সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পের উন্নয়নের সব বাধা দূর হোক

লেখক রেজাউল করিম খোকন :ব্যাংকার

দেশের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চামড়া শিল্পের গুরুত্ব দিনে দিনে বাড়ছে। রপ্তানি বাণিজ্যে জাতীয় অর্থনীতিতে চামড়া এবং চামড়াজাত পণ্যের অবস্থান তৃতীয়। স্থানীয় বাজারসহ দেশের বাইরেও চামড়া-চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা প্রচুর। পরিকল্পিতভাবে এ খাতের উন্নয়ন করতে পারলে আমাদের রপ্তানি আয়ের পরিমাণ আরো বাড়ানো সম্ভব। চামড়া শিল্পের যথাযথ বিকাশ ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এতো সম্ভাবনাময় খাতটির প্রতি যতটা মনোযোগ দেয়া উচিত ছিল ততটা মনোযোগ দেয়া হয়নি দীর্ঘদিনেও। অনেকটা অযত্ন-অবহেলা আর বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে চামড়া শিল্প ধীরগতিতে এগিয়ে চলেছে। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে চামড়া রপ্তানি করে ৩৯৭ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। অথচ আগের বছরে এ খাতে আয়ের পরিমাণ ছিল ৫০৫ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন ডলার। দেশের যেক’টি পণ্যের রপ্তানি বিশ্ববাজারে ভালো অবস্থানে রয়েছে তার অন্যতম চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য।

সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে গার্মেন্টস শিল্পের মতো চামড়া শিল্পও হতে পারে আরেকটি শক্তিশালী রপ্তানি খাত। বাংলাদেশ থেকে প্রধানত ইতালি, নিউজিল্যান্ড, পোল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়। এছাড়াও আরো বেশ কয়েকটি দেশে বাজার পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এমনকি মানসম্পন্ন হওয়ায় ভারতেও বাংলাদেশি চামড়ার অনেক কদর রয়েছে। তবে হাজারীবাগের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বিদেশি ক্রেতারা একবার এলে দ্বিতীয়বার আসতে চায় না। তারা অনেকেই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, পরিবেশের উন্নতি না হলে বাংলাদেশ থেকে চামড়া কিনবেন না।

১৯৪০ সালে রণদা প্রসাদ সাহা (আর পি সাহা) নারায়ণগঞ্জে প্রথম ট্যানারি স্থাপন করে চামড়া ব্যবসা শুরু করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে আরো বেশ কয়েকটি ট্যানারি গড়ে ওঠে সেখানে। ১৯৫১ সালের ৩ অক্টোবর সরকারি গেজেট নোটিফিকেশনে ভূমি অধিগ্রহণ করে নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার জনশূন্য হাজারীবাগে স্থানান্তর করা হয় ট্যানারি। বর্তমানে দেশে ট্যানারির সংখ্যা ২৭০টি। এর ৯০ ভাগই হাজারীবাগে। ৬৩ বছর ধরে হাজারীবাগে চামড়া শিল্পের কার্যক্রম চলছে। এ সময় শিল্পটির যে প্রসার হওয়ার কথা ছিল আসলে শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। চামড়া শিল্পের যতটা অগ্রগতি হয়েছে তা এ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়। সরকারের উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা না পেলেও তারা সামনে এগিয়ে চলেছেন। এদিকে রাজধানী ঢাকা শহরে ঘনবসতি গড়ে ওঠায় হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি শিল্প ফের স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবেশ দূষণ এবং এলাকাবাসীর দাবির মুখে ২০০৩ সালে হাজারীবাগ থেকে চামড়া শিল্প সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। সিদ্ধান্তের পর চামড়া শিল্প নগরী গড়তে সাভারের হরিণধরায় ২০০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। নতুন ট্যানারি শিল্প নগরীর কাজ সিংহভাগই সম্পন্ন হয়েছে। আর্থিক কারণে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরে বিলম্ব ঘটেছে। দীর্ঘদিন আগে স্থাপিত একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান সরিয়ে নিতে হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন। এর পুরো খরচ ট্যানারি মালিকদের পক্ষে মিটানো সম্ভব নয়। রাজধানী সংলগ্ন হওয়ায় সাভারের বিভিন্ন স্থানে যেহারে বসতি বাড়ছে তাতে আগামী ১৫-২০ বছরে এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এতে করে আগামী ২০-২৫ বছর পর ফের এ বিশাল স্থাপনা সাভারের জন্য কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

জানা গেছে, ঢাকার চামড়া যেন বাইরে পাচার না হয় সেজন্য ঈদের দিন থেকে পরবর্তী কয়েকদিন কোনো চামড়ার ট্রাক রাজধানীর বাইরে যেতে দেয়া হবে না। তবে ঢাকার বাইরে থেকে চামড়াবাহী ট্রাক, ট্রলার ঢাকায় আসতে পারবে। দেশের কাঁচা চামড়ার বিভিন্ন পাইকারি বাজারে বিক্রি হওয়া চামড়াবাহী ট্রাক যাতে ঈদুল আজহার দিন থেকে পরবর্তী ৭ দিন সীমান্তের দিকে যেতে না পারে এজন্য সতর্ক দৃষ্টি রাখতে পুলিশ-র্যাবকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইভাবে সীমান্তের ৭ মাইলের মধ্যে চামড়াজাত ট্রাক ঢাকায় আসার পথে যাতে কোনো বাধার সৃষ্টি না হয় সেজন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তত্পর থাকতে বলা হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বছরের ৪৮ ভাগ চামড়া পাওয়া যায় কোরবানীর ঈদে, ১০ ভাগ রোজার ঈদ ও শবেবরাতে, ২ ভাগ হিন্দুদের কালিপূজার সময়। তাই এসব উত্সব পূজা পার্বণে বাংলাদেশ থেকে পশুর চামড়া সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় ভারতের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে দেশের কিছু ভুঁইফোঁড় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী রাতারাতি বেশি মুনাফার লোভে পাচার করেন কাঁচা চামড়া। চামড়া পাচারকারীরা কোরবানীর ঈদের কয়েকদিন আগে বিভিন্ন সীমান্তের গ্রামে আশ্রয় নেয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, চোরাকারবারিসহ সন্ত্রাসী চক্রের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে তারা। পরবর্তীকালে তাদের সহায়তায় অপকৌশল অবলম্বন করে সারাদেশ থেকে সংগ্রহ করা গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ এর চামড়া পাচার করে দেয় ওপারে। অতএব, চামড়া পাচার রোধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।