়েছে তার হিসাব চূড়ান্ত হয়নি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গেল মৌসুমে ৭.২৬ লাখ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। যা আগের বছরের চেয়ে বেশি। তবে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার পাটের ফলন কম হয়েছে।

ফরিদপুর অঞ্চলের পাট ব্যবসায়ী হারুনুর রশিদ কালের কণ্ঠকে জানান, কোরবানির ঈদের পরে প্রতি মণ পাটের দাম ১০০ টাকার বেশি বেড়েছে। অবশ্য এখন আর সাধারণ কৃষকদের কাছে খুব বেশি পাট নেই। যাঁদের কাছে আছে তাঁরা বাড়তি দর পাচ্ছেন। তিনি বলেন, মোটা দাগে এবার পাটের ফলন ৪০ শতাংশ কম হয়েছে। ২০ শতাংশ জমিতে গত বছর ছয় মণ পাট পাওয়া গেলেও এবার পাওয়া গেছে চার মণ। ফলে গত বছরের তুলনায় এবার অনেকটা আগেই পাটের বাজার চড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। ফরিদপুরের বড় পাটচাষি ও ব্যবসায়ী বিপুল ঘোষ মনে করেন, শ্রমের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় পাটের উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। তাই বর্তমান দামেও কৃষকের খুব বেশি লাভ হচ্ছে না। পাটের দাম আরো বেশি হওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।

ফরিদপুরের কৈজুরি ইউনিয়নের সাচিয়া গ্রামের কৃষক হায়দার শেখ জানান, তাঁর এক একর জমিতে ৩০ মণ পাট হয়েছে। এখন পর্যন্ত তা বিক্রি করেননি তিনি। পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন খরচ জোগাচ্ছেন তিনি। চৈত্র মাসে পাট বিক্রি করবেন। তিনি বলেন, গত বছর এক হাজার টাকা মণ দরে পেঁয়াজ বিক্রি করেছিলেন তিনি। এবার তা দুই হাজারের ওপরে বিক্রি করতে পারছেন। ভালো দাম পাওয়ায় পাট বিক্রির কোনো তাগিদ নেই। এদিকে পাটের দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে মিল মালিকরা। তারা বলছে, এত বেশি দর দিয়ে পাট কিনে সুতা বা অন্যান্য জিনিস তৈরি করলে তা রপ্তানি করা কঠিন হবে। বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশন গত সোমবার এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, বর্তমানে পাটের ভরা মৌসুমে বাজারে কাঁচা পাটের সরবরাহ কমে গেছে। ফলে দাম বাড়ছে। মণপ্রতি ভালো মানের কাঁচা পাট বর্তমানে দুই হাজার থেকে দুই হাজার ১০০ টাকা এবং নিম্নমানের পাট এক হাজার ৬৫০ থেকে এক হাজার ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। সংগঠনটি বাংলা তোষা রিজেকশন (বিটিআর) ও বাংলা হোয়াইট রিজেকশন (বিডাব্লিউআর) নামের দুই গ্রেডের পাট রপ্তানি বন্ধ রাখার দাবি জানিয়েছে।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট কাঁচা পাট রপ্তানি হয় ৯.২৪ লাখ বেল। এর মধ্যে বিডাব্লিউআর গ্রেডের কাঁচা পাট রপ্তানি হয় চার হাজার ৩২৩ বেল এবং বিটিআর গ্রেডের কাঁচা পাট রপ্তানির পরিমাণ ২.৬০ লাখ বেল। দুই গ্রেড মিলিয়ে মোট ২.৬৪ লাখ বেল পাট রপ্তানি হয়, যা মোট রপ্তানির পরিমাণের ২৮.৬৬ শতাংশ। এই দুই গ্রেডের পাটের নামে ভালো পাটও ভারত ও পাকিস্তানে রপ্তানি হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করে বিজেএসএ।