বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে

রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ সঠিক ফ্রেমেই চলছে। ২০২২ সালে প্রথম ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাবে। আর দ্বিতীয় ইউনিট থেকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে ২০২৩ সালে। বাংলাদেশ সঠিকভাবেই তার দায়িত্ব পালন করছে। প্রশিক্ষণে এদেশের প্রকৌশলীরাও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

এ জন্য চলতি বছরের মধ্যেই জেনারেল কনট্রাক্ট (উন্নয়ন চুক্তি) চুড়ান্ত করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন রূপপুর পরমাণ‍ু বিদ্যুৎ প্রকল্পের ইনচার্জ মাকসিম ভি এলভিশচেভ। শুক্রবার বাংলানিউজকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি এ মন্তব্য করেন।

পনের বছর ধরে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন মাকসিম। তার হাতেই পুর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছে অনেকগুলো প্রকল্প। তার হাত ধরেই স্বপ্ন দেখছে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র।

মাকসিম বলেন, এখন সাধারণ চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই চুক্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে রাশিয়া ও বাংলাদেশের ভূমিকা নির্দিষ্ট করা হবে। কার বিনিয়োগের অংশ কত হবে, কোথা থেকে আসবে বিনিয়োগ, এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কি হবে ইত্যাদি বিষয় এতে থাকবে।

মাকসিম বলেন, বাংলাদেশে এ ধরনের একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার সুযোগ পেয়ে আমরা গর্বিত। রাশিয়াকে সুযোগ দেওয়ার জন্য আমরা বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাই। বাংলাদেশের সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ রয়েছে।

তিনি বলেন, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণকে ব্যবসা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। রাশিয়া একে সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছে। কারণ জীবনের জন্য অপরিহার্য হচ্ছে জ্বালানি। রূপপুরে সেই জ্বালানি কম দামে উৎপাদিত হবে।

মাকসিম বলেন, প্রাক-সমীক্ষা ও পরিবেশের উপর প্রভাব সার্ভের কাজ যথা সময়ে শেষ হয়েছে। এতে কোন প্রকার নেগেটিভ দিক পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত সবকিছু ঠিক ঠাক রয়েছে।

দ্বিতীয় ধাপে চুক্তি করা হয়েছিলো উন্নয়ন নকশা প্রণয়নের জন্য। সেই কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। বলা যায়, সব কাজ সঠিক ফ্রেমে রয়েছে। পরবর্তী কাজ সঠিক সময়ে করা গেলে প্রত্যাশিত সময়ের মধ্যেই উৎপাদনে যাওয়া যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন মাকসিম।

তিনি বলেন, রূপপুরে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর আগে আমরা আমাদের নিজেদের দেশে (রাশিয়া) একই মডেলের বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছি। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রিখটার স্কেলে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয়। এ ছাড়া এটি সংক্রিয়ভাবে ৭২ ঘণ্টা নিরাপদ থাকবে। যা পুরনো মডেলের বিদ্যুৎ ইউনিটগুলোতে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত ছিল।

মাকসিম বলেন, প্রাথমিকভাবে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের টার্গেট ছিল। এখ‍ানে যে দু’টি ইউনিট স্থাপন করা হবে এর একেকটির উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে এক হাজার একশ’ ৯৮ দশমিক ৮ মেগাওয়াট। সে হিসেবে রূপপুরের উৎপাদন ক্ষমতা হবে প্রায় ২ হাজার ৪শ’ মেগাওয়াট।

পনের বছরের মধ্যে বিনিয়োগ উঠে আসবে। আর এর লাইফ টাইম হবে ৬০ বছর। রাশিয়া একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপারেশন চালাবে। এরপর বাংলাদেশের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া হবে। এ জন্য বাংলাদেশের প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রস্তুত করা হচ্ছে। এতে বাংলাদেশি তরুণরা অনেক দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন।

বাংলাদেশ সম্পর্কে মাকসিম বলেন, পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র একটি জটিল বিষয় হলেও সরকার অত্যন্ত দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হয়েছে।

রাশিয়া তো অনেক দেশেই পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছে, সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ভূমিকা কিভাবে মূল্যায়ন করেন আপনি- ‌এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার চমৎকার অভিজ্ঞতা আমার। রাশিয়া সন্তুষ্ট।

রূপপুরে রেডিয়েশন হতে পারে এমন কথা কেউ কেউ প্রচার করছে। এ প্রসঙ্গে মাকসিম বলেন, তাদের উদ্বেগ অমূলক। এখানে রেডিয়েশন হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। আর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ফুকুসিমার বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে। নতুন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে সে সব সংকট এড়াতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।

রূপপুরে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা হবে না। কুলিং করার জন্য দৈনিক ৯ হাজার ঘনমিটার পানি প্রয়োজন পড়বে। যা পদ্মা নদী থেকে পাওয়া যাবে।

বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণে কত টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন পড়বে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এই বিষয়টি সাধারণ চুক্তির আগে নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের মানুষ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কেমন। জবাবে মাকসিম বলেন, খুবই সুন্দর একটি দেশ বাংলাদেশ। এ দেশের লোকজন অনেক পরিশ্রমী। অনেক ক্ষেত্রে ভালো কর্মদক্ষতা দেখেছি।

এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রে এক গ্রাম ইউরেনিয়াম থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তা উৎপাদন করতে তিন টন কয়লা প্রয়োজন হতো। সবচেয়ে কম খরচ পড়ে পারমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে। প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ দুই টাকার নিচে থাকে। কিন্তু তেল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতি ইউনিটে প্রায় ২০ টাকার মতো খরচ হয়।

রূপপুরে বছরে ৯ দশমিক ১ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। বর্তমান দরে (পাইকারি) বিদ্যুৎ বিক্রি হলে বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন টাকা মুনাফা হবে।

পরিকল্পনাধীন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি পাবনার ইশ্বরদী থানার রূপপুরে স্থাপন করা হবে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ২৬০ একর এবং আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৬১ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নেয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। শুরুতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা ধরা হয়েছিলো মাত্র ২শ’ মেগাওয়াট। ১৯৬৪ সালে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য জাহাজযোগে যন্ত্রপাতি আনার পথে জাহাজটির গতি পরিবর্তন করে পাকিস্তানের করাচি বন্দরে নেওয়া হয়।

১৯৬৯ সালে ২শ’ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি নির্মাণের লক্ষে একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কারণে তা পিছিয়ে যায়। স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধু সরকার উদ্যোগ নিলেও ’৭৫ পরবর্তী সময়ে আবারও এ উদ্যোগ ঝিমিয়ে পড়ে।

’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে আবারও উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৯৬ সালে প্রণীত জ্বালানি নীতিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। ১৯৯৭ সালের ১৬ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ’৯৯ সালে প্রকল্পের প্রাক-বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু করা হয়।

২০০০ সালে বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার পাওয়ার অ্যাকশন প্লান (বিএএনপিএপি) অনুমোদন দেয় সরকার। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের কারণে আবারও থমকে যায় এই প্রকল্পের কাজ। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এলে আবারও উদ্যোগী হয়। ২০০৯ সালের ১৩ মে স্বাক্ষর করা হয় সমঝোতা স্মারক। একই মাসের ২১ তারিখে ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষর হয় রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে।