আগামী দিনের উন্নয়ন পরিকল্পনা, এমডিজি ও বাংলাদেশ

লেখক :কলামিস্ট চিররঞ্জন সরকার

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশন শুরু হবে ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ নিউইয়র্কের জাতিসংঘের সদর দপ্তরে। এই অধিবেশনটি বিশ্বের উন্নয়নকামী দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবারের অধিবেশনেই টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (Sustainable Development Goals) বা সংক্ষেপে এসডিজি নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া এবার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিতর্ক হবে যার মধ্যে থাকবে— ‘সত্তর বছরে জাতিসংঘ-কর্মসম্পাদনে নতুন প্রতিজ্ঞা।’ (The UN at Seventy– a new commitment to actions).

৭০তম অধিবেশনে এসডিজি বা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশগুলোর অঙ্গীকার ঘোষণা করা হবে। এসডিজি হচ্ছে সহস্রাব্দের উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির (Millennium Development Goal) পরবর্তী পদক্ষেপ। তাই একে বলা হচ্ছে পোস্ট-২০১৫ কর্মসূচি। এসডিজির মেয়াদ হচ্ছে ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত।

২০০০ সালে ঘোষিত এমডিজির মোট ৮টি লক্ষ্য নির্ধারণ করে ২০১৫ সালের মধ্যে তা অর্জনের অঙ্গীকার করা হয়। বাংলাদেশ ১. মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নতি, ২. শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, ৩. এইচআইভি, এইডস, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগের প্রতিরোধ, ও ৪. সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য অর্জন করেছে। এছাড়া অপর ৪টি লক্ষ্য অর্জনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। এর মধ্যে আছে ১. নারী-পুরুষের সমতা অর্জন ও মহিলাদের ক্ষমতায়ন, ২. চরম দারিদ্র্য নিরসন, ৩. টেকসই পরিবেশ সৃজন, ৪. বিশ্বব্যাপী উন্নয়নের লক্ষ্যে অংশীদারিত্ব অর্জন। এমডিজি অর্জনের ক্ষেত্রে অনেক উন্নয়নকামী দেশের জন্য বাংলাদেশ হচ্ছে একটি উদাহরণ। এসডিজি অর্জনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ সাফল্য অর্জন করবে বলেই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। তবে এ লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে, যা শুরু করতে হবে এখনই।

ইতিমধ্যে এসডিজির ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— ১. সব ধরনের দারিদ্র্যের অবসান ২. অবসান করতে হবে ক্ষুধা, অর্জন করতে হবে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি ৩. সুস্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং সব বয়সের লোকজনের কল্যাণ সাধন, ৪. সার্বিক ও গুণগত শিক্ষালাভ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি, ৫. লিঙ্গ সমতা অর্জন এবং মহিলা ও কন্যাসন্তানের ক্ষমতায়ন, ৬. পানিপ্রাপ্তির অবাধ সুযোগ সৃষ্টি এবং স্বাস্থ্যসম্মত পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ ৭. সবার জন্য নির্ভরযোগ্য, ব্যয়ভার বহনযোগ্য, টেকসই এবং আধুনিক জ্বালানি শক্তি প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টি। ৮. সার্বিক ও টেকসই আর্থিক উন্নতি বিধান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কাজের অনুকূল পরিবেশ সৃজন। ৯. টেকসই ও স্থিতিস্থাপক অবকাঠামো নির্মাণ, শিল্পায়ন এবং অভিনবত্বকে লালন করা। ১০. দেশের অভ্যন্তরে এবং সব দেশের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণের পদক্ষেপ গ্রহণ। ১১. শহরগুলোকে সতেজ, নিরাপদ এবং স্থিতিস্থাপক ও টেকসইরূপে গড়ে তোলা। ১২. টেকসই উত্পাদন ও উপভোগের কাঠামো গঠন। ১৩. পরিবেশের পরিবর্তন ও প্রভাব প্রতিরোধে জরুরি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। ১৪. সমুদ্র, নদী এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ ও টেকসই করার লক্ষ্যে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ। ১৫. বনসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা, মরুকরণ প্রতিরোধ এবং ভূমিক্ষয় নিবারণ। ১৬. সঠিক, শান্তিপূর্ণ এবং নিবিড় সমাজব্যবস্থা সৃষ্টির ক্ষেত্রে উত্সাহদান। ১৭. বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অবদান রাখা। এই লক্ষ্যমাত্রাগুলোর মোট ১৬৯টি অর্জনযোগ্য লক্ষ্য স্থির করা হয়। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করা, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সুযোগ বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। এদিকে এমডিজির সাতটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের পথে বাংলাদেশ। দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, শিক্ষা ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশের সাফল্য এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ এমডিজি লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে রয়েছে। চলতি বছরের মধ্যেই এমডিজির সব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে চায় বর্তমান সরকার। ইতোমধ্যেই উন্নয়ন অগ্রগতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশ শিশু মৃত্যুহার হ্রাসে সাফল্য অর্জন করায় জাতিসংঘ এমডিজি পুরস্কারও পেয়েছে।

এখন দরকার এসডিজিতে বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ইস্যুগুলোর সন্নিবেশ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে সফল করতে হলে নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীপুরুষের মধ্যে সমতা নিশ্চিত করা দরকার। এসডিজির কেন্দ্রে স্থাপন করতে হবে নারীর ভূমিকা। এটা স্পষ্ট যে নারীরা যদি সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করতে না পারেন তাহলে বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে একপাশে ফেলে রাখা হবে। সুতরাং, সমাজকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের প্রয়োজন নারীর ক্ষমতায়ন, নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করা, নারীর যৌন ও প্রজনন অধিকারকে সুরক্ষা দিতে হবে। তবেই টেকসই উন্নয়নে উপনীত হওয়া সম্ভব। এসব বিষয়কে অবশ্যই ২০১৫-পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রার কেন্দ্রে স্থান দিতে হবে।

প্রায় পাঁচ কোটি তরুণ জনসংখ্যাসংবলিত আমাদের দেশের জন্য এসডিজি দলিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নীতিনির্ধারকদের তারুণ্যের শক্তি এবং এই শক্তি যথাযথ বিকাশ ও ব্যবহারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ তরুণরা এসডিজির অধিকাংশ অর্জনের সুফল ভোগ করবে এবং সেগুলো কাজে লাগাবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিশোরীদের বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে। কিশোরীরা বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে কি না, তুলনামূলক দেরিতে বিবাহিত জীবন শুরু করতে পারবে কি না, তুলনামূলক কম সন্তান নেবে কি না, প্রয়োজনীয় প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা পাবে কি না, সহিংসতা ও নিপীড়নমুক্ত জীবন যাপন করতে পারবে কি না, নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ ও ক্ষমতা পাবে কি না ইত্যাদি বিষয় যাচাই করেই এসডিজির সার্থকতা নিরূপিত হবে।

জেন্ডারসমতা প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেননা নারী-পুরুষের মধ্যকার বৈষম্য দূর করে উভয়ের জন্য সমান সুযোগ ও বিকাশের পথ করে দেয়া ছাড়া সামাজিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। দরিদ্র নারীদের উন্নয়নে প্রচলিত বৈশ্বিক উন্নয়ন মডেলের ভূমিকা আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। পুঁজিতান্ত্রিক উন্নয়ন কাঠামো ও পরিকল্পনায় নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত ন্যায্যতা, সর্বোপরি মানবাধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ ধরনের অবস্থা দেশে দেশে ক্ষমতা ও সম্পদ বন্টনে অসমতা তৈরির পাশাপাশি নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করছে। বাড়িয়ে তুলছে নারী নির্যাতন। এ জন্য প্রয়োজন একটি নতুন উন্নয়ন মডেল যার লক্ষ্য হবে দেশে দেশে ধনী ও গরিব, নারী ও পুরুষের মধ্যে সম্পদ ও ক্ষমতার বৈষম্য হ্রাস করা। এজন্য মোটা দাগে ৪টি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা প্রয়োজন।

ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নারীর মালিকানা স্থাপন : দেখা যাচ্ছে যে, ভূমির উপর নারীদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে পরিবার ও জনগোষ্ঠীর খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার নিশ্চয়তা তৈরি হয়। ভূমি কেবল আয়ের উত্স নয়, এটা সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। ২০১৫ পরবর্তী পরিকল্পনায় ভূমির উপর নারীর অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পানি, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ইত্যাদির উপর তাদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা ও সেই মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সম্পত্তির উপর নারীর মালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ ছাড়া সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।

শান্তি ও ন্যায়বিচার বা ন্যায্যতা : একটি ন্যায্য ও টেকসই উন্নয়নের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীল অবস্থা খুবই গুরুত্বপূর্ণ,বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা ও অধিকারের প্রশ্নে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া, সুশাসনের অভাব ইত্যাদি নারী অধিকার নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অধিকন্তু, নারীর প্রতি সহিংসতাকে সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন যা অন্যান্য উন্নয়ন অধিকারের অন্তরায়। সহিংসতার ফলে নারী ও শিশু গৃহহীনতা, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

নারীদের নেতৃৃত্ব ও অংশগ্রহণ : সকল স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের নেতৃৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, এটা শুরু করতে হবে ঘর থেকে এবং সরকারি উচ্চপর্যায় পর্যন্ত তা বলবত্ থাকবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দলে অন্তত ৩০ ভাগ নারীসদস্য রাখার বিধানটি কার্যকর করতে হবে। এছাড়া সরাসরি রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নারীদের ক্ষমতায়নকে আরও জোরদার করে। স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণে নারী আন্দোলন সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ব্যাপারে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে নারীমুক্তি ইস্যুগুলোর অনেক কিছু বদলে গেলেও মৌলিক এজেন্ডাটি আজও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। জেন্ডার সমতা বা নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা তাই এখনো নারী মুক্তির কেন্দ্রীয় বিষয়। নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর মানবাধিকার, ক্রমবর্ধমান বহুমাত্রিক নারী নির্যাতন, পারিবারিক নির্যাতন, গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি, নিরাপদ অভিবাসন তাই সামপ্রতিকালে নারী আন্দোলনের অন্যতম বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায় থেকে ইস্যুগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে।