সম্ভাবনার নতুন দ্বার

টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি খাত

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তথ্য-প্রযুক্তি খাত গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে নিয়েছে। প্রতিটি দেশেই বিনিয়োগ বাড়ছে এই খাতে। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে এই তথ্য-প্রযুক্তিই। এদেশে টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তির বড় এবং সম্ভাবনাময় বাজারকে কাজে লাগাতে সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প। এসব প্রকল্পে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি আসছে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ। মোবাইল ও টেলিকম ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে বিদেশি কোম্পানীগুলো। ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ বাড়িয়েছে তারা। অন্যদিকে হাইটেক পার্ক, ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার, আইটি পার্ক, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট, আইটি ভিলেজ, সিলিকন সিটি স্থাপন খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার নতুন দুয়ার। বিনিয়োগের পাশাপাশি সুযোগ তৈরি হয়েছে কয়েক লাখ দক্ষ জনশক্তির কর্মসংস্থানের। এছাড়া আউটসোর্সিংয়ে সুনাম কুড়িয়ে তৃতীয় স্থান অর্জন করেছে এদেশের তরুণরা। তথ্য-প্রযুক্তি দেশের অর্থনীতিতে অপরিহার্য অংশ হয়ে পড়েছে। টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তির কল্যাণে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। দৈনন্দিন কর্মকান্ডের সাথে এখন জায়গা করে নিয়েছে এই মাধ্যম। প্রিয়জনদের সাথে যোগাযোগ, পড়াশুনা, কেনাকাটা, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, অফিস-আদালতের কাজকর্ম, বিনোদন, ব্যবসা-বাণিজ্য সকল কিছুই পরিচালিত হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে। যার সুফল পেতে শুরু করেছে মানুষ। কেবল সেবার ক্ষেত্রেই নয়, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এটি এনেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। গত বছরই কেবল টেলিকম খাতে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ১ হাজার ৮১৪ কোটি টাকা। চলতি বছর এর পরিমাণ আরও অনেক গুণ বেড়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও সরকার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে ও তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয় নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ জন্য তথ্য-প্রযুক্তিকে উন্নত করার পাশাপাশি ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য ডিজিটাল সোসাইটি তৈরি, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং এর সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ছোট-বড় অনেক প্রকল্পই হাতে নিয়েছে সরকার। মোবাইল খাতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বাজারে বিপ্লব সৃষ্টি হয়েছে। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ি, গত জুলাই পর্যন্ত দেশের ছয় মোবাইল অপারেটরের ১২ কোটি ৮৭ লাখ ৬৯ হাজার সিম ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৫ কোটিতে। মোবাইলের এই বাজার ধরতে গ্রামীণফোন, বাংলালিংক, রবি আজিয়াটা ও এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেডের মতো বিদেশি কোম্পানী প্রতিবছরই বিনিয়োগ করছে। এর পাশাপাশি তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে বেশ কিছু প্রকল্পের কারণে ইতোমধ্যে আসতে শুরু করেছে বিদেশি বিনিয়োগ। কালিয়াকৈরে নির্মিতব্য হাইটেক পার্ক নির্মাণ সম্পন্ন হলে একদিকে যেমন বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। তেমনি কর্মসংস্থান হবে ৭০ লাখ জনশক্তির। একই স্থানে ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার (টিয়ার ফোর ডাটা সেন্টার) নির্মাণের জন্য ১৫৪ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে চায়নিজ এক্সিম ব্যাংক। যশোরে আইটি পাক স্থাপন করা হলে বিদেশি কোম্পানীগুলোই নয়, দেশি অনেক কোম্পানীই বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সরকারের যেসব মেগা প্রকল্প রয়েছে এর মধ্যে কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক নির্মাণ, একই স্থানে টিয়ারফোর ডাটা সেন্টার স্থাপন, যশোরে আইটি পার্ক স্থাপন, রাজধানীর মহাখালীতে আইটি ভিলেজ, রাজশাহীতে বরেন্দ্র সিলিকট সিটি, সিলেটে ইলেক্ট্রনিক্স সিটি, আইসিটি সেক্টরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও এ সেক্টরে রপ্তানি বহুমুখী করা, জেলা পর্যায়ে পাবলিক নেটওয়ার্ক স্থাপন, আউট সোর্সিংয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টি, জেলা পর্যায়ে হাইটেক পার্ক/সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক/আইটি ভিলেজ স্থাপন করার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। যার মাধ্যমে একদিকে তথ্য-প্রযুক্তির উন্নত সেবা গ্রহণ করতে পারবে সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে এসব প্রকল্পে আসছে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ। সৃষ্টি হচ্ছে কয়েক লাখ কর্মসংস্থান। আইটি পার্ক : দেশের আইটি খাতকে সমৃদ্ধ ও এ খাতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহী করতে যশোরে ২৪১ কোটি টাকা ব্যয়ে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপন করছে সরকার। ২০১৬ সালের মধ্যে এ কাজ শেষ করবে সরকার। আইটি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যশোরে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপনের কাজ শেষ হলে দেশের তথ্য-প্রযুক্তি, আইসিটি, ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং খাতের সম্ভাবনার দ্বার আরও প্রসারিত হবে। পার্ক স্থাপনের কাজ শেষ হলে ২০১৮ সালের মধ্যে সফটওয়্যার রপ্তানি করে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করার টার্গেটও নেয়া হয়েছে। সরকার অন্য একটি প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৩৪ হাজার তরুণ-তরুণীকে আইটি খাতে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। তাদের জন্য এ পার্ক নতুন কর্মক্ষেত্রের দ্বার উন্মোচন করবে। এ বিষয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, যশোরে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপনের মাধ্যমে দেশের আইটি খাত আরও সমৃদ্ধ হবে। অন্যদিকে আইটি খাতে আরও বেড়ে যাবে নারীদের অংশগ্রহণ। তিনি বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার অংশ হিসেবেই সরকার তরুণ প্রজন্মকে আইটি খাতের দিকে উৎসাহিত করছে। আর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপনের কাজ শেষ হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও আইটি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। এ বিষয়ে হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, যশোর সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপন প্রকল্পের আওতায় একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপন করা হবে। ভবিষ্যতে এ সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে ডাটা রিকভারি সাইট (ডিআরএস) স্থাপন করা হবে। হাইটেক পার্ক : গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্থাপন করা হচ্ছে হাইটেক পার্ক। ২৩২ একর জামিতে এই পার্ক নির্মিত হবে। ইতোমধ্যে এর অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণ, ড্রেন নির্মাণ, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, গ্যাস সংযোগ লাইন স্থাপন, ফাইবার অপটিক লাইন স্থাপন, পানি সরবরাহ, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন ইত্যাদি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ২৩৬ কোটি টাকার এই প্রকল্প সম্পন্ন হবে আগামী জুনে। পার্কটির কার্যক্রম শুরু হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে আইটি শিল্প স্থাপনে এগিয়ে আসবেন। এই হাইটেক পার্কের কার্যক্রম পুরোমাত্রায় চালু করা হলে ৭০ হাজার আইটি পেশাজীবীর কর্মসংস্থানও হবে। ইতোমধ্যে পার্কের ২ ও ৫ নং ব্লকের জন্য ডেভেলপার নিযুক্ত হয়েছে সামিট-ইনফিনিটি। এছাড়া ৩ নং ব্লকের জন্য ফাইবার এট হোমকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং ১ নং ব্লক কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় রাখা হয়েছে।জানা গেছে, বর্তমানে আউটসোর্সিংয়ের জন্য ভালো এমন ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। যেসব কোম্পানী আউটসোর্সিংয়ের জন্য লোক খোঁজে, তারা বাংলাদেশকেও তাদের অন্যতম পছন্দের তালিকায় রাখছে। এ ছাড়া বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬৫ ভাগের বয়স পঁচিশের নিচে। তাই তরুণরা ভালোভাবে প্রশিক্ষণ পেলে আউটসোর্সিং থেকে বাংলাদেশ অনেক অর্থ আয় করতে পারবে। ইতোমধ্যে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে। আউটসোর্সিংয়ে করা আয়ে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় স্থান দখল করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর মহাখালীতে আইটি ভিলেজ স্থাপন, ৩৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহীতে বরেন্দ্র সিলিকন সিটি স্থাপন, ৮১ কোটি টাকায় সিলেটে ইলেক্ট্রনিক্স সিটি স্থাপন করা হচ্ছে। রংপুর, খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, গোপালগঞ্জ, কুমিল্লা, নাটোর, সিলেট, কক্সবাজার, ময়মনসিংহ, জামালপুরে এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জে আইটি ভিলেজ স্থাপনের জন্য প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পে সম্ভাব্য ব্যয় হবে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। ৬৪ জেলায় এক লাখ গ্রামীণ নারীকে এন্ট্রিপ্রেনিউর তৈরি করা এবং তাদের ল্যাপটপ, সার্ভার স্টোরেজ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নেটওয়ার্কের আওতায় আনা। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬২ কোটি টাকা। দেশে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ডাটা সেন্টার স্থাপন, যার ব্যয় হবে এক হাজার ৬৯ কোটি টাকা। সরকারি উদ্যোগে আইটি পার্ক নির্মাণের বাইরেও বেসরকারিভাবে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপনকে উৎসাহিত করতে আইসিটি ডিভিশনের অনুমোদন নিয়ে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রাইভেট অপারেটেড সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক প্রণয়ন করেছে। ফলে দেশি-বিদেশি আগ্রহী বিনিয়োগকারিগণ বিনিয়োগ করতে পারবেন। অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার সার্ভিসসমূহের আনুমানিক বাজার এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ শিল্পে নিয়োজিত রয়েছেন ২৫ থেকে ৩০ হাজার তথ্য-প্রযুক্তিবিদ। এক্ষেত্রে যশোরে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক স্থাপনের কাজ শেষ হলে বাংলাদেশে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে সফটওয়্যার শিল্পের আরও বিকাশ ঘটবে। এ ছাড়া ২০১৮ সালের মধ্যে সফটওয়্যার রপ্তানি করে এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করার টার্গেটও নেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট : ২০১৭ সালের মধ্যে দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু-১’ মহাকাশে পাঠাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে এই প্রকল্পে। কৃত্রিম এই উপগ্রহ কক্ষপথে স্থাপন হলে ১১ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয়সহ আয় হবে ৬১ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে এ স্যাটেলাইট। ইতোমধ্যে স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে ইন্টারস্পুটনিক অরবিটাল স্লটের সাথে চুক্তি এবং দক্ষ কোম্পানীকে কাজ দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। সকল কাজ সম্পন্ন শেষে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে উৎক্ষেপণের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে। বিটিআরসি সচিব সরওয়ার আলম বলেন, বিশ্বের সকল উন্নত ও আধুনিক দেশের কৃত্রিম উপগ্রহ আছে। বাংলাদেশের স্যাটেলাইট স্থাপন হলে নিজেদের ভাড়া যেমন বাঁচবে তেমনি ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, কাজাখাস্তান, উজবেকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের কাছে ভাড়া দেয়া যাবে। বিটিআরসি সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিদেশী স্যাটেলাইটের ফ্রিকোয়েন্সি ভাড়া নিয়ে টেলিভিশন চ্যানেল, টেলিফোন, রেডিওসহ অন্যান্য যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে। এতে প্রতি বছর ভাড়া বাবদ বাংলাদেশকে ১১ মিলিয়ন ডলার গুণতে হয়। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু করতে পারলে দেশে শুধু বৈদেশিক মুদ্রারই সাশ্রয়ই হবে না, স্যাটেলাইটের অব্যবহৃত অংশ নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের মতো দেশে ভাড়া দিয়ে প্রতি বছর ৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থ আয় করা যাবে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া দুর্যোগপ্রবণ বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখবে এ স্যাটেলাইট।বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার : ১৯৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে কালিয়াকৈরে নির্মাণ করা হচ্ছে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার। ন্যাশনাল ডাটা সেন্টারটি গড়ে তোলার জন্য কালিয়াকৈরে হাইটেক পার্ক সংলগ্ন ২০ একর জমি চূড়ান্ত করা হয়েছে। ডাটা সেন্টারটি স্থাপন করা হলে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল ডাটা সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি বিভাগ এবং তথ্য-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। টিয়ার ফোর সার্টিফায়েড ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার নামে পরিচিত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ১৯৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিশ্বের ৫ম বৃহত্তম এই ডাটা সেন্টারে চায়নিজ এক্সিম ব্যাংকের ১৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বাংলাদেশ সরকারের ৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে। এই ডাটা সেন্টারটি ব্যাংক, গবেষণা কেন্দ্র, সরকার এবং অন্যান্য বাণিজ্য সংস্থার গোপনীয়, গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। কেবল দেশের তথ্য সংরক্ষণই নয়, বিদেশি বাণিজ্য সংস্থা ও অন্যান্য দেশগুলোকেও তথ্য সংরক্ষণের জন্য আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। যাতে তারা এখানে তথ্য সংরক্ষণ করাকে নিরাপদ মনে করে। এ বিষয়ে তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, “ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রম বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি খাতে তথ্য সংরক্ষেণের জন্য আরো বড় পরিসরে আমাদের ডাটা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। পাশাপশি আমাদের ডাটার নিরাপত্তাও একটি বড় ইস্যু যা ভবিষ্যতে আরো প্রকট আকার ধারণ করবে। তাই, ডিজিটাল বাংলাদেশের কার্যক্রমকে অব্যাহত রাখতে এবং আমাদের তথ্যের সুরক্ষার জন্য এই ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার স্থাপন করা হচ্ছে। মোবাইল ও ইন্টারনেট খাতেও বিদেশি কোম্পানীগুলোর প্রচুর বিনিয়োগ রয়েছে। বিশেষ করে গত ২০১৩ সালে থ্রিজি তরঙ্গ নিলামের সময় বিনিয়োগের ফলে ওই বছর বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ২ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যান্ডউইথ রফতানি করে বছরে ১০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে দেশের ইন্টারনেট ব্যবস্থাপনাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানী লিমিটেড। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ব্যান্ডউইথ রফতানির জন্য চুক্তি হয়েছে। ভারতের পর ইতালিতেও ব্যান্ডউইথ রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সাবমেরিন ক্যাবল কোম্পানী। এছাড়া ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুর্গম এলাকায় ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র, ৩০ কোটি টাকায় এস্টাবলিশমেন্ট অব সাসেক ইনফরমেশন হাইওয়ে, ২২ কোটিতে বেসিক আইসিটি স্কিল ট্রান্সফার, ২৫ কোটিতে উপজেলার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব, প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দু’জন শিক্ষার্থীকে ল্যাপটপ প্রদান, ২৮২ কোটি টাকায়, পাবলিক নেটওয়ার্ক স্থাপন (বাংলা গভনেট), ৫৭১ কোটি টাকায় আইসিটি সেক্টরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও রপ্তানি বাড়াতে পাবলিক সেক্টর আধুনিকীকরণ, এক হাজার ৩৩৪ কোটি টাকায় ইনফো সরকার প্রকল্প বাস্তবায়ন, ১৮১ কোটি টাকায় আউটসোর্সিংয়ের জন্য দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টি, ৩০০ কোটি টাকায় ২ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনসহ আরও অনেক প্রকল্পই হাতে নিয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপন ও এক হাজার ২০০ ইউনিয়নে এক লাখ ওয়াই-ফাই হটস্পট স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এক হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে চীনের এক্সিম ব্যাংকের ঋণ সহায়তা রয়েছে এক হাজার ৩১৯ কোটি টাকা। তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি বিভাগের সচিব শ্যাম সুন্দর শিকদার বলেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশ এখন নিরাপদ গন্তব্য। এই শিল্পে অপার সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে সরকারের দেয়া সুযোগ-সুবিধা ও প্রণোদনা কাজে লাগিয়ে বিনিয়োগ করে উভয় পক্ষই লাভবান হবে। দেশ অর্থনৈতিকভাবে আরো সমৃদ্ধ হবে। জিডিপিতে বিনিয়োগকারীদের অবদান বাড়বে এবং আরো বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। মাথাপিছু আয় বাড়বে এবং দারিদ্র্য বিমোচন হবে। এভাবেই বাংলাদেশ হবে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং একসময় উন্নত দেশ হবে। জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, সামাজিক অগ্রগতি ও জনগণের সন্তুষ্টি অর্জনই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য। দক্ষতা ও যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং জনজণের দোরগোড়ায় এই সেবা পৌঁছে দেয়া। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নই মূল লক্ষ্য।