আমনের পরিবর্তে ডাল ও তেলজাতীয় ফসল আবাদ

সাম্প্রতিক বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের ২১ জেলার প্রায় ১২ লাখ হেক্টর জমি। কৃষকদের এ ক্ষতি পুরোপুরি কাটিয়ে তোলা সম্ভব না হলেও কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যেসব এলাকায় আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহে আমন ধান আবাদ করা সম্ভব নয়, সেখানে তেল ও ডালজাতীয় ফসল আবাদের পরামর্শ দিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)। কৃষকরাও নিজ উদ্যোগে আমনের পরিবর্তে বিকল্প ফসল আবাদে ঝুঁকছেন।

সূত্র জানায়, বন্যাকবলিত এলাকার কৃষক যদি আমন আবাদ করতে চান, তার ব্যবস্থা করবে ডিএই। এজন্য যেখানে বন্যা হয়নি, সেখানকার কৃষকদের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কৃষকদের যোগসূত্র স্থাপন করে দিচ্ছে ডিএই। সরকারিভাবে এসব এলাকায় বীজতলা তৈরি এবং তা বিতরণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে আশ্বিনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত কীভাবে আমন ধান রোপণ অব্যাহত রাখা যায়, সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। সব জেলা, উপজেলা ও ব্লক পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের এ সময়ের কাজগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

ডিএইর প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, দুই দফা বন্যায় ২১ জেলার ২ লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জুলাইয়ে টানা বর্ষণ ও ঘূর্ণিঝড় কোমেনের প্রভাবে সৃষ্ট বন্যায় ৩৯ হাজার ১০২ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়। আর চলতি মাসে দুই দফায় বন্যায় কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ১২ লাখ কৃষক। নষ্ট হয়ে গেছে তিন লাখ হেক্টরের বেশি জমির আউশ-আমন ফসল ও সবজি। দুই সপ্তাহ পানিতে ডুবে থাকার পর বন্যাকবলিত এলাকার ধানক্ষেত জেগে উঠতে শুরু করলেও ধানের বাড়ন্ত সবুজ শীষ হয়ে গেছে বিবর্ণ। কোথাও কোথাও তা কাদামাটির সঙ্গে লেপ্টে গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমন ও আউশ ফসলের বড় একটি অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এবার এ দুটো ধান উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ নাও হতে পারে। তাই যেসব এলাকায় বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে, সেসব এলাকায় এখনই কৃষি পুনর্বাসনকাজ শুরু করতে হবে। বীজ, সার ও আর্থিক সহায়তা নিয়ে সরকারকে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। এছাড়া বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে কৃষকদের নাজিরশাইল, বিনাশাইল, লতিশাইল, বিআর ২২ ও ২৩ এবং অন্যান্য স্থানীয় জাতের চারা দ্রুত রোপণ করতে হবে। বন্যার পানি কমলে শীতকালীন সবজি, তেল ও ডালজাতীয় ফসল চাষবাসের প্রস্তুতিও নিতে হবে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্বল্প সময়ে উত্পাদন হয়, এমন সবজি ও ফসল চাষ করে কিছুদিনের মধ্যে কৃষকরা আয় করতে পারবেন। বিশেষ করে পালংশাক, লালশাক, মুলাজাতীয় সবজি করতে পারেন। পানি সরে যাওয়ার পর পরই কাদামাটিতে বীজ বপন করতে হবে। এতে সার ও সেচ দেয়ার খরচ বেঁচে যাবে।

এ বিষয়ে ডিএইর মহাপরিচালক কৃষিবিদ হামিদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, যেসব এলাকায় বন্যা হয়েছে, সেসব এলাকার কৃষকরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য ১৪টি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়েছে। সরকারিভাবে বীজতলা তৈরি এবং তা বিতরণ করা হচ্ছে। যেখানে আমন ধান আবাদ সম্ভব নয়, সেখানে তেল ও ডালজাতীয় ফসল আবাদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

তবে আমনের জন্য প্রস্তুতি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এ বছর মোট ৩ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর আমন বীজতলা করা হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। ফলে আমন মৌসুমে ৫৮ লাখ হেক্টর জমিতে আমন আবাদের যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তা পূরণ করা সম্ভব হবে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স কো-অর্ডিনেশন সেন্টারের (এনডিআরসিসি) হিসাবে, বন্যার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উত্তরবঙ্গের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, দিনাজপুর ও বগুড়া জেলা; উত্তর-পূর্বের জেলা জামালপুর, নেত্রকোনা, শেরপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও মধ্যাঞ্চলে মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর।