কাপ্তাইয়ে মাল্টা চাষের নতুন দিগন্ত উন্মোচন

পার্বত্য জেলার পাহাড়ি ভূমিতে মাল্টা চাষে সফলতা অর্জনের পর এবার কৃষি গবেষকরা কাপ্তাইয়ে পাহাড়ের সমতল এলাকাগুলোতে মাল্টা চাষে সফলতা দেখিয়েছেন। খাগড়াছড়ি জেলার নয়নাভিরাম মাল্টা বাগান ইতোমধ্যে সারাদেশে তোলপাড় ফেললেও এতদিন সকলের বদ্ধমূল ধারণা ছিল শুধু পাহাড়েই মাল্টা চাষ করা যায়। কিন্তু এই ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়ে কাপ্তাই উপজেলায় অবস্থিত রাইখালীর কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা পাহাড়ের সমতল এলাকায় মাল্টা চাষে সফলতা দেখিয়েছেন।সমপ্রতি রাঙ্গামাটি কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা এবং কাপ্তাই উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা সমতল জায়গার এসব মাল্টা দেখে আবির্ভূত হয়ে তারা গবেষকদের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।কাপ্তাই কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা জানান, আমাদের দেশের পাহাড়ি এলাকায় ভালো মাল্টা চাষ হলেও পাহাড়ি সমতলের মাটিতে সাধারণত মাল্টা গাছ হয় না। পাহাড়ের সমতলে মাল্টা হবে না এটাই ছিল সবার বদ্ধমূল ধারণা। কিন্তু ঐ ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে আমরা পাহাড়ের সমতলে মাল্টা চাষ করতে পেরেছি।’বাগান পরিদর্শন করে কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইসরাত জাহান পান্না বলেন, ‘মাল্টা বাগান এতটা সফলতা পেয়েছে চোখে না দেখলে বুঝতে পারতাম না।’ পাহাড়ের সমতলে মাল্টা চাষে বিপ্লব আনায় তিনি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান।কেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের সমতলে লাখ লাখ একর জমি অনাবাদি পড়ে আছে। ব্যক্তি ও সংস্থা পর্যায়ে পাহাড়ের সমতলে কেউ মাল্টা চাষ করতে আগ্রহী হলে গবেষণা কেন্দ্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ সহায়তা দেয়া হবে।ফটিকছড়ি : চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে সম্ভাবনাময় ফল মালটার চাষ করে স্বাবলম্বী হয়েছেন কৃষক শাহজাহান মিয়া। উপজেলার নারায়ণহাট ইউনিয়নের সন্দ্বীপ পাড়ায় শাহজাহান মিয়া ৪ কানি জমির ওপর এ ফলের চাষ করছেন। বিদেশি উন্নতজাতের চারা সংগ্রহ করে মালটা চাষ করছেন তিনি। এ থেকে দৈনিক এক থেকে দেড় মণ মালটা উৎপাদন হয়। স্থানীয় বাজারে মালটার ব্যাপক চাহিদা থাকায় বাজার জাতের কোন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না এ কৃষকের। দেশে অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানি মালটা বাজার সয়লাব করলেও পিছিয়ে নেই দেশীয় মালটা।বিশেষজ্ঞদের মতে, ফলটি দেখতে কমলার মতো ও স্বাদে মিষ্টি হওয়াই এটিকে সুইট অরেঞ্জ বলা হয়। সাধারণত ইন্ডিয়া ও চায়নায় মালটার ব্যাপক উৎপাদন হয়ে থাকে। এটির বৈজ্ঞানিক নাম ডধর্রল্র ্রধভণভ্রধ্র. কাঁচা অবস্থায় গাঢ় সবুজ এবং পাকলে হালকা হলুদ রং ধারণ করে। বাজারে অনেক মালটা পাওয়া যায় এগুলোর গাঢ় হলুদ। মালটা চাষের জন্য ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি উপযোগী। এ ফলে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি রয়েছে। হালকা টক মিষ্টি স্বাদে মালটা আলাদা রুচি যোগায়। বাজারে অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানি মালটা পাওয়া যায়। যা দেখতে গাঢ় হলুদ। আমাদের দেশে যে মালটা উৎপাদন হয় তা দেখতে হালকা হলুদ। একটি মালটা ওজনে দেড় থেকে দুইশ গ্রাম হয়ে থাকে। সঠিক পরিচর্যা নিলে একটি মালটা গাছ থেকে ২০ থেকে ৩০ বছর ফল পাওয়া যায়। উপজেলা কৃষি সমপ্রসারণ কর্মকর্তা এমএ কাসেম জানান, ফটিকছড়ির মাটি ও আবহাওয়া মালটা্থর জন্য খুবই উপযোগী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মালটার চাষ হয়। বাংলাদেশে এ ফলটি মোচাম্বি হিসেবেই সর্বাধিক পরিচিত। এটি একটি সুস্বাদু ফল।এ ব্যাপারে কৃষক শাহজাহান মিয়া বলেন, স্থানীয় বাজারেও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। তাই আগ্রহ করে মালটার চাষ করছি। তিনি শহরের এক নার্সারীর মাধ্যমে ইন্ডিয়া থেকে ভাল জাতের মালটা চারা সংগ্রহ করে বাগান করেছেন। তিনি জানান, চারা রোপনের ১৮ মাসের মাথায় মালটা ফল ধরতে শুরু করে। তবে তৃতীয় ও চতুর্থ বছরে ব্যাপক ফল পাওয়া যায়। বছরে ৯ মাস যাবত ফুলে ফলে ভরপুর থাকে মালটা গাছ। স্থানীয় বাজারে কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকায় তিনি মালটা বিক্রি করেন বলে জানান। শাহজাহান মিয়ার বাগানের উৎপাদিত মালটা স্থানীয় বাজার ছাড়াও শহরের আড়তে বিক্রি করছেন। মালটার চাষ করে তিনি এখন সফল।পার্বত্য চট্টগ্রামের রায়খালি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. হারুন-অর-রশিদ বলেন, বর্ষাকালে পানি জমে না এমন জমিতে মালটা চাষ করতে হয়। চারা রোপণের ২০/২৫ দিন আগে প্রতিটি গর্তে ১০ কেজি গোবর, ২০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি, ১০০ গ্রাম এমপি সার মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে রেখে দিতে হবে। এর পর চারা লাগিয়ে সেচ ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করতে হবে। পরে চারার গোড়ায় এক থেকে দেড় ফুট দূরে মিঙ্ সার প্রয়োগ করতে হবে। এতে ফলন ভাল পাওয়া যায়। ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ গাউছুল আজম বলেন, শাহজাহান মিয়ার মালটা বাগানটি আমি পরিদর্শন করেছি। তার মতো স্থানীয় ধনী ও মাঝারি কৃষকরা এসব ফলমূল চাষে এগিয়ে আসলে দেশে চাহিদা মিটিয়েও প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।