দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোটায় আনার লক্ষ্য

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনের পর প্রণয়ন হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের (এসডিএস) কৌশল। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোটায় নামানোসহ ১৭টি কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে এসডিএসে। এ নিয়ে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের প্রধান কার্যালয়ে শুরু হচ্ছে তিন দিনব্যাপী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিএস) সামিট। ওই সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের ১৫০ রাষ্ট্রপ্রধান ওই সামিটে অংশগ্রহণ করবেন।
এসডিএসের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আগামী পনেরো বছরের মধ্যে দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনা। এ কর্মপরিকল্পনার সঙ্গে ১৯৩টি দেশ একমত হয়েছে। এদিকে বাংলাদেশ সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) অর্জনে বেশ সফল হয়েছে। এমডিজির বেঁধে দেয়া লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি দারিদ্র্যের হার কমেছে বাংলাদেশে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার হচ্ছে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ।
দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোটায় আনা এবং এসডিজির কর্মপরিকল্পনা প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি বলেছেন, আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশকে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে কিছু সূচক বেঁধে দেয়। ১৯৯৭ সালে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য, শিশু, নারী, ক্ষুধার সূচক অর্জনে লক্ষ্যমাত্রা বেঁধে দেয়। বাংলাদেশ এসব লক্ষ্যমাত্রা সফলতার সঙ্গে অর্জন করেছে। তিনি আরও বলেন, গত পনেরো বছরে দারিদ্র্যের হার যেভাবে কমেছে তা অব্যাহত থাকলে আগামীতে আমরা এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব।
এডিএসের নির্ধারিত ১৭টি এজেন্ডার মধ্যে রয়েছে দারিদ্র্যের হার বিলোপ, ক্ষুধামুক্ত, সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ, গুণগত শিক্ষা, নারী-পুরুষের সমতা, বিশুদ্ধপানি ও স্বাস্থ বিধান, সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি, শোভন কর্ম ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প উদ্ভাবন ও অবকাঠামো, অসমতা দুরীকরণ, স্থিতিশীল নগর ও সম্প্রদায়, দায়িত্বশীল ভোগ ও উৎপাদন, জলবায়ু কার্যক্রম, জলজ জীব, স্থল জীব, শান্তি, ন্যয়বিচার, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও লক্ষ্যপূরণে অংশীদারিত্ব।
২০৩০ সালের মধ্যে এসব বিষয় নিশ্চিত ও বাস্তবায়ন করতে আন্তর্জাতিক কমিউনিটি ও জাতীয় সরকার কাজ করবে। আর এ লক্ষ্য পূরণের ব্যাপারে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, এসব এজেন্ডা বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে বিশ্ব একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের দিকে ধাবিত হবে। তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্য দুরীকরণ হচ্ছে সাধারণ মানুষের এজেন্ডা। এটি শেষ করতে কার্যকরি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
জানা গেছে, এসব এসডিএসের এসব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বের ১৯৩টি দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আর প্রত্যেক দেশে নিম্ন, মধ্য ও ধনী আয়ের মানুষের মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।
জানা গেছে, এসডিএস অর্জনে বেসরকারি খাতের ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। এ জন্য দরকার হবে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ। আর কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগে বড় ধরনের ভূমিকা রাখছে বেসরকারি খাতও। এ জন্য এসডিএস অর্জনে বেসরকারি খাতের গুরুত্ব অনেক বেশি।
এসডিএস অর্জন ও সামিট নিয়ে গত সপ্তাহে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কিত বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল (নীতি সমন্বয়ক) থমাস গাস বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে প্রেস বিফ্রিং করেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, এসডিজি অর্জনে বেসরকারি খাতের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যিক সংগঠনগুলো রয়েছে। এসব সংগঠন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারে। দারিদ্র্য বিমোচন করতে হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। যা বেসরকারি খাতের মাধ্যমে সম্ভব। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক দেশ এমডিজি ও এসডিজি অর্জনে বেসরকারি খাতের ভালো ভূমিকা থাকবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ইতিমধ্যে এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। প্রবৃদ্ধি নিয়মিত ৬ শতাংশের ওপরে থাকায় দারিদ্র্যের হার কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। ২০১৫ সালে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশে নেমেছে দারিদ্র্যের হার। দারিদ্র্যের হার কমানোর লক্ষ্যমাত্রা চলতি বছরে ৮ শতাংশ ছিল। সেখানে ৬ দশমিক ৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতি বছর দারিদ্র্যের হার এক দশমিক ২০ শতাংশ হারে কমানোর কথা। কিন্তু সেখানে এক দশমিক ৭৪ শতাংশ হারে কমেছে। যে কারণে ২০১৫ সালের আগে অর্থাৎ ২০১৩ সালেই দারিদ্র্য কমানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাঁচ বছরের নিচে শিশুর রুদ্ধ বিকাশ শিশুর সংখ্যা ২০০৪ সালে ছিল ৫১ শতাংশ। সেখান থেকে কমে ৩৬ শতাংশে এসেছে।
এছাড়া প্রাথমিক শিক্ষায় পঞ্চম শ্রেণীর পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ২০১৪ সালে ৮১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যা ১৯৯১ সালে ৪৩ শতাংশ। জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে ২০১৪ সালে প্রাথমিক শিক্ষায় ছেলে ও মেয়ের অনুপাত এক দশমিক ০৩ শতাংশ। যা ১৯৯০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে এ হার শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ থেকে শূন্য দশমিক ৬৭ শতাংশ হয়েছে।
পাশাপাশি শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস পেয়েছে। পাঁচ বছরের নিচে কম বয়সী শিশু মৃত্যুর হার ১৯৯০ প্রতি হাজারে ১৪৬ জন ছিল। মৃত্যুর সংখ্যা ২০১৩ সালে কমে ৪৬ এ নেমেছে। শিশুর হাম টিকার হার ২০১৪ সালে ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। যা আগে ছিল ৫৪ শতাংশ।