দূরদেশেও যা আমাদের অর্জন, যা আমাদের গৌরব

লেখক : অজয় দাশগুপ্ত কলামনিস্ট ও গবেষক, সিডনি

অফিসের লিফটের এক জায়গায় একটি ছোট টিভি পর্দা আছে। একটু পরপর গুরুত্বপূর্ণ সব খবর ভেসে আসে তাতে। এখন মানুষের জীবনে সময়ের দাম বেশি। হাতে তার সময় নেই তেমন। এককালে তিন ঘণ্টার ছায়াছবি এখন নেমে এসেছে এক থেকে দেড় ঘণ্টায়Ñ কেউ এখন আর বিমলমিত্র বা শরৎচন্দ্রের ঢাউস কিতাব পড়ে না। সবকিছু ছোট ও সারমর্ম আকারে পেশ না করলে শোনা বা দেখার ধৈর্য নেই কারও। আধুনিক দেশ ও সমাজে সময়ের অভাব আরও প্রকট। ফলে এই ক্যামেরা টিভি অনেক বেশি জনপ্রিয়। দেখি ভেসে ভেসে আসছে বাংলাদেশের নাম। না কোনো খারাপ অর্থে নয়। আজ ক্রিকেট অধিনায়ক স্মিথ বলছেন, তিনি বাংলাদেশে ট্যুরের ব্যাপারে আশাবাদী। বিচলিত কিছু নন। তিনি বিচলিত হন বা না হন আমি বিচলিত। কারণ লিফটভর্তি মানুষের চোখে চোখে মনে গেঁথে যাচ্ছে আমার দেশের নাম। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি যা পারেনি ক্রিকেট তাই করে দিচ্ছে অবলীলায়। এই যে দেশ ও জাতির ছবি আঁকা এবং তার প্রচার এর গুরুত্ব ভাষায় বলা যায় না।
আমাদের যেসব বন্ধুরা ছবি আঁকত তাদের তুলিতে রঙিন হয়ে ওঠা ছবিগুলো ছিল আমার কাছে বিস্ময়। অবাক হয়ে দেখতাম কীভাবে একটা সাধারণ বিষয় বা চেনা কোনো ইমেজ হয়ে উঠছে অসাধারণ বর্ণিল। এই রঙতুলি কি কেবল ক্যানভাসের বিষয়? মোটেও নয়। জীবনের অনেক কিছুই বদলে যায় নানা জাতীয় তুলির টানে। শুধু ব্যক্তির জীবন নয়, বদলে যায় কোনো কোনো জাতির জীবন-রাষ্ট্রের জীবনবোধ। আমাদের দেশটি মেধা আর শ্রমের এক অপূর্ব দেশ। মাঝে মাঝে আমরা তা ভুলে যাই। ভুলিয়ে দেওয়া হয়। বিশেষত রাজনীতির কঠিন ছোবলে দেশ যখন পথহারা বা জাতি যখন পথভ্রষ্ট তখন আমরা ভাবি আর বুঝি কোনো রাস্তা খোলা নেই। এমন সব কঠিন সময় এসে সামনে দাঁড়ায় ভাবতে বাধ্য হই এগোনোর পথ বুঝি চিররুদ্ধ হয়ে গেল। আসলে কি তাই? এর পরই ঘুরে দাঁড়াই আমরা। কেবল ঘুরে দাঁড়াই বললে ভুল হবে, শুরু হয় নতুন কোনো যাত্রা। বলা বাহুল্য সে পথ আলোর, সে পথ সম্ভাবনার। একটা সময় ছিল আমরা ছিলাম সব জায়গায় দুধভাত। সার্ক হলো আমরা সম্মেলন করলাম আমাদের নেতা দেশের মিডিয়ায় ফাটাফাটি দেখালেন কিন্তু বহিরাঙ্গিকে আমাদের চেহারাটা ছিল ভিন্ন। আমরা নির্জোট আন্দোলনে গেলাম, কমনওয়েলথে গেলাম, জাতিসংঘে গেলাম, দুনিয়ার নানা জায়গায় আমাদের জায়গা হলো কিন্তু অবস্থান মিলল না।
অবস্থান এমন এক বিষয় যা চাইলেই মেলে না। তার জন্য চাই সম্মিলিত প্রয়াস, চাই মেধা, শ্রম আর জাতিগত উদ্ভাস। সম্ভাবনা থাকার পরও আমাদের ভাগ্যে শিকে ছেড়েনি। যার মূল কারণ জাতীয় ঐক্যের অভাব। মুক্তিযুদ্ধের উজ্জ্বলতায় জন্ম হলেও আমরা শুরু থেকেই ছিলাম দ্বিধাবিভক্ত। তার ওপর ছিল আর্থিক অনটন আর উন্নয়নের অভাব। কিছুতেই ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না। ধরা দিচ্ছিল না সোনার হরিণ। কিন্তু আমরা এটা জানতাম একদিন না একদিন পুবের আকাশে সূর্য ঝলমল করবে এবং তার প্রভায় আলোকিত হবে বাংলাদেশ। সে আলো যে উপমহাদেশ ছাড়িয়ে দুনিয়ার কোনায় কোনায় ছড়িয়ে যাবে সে স্বপ্নও ছিল মনের গহিনে। স্বপ্নদ্রষ্টা, কবি, লেখক, দার্শনিক, সুফিসাধকরা সে মর্মবাণী রেখে গিয়েছিলেন আগেই। আমরা ধরতে পারিনি।
এই সেদিনও উপমহাদেশের দুই শক্তি ভারত ও পাকিস্তান আমাদের পাত্তা দিতে চাইত না। জীবনের নানা সম্ভাবনায় আমাদের আলোকিত জগৎটি দেখার পরও এরা চোখ বুজে থাকতে ভালবাসত। এদের এক দেশ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পরম মিত্র। তাদের অবদান ইতিহাসে সোনার আখরে লেখা। তাদের সেনারা জীবন দিয়ে তাদের জনগণ নানা ধরনের ত্যাগ স্বীকার করে আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। একাত্তর অবধি সে এক নিরবচ্ছিন্ন পজিটিভ কাহিনি। অন্যদিকে আরেক দেশের অংশ হওয়ার পরও তাদের সঙ্গে ছিল আমাদের দীর্ঘ বৈরিতা, যা এক সময় যুদ্ধে পরিণত হয়। সে যুদ্ধ কোনো সহজ বা মুখোমুখি দুটো দেশের লড়াই ছিল না। মূলত যুদ্ধের সময় আমরা ছিলাম নিরস্ত্র আর অসহায়। অন্যদিকে আক্রমণকারী দেশটি ছিল আগ্রাসী। খুব স্বাভাবিকভাবেই এ দুদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কখনোই সরলরেখার মতো কিছু নয়। বরং বলা উচিত দুদেশের সঙ্গেই আমাদের ওঠানামা পর্যালোচনার বিষয়। মিত্র দেশটি কত কারণে কতভাবে যে বৈরী হয়ে উঠেছে সেটা যেমন দেখার বিষয়, তেমনি শত্রু দেশটিও হয়ে উঠেছে কোনো কোনো সম্প্রদায় বা জাতির একটি অংশের কাছে
পরম বান্ধব। এসব নাটকের ফাঁকে আমাদের যে জাতীয় চরিত্র তা কিন্তু চাপা পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। কিন্তু ওই যে বলছিলাম, সময়ের একটা চাওয়া বা দাবি থাকে তা কিন্তু থেমে থাকেনি। শুধু থেমে থাকা নয়, সে আসলে চলমান। এখন আমরা যা দেখছি তা আসলে সময়ের হাত ধরে উঠে আসা এক অনিবার্য বাস্তবতা।

আগেই বলেছি, উন্নয়ন ও এগিয়ে যাওয়ার বিষয় কেবল রাজনীতি নয়। আজকের দিনে অর্থনীতি যত ব্যাপক আর গুরুত্বপূর্ণ হোক সেও একা এর ভাগীদার নয়। এমন এমন দেশ আছে যাদের কিছু নেই শুধু দু-একজন মানুষ তাদের আশ্চর্যজনকভাবে উজ্জ্বল করে রেখেছে। আপনি সাউথ আফ্রিকা যাবেন তো দেখবেন একা মান্ডেলাই একশ। ফিজি যাবেন দেখবেন অভিবাসী ভারতীয় ফিজিয়ান খ্যাতনামা গলফ খেলোয়াড় বিজয় সিংহের জয়জয়কার। এদের ভেতর দিয়ে মানুষ ওই সব দেশকে চিনছে বা জানছে। আগের দিন নেই যে, ভারতকে জানতে হলে গান্ধিকে জানতেই হবে। আমেরিকা মানে জর্জ ওয়াশিংটন বা রাশিয়া মানে লেনিন। তারা ইতিহাসে অবশ্য উজ্জ্বল। এখন সময় অমিতাভের। এখন আপনি আমেরিকা বললে জুকারবার্গকে বুঝবেন না কেন? আমি তো দেখছি এদের অনেকেই পচাগলা রাজনীতিবিদদের চেয়ে ঢের বেশি জনপ্রিয় আর ইমেজে ভাস্বর। এ দেশে মধ্যপ্রাচ্যের যত মানুষ আফ্রিকার মানুষ তাদের ভেতর ভারতীয় সিনেমা হিরোরা যে পরিমাণ জনপ্রিয় তা তো রীতিমতো ঈর্ষার বিষয়। এর সঙ্গে আছে খেলাধুলা। আর্জেন্টিনার রাজধানী বা দেশটি কোথায় জানেই না এমন কোটি মানুষের মুখে মুখে মেসির নাম। নেইমার বা রোনালদোর বেলায়ও তাই। আমাদের দেশের যে কোনো মানুষ ইমরান খান বা কপিল দেবকে যতটা মনে রেখেছে কিংবা স্মরণে রাখে ততটা বেনজির বা রাজীব গান্ধির বেলায় নয়। খেলোয়াড়রা এখন দেশ ও জাতির পরিচয়সূত্র। তারা সময় গেলেও রাজনীতিবিদদের মতো পুরনো বা ফ্যাকাসে হয়ে যান না। আমরা ভাবি রাজনীতিবিদ বা রাজনীতিই সব। আসলে গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্জন ও সম্ভাবনার মূল দিকটা এসেছে মেহনতি মানুষের শ্রমে আর খেলাধুলার উজ্জ্বলতায়। একদা আমরা উপমহাদেশের দুই বা ততোধিক ক্রিকেট শক্তিকে সমীহ করে ছোট ভাইয়ের মতো চললেও সেদিন আজ বিগত। আজ আমাদের সাকিব আল হাসান দুনিয়ায় এতটাই পরিচিতে যে, অন্য দেশের প্রধানমন্ত্রীও তার নাম উচ্চরণ করে যায়।
বিদেশে অন্য দেশের রাজনীতি কোনো কাজে আসে না। কাজে আসে অর্জন। ক্রিকেট আমাদের সে জায়গাটা দিচ্ছে। একদা সিংহ-হাতি নামে পরিচিত দলগুলো বাঘের কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করে চলেছে। যার জের যার সুনাম ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। এটা কোটি কোটি ডলারেও কেনা যায় না। গ্রামের ছেলে মুস্তাফিজ, লিকলিকে লিটনের তেজে আমাদের যে জয় তাতে সমগ্র ভারত স্তম্ভিত। আপনি আমাকে আর একটা দিক দেখান যেখানে তাদের আমরা এভাবে তাক লাগিয়ে দিতে পারি। এটাই বাংলাদেশের শক্তপোক্ত জায়গা। শুধু খেলা আর জয়? এর ভেতর দিয়ে যে জাতীয় ঐক্য, সম্প্রীতি আর ভালবাসা সেটার মূল্য কি কম? এটা তো মানতেই হবে, আমাদের দেশে বিভেদ বড় কঠিন। রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতা, কূপম-ুকতা আর গোঁড়ামি মিলে এক ভয়াবহ বাস্তবতা। সেখানে এই জয় আনন্দের। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে এমন আনন্দ আমরা বহুকাল উপভোগ করিনি। রাতের আকাশ রাঙিয়ে দেওয়া ক্রিকেট আলোয় যে ভোর তার ভেতর আছে আগামীর আরেক জয়গাথা। একদা যাদের নাম শুনলে আমাদের কম্প শুরু হতো। যাদের নাম জানামাত্র আমরা অতিভক্তিতে গলে যেতাম তারাই এখন আমাদের ভয় পাচ্ছে। এটা কি আত্মবিশ্বাসের জায়গাটাকে নতুন ভিত্তি দিচ্ছে না? আমরা যারা পুরনো আমাদের কাছে বুড়ো দৃষ্টি বা ঘোলাটে চোখে একদা হিরোদের দেশকে বড় মনে হলেও সে জায়গায় দূরত্ব কমিয়ে আনছে তরুণ ক্রিকেটাররা। প্রমাণ করে দিচ্ছে, আপনি দিল্লি, লাহোর বা লন্ডনের মতো নামভারী শহরে জন্মালেই সেরা হতে পারবেন না। আপনি অজপাড়াগাঁ থেকে এসেও দুনিয়ায় সে এক্সপ্রেসের নয়া ইতিহাস তৈরি করতে পারেন।
গর্বে আমাদের বুক ফুলে যায়। ভাবি তারুণ্যের এই জোয়ার কি দেশের রাজনীতিতেও লাগতে পারে না? পুরনো অচলায়তন ভেবে এরাই তো এনে দিতে পারে নব আলো। নতুন জীবনের স্পন্দন। যেমন এগারো ক্রিকেটার মাতিয়ে রেখেছে আশার ভুবন। যাদের দেখে, যাদের কীর্তিতে আনন্দবাজারের মতো নাক উঁচু মিডিয়ার হেডিং ছিল লজ্জার ভারত আর সোনার বাংলার জয়। এভাবে বড় কাজ করে অন্যকে ছোট না করেও যে বড় হওয়া যায় ক্রিকেট আবারও তা প্রমাণ করে দিল।
জয়তু বাংলাদেশ, এই রূপ দেখে মনে মনে বলি : তোমার কী মুরতি আজি দেখিরে…