লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অসামান্য সাফল্য

অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক খবর। উন্নয়ন-অগ্রগতির সড়কে বাংলাদেশ এখন একটি দৃষ্টান্তযোগ্য দেশ। বাংলাদেশের অব্যাহত উন্নতির চিত্র ফুটে উঠেছে ‘সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি): বাংলাদেশের অগ্রগতি প্রতিবেদন-২০১৫’-এ। এতে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাফল্যের সঙ্গেই এগিয়ে চলেছে দেশ। অত্যন্ত আনন্দের খবর যে, স্বল্প সময়ের মধ্যে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নির্মূলে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল। একই সঙ্গে অর্জনের আরো উজ্জ্বল খতিয়ান রয়েছে। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন, লিঙ্গ সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং শিশু মৃত্যু হার হ্রাসের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বে দৃষ্টান্তযোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিগত মহাজোট ও বর্তমান সরকারের কর্ম পরিকল্পনা এবং এর বাস্তবায়নের সফল রেখাচিত্র এও প্রমাণ করেছে, আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট সব কিছু নিয়ে। যদিও এখন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমরা কাক্সিক্ষত মাত্রা স্পর্শ করতে পারিনি এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বিদ্যমান রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ, তবুও নিঃসন্দেহেই এ কথা বলা যায় যে সার্বিকভাবে আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতির চিত্র অত্যন্ত উজ্জ্বল এবং তা আরো উজ্জ্বল করা সম্ভব। তবে এক্ষেত্রে কিছু ‘যদি’, ‘কিন্তু’র বিষয় আছে যেগুলো সম্পর্কে আশা করি রাষ্ট্র ও রাজনীতির নীতি নির্ধারকরা অত্যন্ত সচেতন। এমডিজি বাস্তবায়নের অগ্রগতি বিশ্লেষণ করে এবং সাম্প্রতিক প্রতিবেদনটি মূল্যায়নক্রমে এ কথাও বলা যায় যে, এত প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও আমরা লক্ষ্য অর্জনে এগোতে পারছি। অবশ্যই এক্ষেত্রে সরকার সাধুবাদ পাওয়ার দাবিদার। ১৯৯১-৯২ সালে ক্ষুধা-দারিদ্র্য নিরসনের হার যেখানে ছিল ৫৬.৭% সেখানে তা ২০১৫ সালে ২৪.৮%-এ দাঁড়িয়েছে। যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে আমরা নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত হতে পারব।
আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। নিকট অতীতে রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত আন্দোলনের নামে যেসব ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয়েছে তাতে আরেক বার প্রমাণিত হয়েছে এখানে রাজনীতিতে ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থটাই মুখ্য। দেশ-জাতির বৃহৎ স্বার্থ একেবারেই গৌণ। অতীতের তথাকথিত আন্দোলন গণমানুষের অধিকারসংশ্লিষ্ট ছিল না এবং এমনটি আমাদের সার্বিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্রটাকেই পুুষ্ট করেছে। এ কথা তো অনস্বীকার্য যে, ত্যাগ ছাড়া কখনো বড় অর্জনই সম্ভব হয় না। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোতে পারলেই কেবল পূরণ হতে পারে স্বপ্ন। তবে লক্ষ্য নির্ধারণই নয় যথেষ্ট। সাফল্যের পূর্ণতা অর্জন করতে হলে ঝুঁকি ও সাহসের সঙ্গে সততা-দক্ষতা-আন্তরিকতা অত্যন্ত প্রয়োজন। আমাদের সামনে বাধার প্রাচীর কম নয়। আমাদের কোনো কোনো রাজনৈতিক শক্তি এখনো রাজনীতিকে অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করার বিপরীত প্রান্তে অবস্থান করছে। কথায় কথায় কিংবা কারণে অকারণে হরতাল-অবরোধ বা জ্বালাও-পোড়াওয়ের অপচর্চা কিভাবে রাজনীতির অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠল তাও সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা আছে। এই বৃত্ত ভাঙতে হবে। রাজনীতির নামে এই অপচর্চা বন্ধ করতেই হবে।
শক্তিশালী গণতন্ত্র, দক্ষ আমলাতন্ত্র, জ্ঞাননির্ভর শিক্ষা, জনবান্ধব রাজনীতি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে বাংলাদেশ তরতর করে আরো বহু দূর এগিয়ে যাবে এও নিশ্চিত করেই বলা যায়। আমাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের অসামান্য সাফল্যসমস্যা-সংকট আছে সত্য কিন্তু সম্ভাবনার ক্ষেত্রও নয় কম বিস্তৃত। সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রগতির মাধ্যম হিসেবে ধরে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও এর বাস্তবায়নে যথাযথ মনোযোগী কিংবা নিষ্ঠ হলে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের সিঁড়ি ডিঙিয়ে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া মোটেই দুরূহ বিষয় নয়। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমডিজির যেসব লক্ষ্য পূরণে আমরা এখনো পিছিয়ে আছি সেগুলোর দিকে দিতে হবে বিশেষ দৃষ্টি। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদসহ রাষ্ট্র পরিচালকদের নিতে হবে নির্মোহ অবস্থান। দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব ব্যাপার অত্যন্ত কাক্সিক্ষত কিংবা প্রত্যাশিত হলেও আমরা এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছি। মানসিক দৈন্য কাটিয়ে সবাইকে জাতীয় স্বার্থ কিংবা প্রশ্নে হতে হবে ঐক্যবদ্ধ।
দারিদ্র্য বিমোচনের নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে নির্ধারিত সময়ের তিন বছর আগেই। তবে তাতে আত্মশ্লাঘার অবকাশ নেই। বরং বিষয়টিকে অনুপ্রেরণার উপকরণ হিসেবে ধরে নিয়ে আরো অনেক কাজ করতে যেতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বৈষম্য হ্রাসের পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাসহ দেশ-জাতির উন্নয়ন-অগ্রগতি সংশ্লিষ্ট সব কিছু নিশ্চিত করতে হবে নির্মোহ অবস্থান নিয়ে। বেকারত্ব ও আংশিক বেকারত্বের হার হ্রাস করার পাশাপাশি শিল্পায়নসহ কৃষিক্ষেত্রে আরো দূরদর্শী পরিকল্পনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। শিক্ষায় আমাদের যে অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাও বড় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে আমাদের উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রে। সর্বাগ্রে রাজনীতিকদের নজর দিতে হবে জন ও দেশবান্ধব দায়বদ্ধ রাজনীতির দিকে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা কম নয়। কাজেই সব বিবেচনা করে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলো যেন মানুষের জীবনকে ক্রমাগত অগ্রগতির দিকেই নিয়ে যায় সেদিকে রাখতে হবে বিশেষ দৃষ্টি।
বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই উন্নয়নের ধারাকে নিতে হয় এগিয়ে। এমডিজির লক্ষ্য অর্জনে সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পদক্ষেপ হিসেবেই এসডিজি প্রণয়নের তাগিদ অনুভূত হয়। দারিদ্র্য বিমোচন হচ্ছে দেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। দারিদ্র্য যে কোনো রাষ্ট্রেই গভীরতর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। তাই দারিদ্র্য বিমোচনকে অগ্রগতির পূর্বতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক্ষেত্রে যেহেতু আমরা সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে পারছি সেহেতু এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে অন্যান্য বিষয়ের দিকে বিশেষ লক্ষ্য রেখে এগুলে অবশ্যই আমরা কাক্সিক্ষত মাত্রা স্পর্শ করত পারব এবং আমাদের সার্বিক চিত্রও এতে পাল্টে যেতে বাধ্য। তবে সব কথার শেষ কথা হলো, সুশাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিই কেবল পারে সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথ সুগম করতে।