বৃটেনের সেরা ব্যাকার হতে যাচ্ছেন বৃটিশ-বাংলাদেশী নাদিয়া

বৃটেনের সেরা ব্যাকার হতে যাচ্ছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত নাদিয়া হোসেন। বিবিসি-১ এর ‘গ্রেট বৃটিশ বেক অব’ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি ইতিমধ্যে সেমিফাইনালে পৌঁছেছেন। সেমিফাইনাল পর্যন্ত প্রচারিত ছয়টি পর্বের এ প্রতিযোগিতা টেলিভিশনে দেখেছে কয়েক মিলিয়ন মানুষ। প্রতিটি পর্বে গড়ে ৯.৫ মিলিয়ন দর্শক টেলিভিশনের পর্দায় উপভোগ করেছে নাদিয়ার নৈপুণ্য। শুধু সেমিফাইনাল দেখেছে ১০.২ মিলিয়ন দর্শক। আশা করা হচ্ছে ফাইনালে দর্শক হবে ১৫ মিলিয়ন।
আজ (মঙ্গলবার) ফাইনাল পর্বে চূড়ান্ত জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী নাদিয়া। জরিপে এ পর্যন্ত অপর দুই সেমিফাইনালিস্ট থেকে ৬৭ শতাংশ এগিয়ে রয়েছেন তিনি। নাদিয়াকে নিয়ে ব্যস্ত বৃটিশ মিডিয়া। সবাই বেশ ফলাও করে প্রকাশ করছে তার সাফল্য গাথা। বৃটিশ একাডেমি ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডস বিজয় ‘বৃটিশ টেলিভিশন ব্যাকিং প্রতিযোগিতা’-২০১০ সাল থেকে বিবিসি প্রচার করে আসছে।
বৃটেনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা নাদিয়ার আদি নিবাস সিলেটের বিয়ানবাজারে। বৃটেনের লুটন শহরের চালনি গার্লস হাইস্কুলে অধ্যয়নকালে নাদিয়া কেক ও নানা ধরনের পিঠা পুলি বানাতেন। স্কুলের শিক্ষক মার্শাল নাদিয়াকে তার বাড়িতে ঐতিহ্যবাহী বৃটিশ কেক, প্যাস্ট্রি ও পুডিং তৈরির উৎসাহ দেন। শিক্ষকের উৎসাহে নাদিয়া বাড়িতে এসব তৈরি শুরু করলে তার পরিবারের সবাই খুশি হয়। ধীরে ধীরে এলকায় পরিচিতি পেতে থাকেন তিনি। এক সময় বিবিসি’তে প্রচারিত ‘গ্রেট বৃটিশ বেক অব’ অনুষ্ঠানে নাম লেখান তিনি। অসাধারণ কেক প্রস্তুত করে সুনাম অর্জনকারী নাদিয়া ইতিমধ্যেই বৃটিশ মুসলিম তরুণীদের রোল মডেলে পরিণত হয়েছেন। তার নিমকি, চকলেট আর উদ্ভাবনশীল চিজ কেক তৈরির দৃশ্য যখন টিভিতে সম্প্রচার হয়েছে তখন তা তাদের কাছে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। লুটনে ব্যাপক জনপ্রিয় এই লিল্পীর নাম আজ বৃটেনের সবার মুখে।
তিন সন্তানের জননী নাদিয়া দারুণ সদালাপী। হিজাব পরেন তিনি। হিজাব পরা একজন তরুণীকে কেক তৈরির অনুষ্ঠানে দেখে অনেকে বৃটিশই বিস্মিত হয়েছেন। নাদিয়ার স্বামী আবদাল একজন কারিগরি ব্যবস্থাপক। সন্তানদের নিয়ে তারা লিডসে বাস করেন। নাদিয়া বেশির ভাগ সময় লুটনে থাকেন। তার সন্তানদের বয়স ৯ বছর, ৮ বছর ও চার বছর। সম্প্রতি তিনি এই সিরিজের প্রতিযোগিতায় যখন বিজয়ী হন তখন তার এক ছেলে হাসপাতালে। ছেলেকে হাসপাতালে রেখে তিনি অংশ নেন ওই প্রোগ্রামে। মনকে বেঁধেছেন শক্ত করে। সত্যি সত্যি সেই প্রতিযোগিতায় তিনি জিতে গেলেন। বিজয়ের জন্য তিনি যতটুকু খুশি তার চেয়ে বড় বেশি খুশি ছেলেকে হাসপাতালের বেডে ওই প্রতিযোগিতা দেখতে দেয়ার ব্যবস্থা করে দেয়ায়। এজন্য তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
লুটন শহরের বাসিন্দা নাদিয়ার কলেজ জীবনের বান্ধবী শেফা বেগম চৌধুরী বলেন, সে খুব ভাল মেয়ে। সব সময় তার মুখে হাসি লেগে থাকে। তার হাতে যাদু আছে, অনেক ক্রিয়েটিভিটি আছে তার মধ্যে। স্কুল জীবন থেকেই সে কেক বানাতো বলে তার মুখ থেকে শুনেছি। সে এ প্রতিযোগিতায় সেমিফাইনালিস্ট হওয়াতে আমি দারুণ হয়েছি। আমার বিশ্বাস সে ফাইনালিস্ট হয়ে বাংলাদেশীদের মুখ উজ্জ্বল করবে।
নাদিয়া প্রতিবেশী ৩৯ বছর বয়সী প্রতিবেশী দিপালী টেলিগ্রাফকে বলেন, প্যাটেল ‘স্কুলে যাওয়ার বয়স থেকেই সে কেক তৈরি করতো এবং তার বানানো ‘গাজর কেক’ দারুণ সুস্বাদু। সে খুব ভাল মেয়ে। আমরা তাকে নিয়ে গর্বিত। ছোট্ট শহরটির মেয়েটি ভাল করছে বলে গর্ব হচ্ছে।
২০০৩ সালে নাদিয়া লুটন সিক্সথ ফর্ম কলেজ থেকে ইংরেজি, মনোবিজ্ঞান এবং ধর্মীয় শিক্ষায় এ লেভেল অর্জন করেন। নাদিয়ার কলেজ শিক্ষক শিক্ষক পল ক্রস্টন বলেন, ‘সে তেমন একটা বদলায়নি। আমি স্মরণ করতে পারি যে, সে ভীষণরকম ভদ্র, বন্ধু বৎসল এবং অমায়িক। খাওয়ার জন্য যে ধরনের লোকের ওপর নির্ভর করা যায়ম নাদিয়া তাদেরই একজন। নাদিয়ার কান্না, তার প্রাণ খোলা হাসি, তার কৌতুক, তার একাগ্রচিত্ততা এই প্রতিযোগিতার দশর্কদের দারুণভাবে মুগ্ধ করেছে।
ফাইনালিস্ট হওয়ার জন্য সবার দোয়া কামনা করে নাদিয়া মানবজমিনকে বলেন, আমি বৃটিশ-বাংলাদেশী হিসেবে গর্ববোধ করি। সবার ভালবাসায় আমি যেন ফাইনালিস্ট হয়ে বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি করতে পারি শুধু সে দোয়াটুকু করবেন। নাদিয়া বলেন, আমি প্রথাগত কোন বৃটিশ না হলেও এর মানে এই নয় যে, পতাকা, কেক বা চায়ে আমি নেই। আমি অন্য বৃটিশদের মতোই এবং আশা করি আমি সেটা প্রমাণ করতে পেরেছি।