পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময় পিরোজপুর

দক্ষিণাঞ্চলের জেলা শহর পিরোজপুর ভ্রমণের জন্য আকর্ষণীয় জায়গা। এই জেলার ভা-ারিয়ায় গেলে চোখে পড়ে কত না শ্যামল গাঁও, কত না বাঁকা পথ। কচা, বলেশ্বর, সন্ধ্যা- নদীগুলো বয়ে গেছে এই জেলার মধ্য দিয়ে। পিরোজপুরের পশ্চিমে বলেশ্বর, পূর্বে রয়েছে বিশাল কচা নদী। নৌকো নিয়ে দূর অজানা গাঁয়ে বেড়ানো যায় এই পিরোজপুরে এলে।
১৮৫৯ সালে স্থাপিত মহকুমা শহর। পিরোজপুর ১৯৮৪ সালে জেলা শহরের মর্যাদা পায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে পিরোজপুরকে মহকুমা করা হয়। পিরোজপুরের ইতিহাস বরিশালের সঙ্গেই সংযুক্ত। একদা এই এলাকা ছিল চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। বারো ভূঁইয়াদের আমলে এবং এর পরে পিরোজপুরের অধিকাংশ এলাকা ছিল নদীগর্ভে। সময়ের বিবর্তনে চর জেগেছে। নতুন নতুন বসতি গড়ে উঠেছে। আজকের শহর-এলাকার পশ্চিমাংশের ভূমি ছিল তখন বলেশ্বরের নদীগর্ভে। পিরোজপুর বঙ্গোপসাগরের উপকণ্ঠে নদীবিধৌত পলি দ্বারা গঠিত একটি দ্বীপ। কথিত আছে, এই অঞ্চলের ফিরোজ শাহ নামে এক শাসনকর্তার নামানুসারে এই জায়গার নাম হয় ‘ফিরোজপুর’। পরবর্তীতে পিরোজপুরে রূপান্তরিত হয়। মধুমতি, বলেশ্বর, কচা, সন্ধ্যা নদী বয়ে গেছে এই জেলার ওপর দিয়ে।
পিরোজপুর জেলা ৭টি উপজেলা নিয়ে গঠিত- পিরোজপুর সদর, ভা-ারিয়া, মঠবাড়িয়া, নাজিরপুর, স্বরূপকাঠি, কাউখালী আর জিয়ানগর। ইন্দুরকানির নাম পাল্টিয়ে করা হয়েছে ‘জিয়ানগর’। তাই এ নামটি নিয়ে আছে বিতর্ক। এই নামটি পাল্টিয়ে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত ছাত্রলীগ নেতা ওমর ফারুকের নামে ‘ফারুক নগর’ করার দাবি স্থানীয় বাসিন্দাদের। মঠবাড়িয়াতে রয়েছে সাপলেজা কুঠিবাড়ি। এ জেলার আয়তন ১,২৭৭.৩০ বর্গকিলোমিটার।
পিরোজপুর শহর থেকে দেড় মাইল উত্তর-পূর্বে রায়েরকাঠিতে বারোভূঁইয়াদের আমলে রাজা রুদ্রনারায়ণ রায় গড়ে তোলেন রাজবাড়ি। সেই রাজবাড়ি এখনও আছে। তবে অধিকাংশ দালানকোঠা ধ্বংস হয়ে গেছে। রায়েরকাঠিতে একদা নির্মিত হয়েছিল রাজভবন, নহবতখানা, অতিথিশালা, নাট্যশালা এবং অনেকগুলো মন্দির। এখানে দুশো বছর আগেও ছিল প্রায় দুশো অট্টালিকা। আজ এর অধিকাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। একদা রায়েরকাঠিতে বসত শিবমেলা। যাত্রা, নাটক, জারি, সারি গানের আসর বসত। ধর্মীয় অনুষ্ঠানও উদ্যাপিত হতো। এখানের নাট্যশালায় গত শতাব্দীর বিশেষ দশকের প্রথমদিকে শিশির কুমার ভাদুড়ি এসে নাটকে অভিনয় করেছিলেন।
সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের পুকুর ঘাট, প্রান্তর, মহিলা কলেজের অভ্যন্তরের মাঠ, ধ্বংসাবশেষ ভবন স্মরণ করিয়ে দেয় রাজাদের স্মৃতি। পাদ্রি বাড়ি নেই, তবে সেই স্মৃতি তো ভোলার নয়। ৫০-৬০ বছর পরে সেদিনের কিশোর যিনি আজ বৃদ্ধ তিনি তো খুঁজবেন মাখন লাল বোসের দ্বিতল বাড়ি, নকুল বিশ্বাসের দ্বিতল বাড়ি। দূর থেকে এই দুই বাড়ি এখনও দেখা যায়। বসন্ত পুল স্মরণ করিয়ে দেবে বসন্ত কুমার দাস গুপ্তের কথা। এই পুলের নিচে থেকে এঁকেবেঁকে খালটি বয়ে গেছে দামোদর খালের দিকে। দামোদর খালের উত্তরে রাজাদের সৃষ্টি রাজগঞ্জ হাট, যা এখন রাজারহাট। এই রাজারহাট ঘুরে দেখায় আছে আনন্দ। রামকৃষ্ণ মিশন, মন্দির, সোহরাওয়ার্দী কলেজ হয়ে অাঁকাবাঁকা পথ চলে গেছে নাজির পুরের দিকে। পিরোজপুরে আরও দর্শনীয় খান বাহাদুর সৈয়দ আফজালের বাড়ি, বলেশ্বর সেতু, পাড়েরহাট, চরখালি, ইন্দুরকানি, স্বরূপকাঠি। পাড়েরহাট হয়ে নদীপথে ভা-ারিয়া যাওয়ার পথে শুধুই চোখে পড়ে সবুজের ছোঁয়া। সবুজ-শ্যামলের এমন শোভা কি আর সহজে মেলে?